প্রাইজের টাকা দিয়ে বরাট স্যারকে একটা খদ্দরের পাঞ্জাবি আর একটা সস্তার ফুলপ্যান্ট কিনে দিয়েছিল সুখারাম। ওঁর বস্তির দেড়খানা ঘরে গিয়ে যখন ও উপহারের প্যাকেটটা স্যারকে দেয় তখন হতবাক মানুষটা আবার ওকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিল। তারপর আবেগে কেঁপে যাওয়া গলায় বিড়বিড় করে বলছিল, ‘এ তুই কী করলি! এ তুই কী করলি! তোর নিজেরই এত টানাটানি…।’
সুখারাম উত্তরে নীচু হয়ে স্যারের পা জড়িয়ে ধরেছিল। ভাঙা গলায় বলেছিল, ‘এ আমার গুরুদক্ষিণা, স্যার…গুরুদক্ষিণা…।’
বরাট স্যার ওকে একহাতে ধরে দাঁড় করিয়ে মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, ‘তোকে প্রাণভরে আশীর্বাদ করি, সুখা। তুই আমার সেরা ছাত্র…।’
স্যারের পাঞ্জাবিতে মুখ গুঁজে সুখারাম বলেছিল, ‘আমি শুধু ছুটতে চাই, স্যার। সারাজীবন ছুটতে চাই…।’
ওর মাথায় হাত বোলাতে-বোলাতে স্যার বলেছিলেন, ‘শুধু ছুটবি না—আমি জানি তুই একদিন বড় কিছু একটা করে দেখাবি। অনেক বড় কিছু…।’
আজ হঠাৎ বরাট স্যারের কথাগুলো খুব বেশি করে মনে পড়ছে।
স্যার বলতেন, ‘শোন, পিচের রাস্তা কিংবা সিমেন্ট বাঁধানো চাতালে কখনও দৌড়বি না। আর মাঠে যদি কোনও ঢাল টের পাস তো সেখানেও প্র্যাকটিস করবি না। সমান জায়গা চাই—সমান। আর শোন, ছোটার সময় পায়ের তলার মাটি স্প্রিং-এর কাজ করে। এই স্প্রিং অ্যাকশান সিমেন্টে কি অ্যাসফাল্টে পাবি না—।’
একদিন জুতোর ফিতে ঢিলে করে বাঁধা ছিল বলে ছুটতে-ছুটতে আচমকা ট্র্যাকে ছিটকে পড়েছিল সুখারাম। একইসঙ্গে সেই রেস থেকেও ছিটকে গিয়েছিল।
তাতে বরাট স্যার ব্যাপক রেগে গিয়েছিলেন। দু-চারটে অশ্লীল গালিগালাজও বয়স্ক লোকটার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। সুখারামকে সেদিন স্যার মুখে তুলোধোনা করেছিলেন। কথার সঙ্গে-সঙ্গে সেদিন স্যারের মুখ থেকে থুতু ছিটকে বেরোচ্ছিল।
‘আরে ছাগল, প্রিপ্যারেশানে ধেয়ান দে! তুই যখন ট্র্যাকে দৌড়স তখন কি আসলে তুই দৌড়স নাকি?’
সুখারাম প্রশ্নটার মানে বুঝতে না পেরে হাঁ করে স্যারের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল।
রাগে অগ্নিশর্মা মানুষটা তখন বলেছিল, ‘শোন পাঁঠা, ট্র্যাকে যখন তুই দৌড়স তখন তুই না—আসলে তোর ভেতরে আমি দৌড়ই! আমি! আমি!’
এ-কথা বলতে-বলতে পাগলের মতো নিজের বুকে আঙুল ঠুকেছিল লোকটা।
‘সুখা, তোকে নিয়ে আমার কত আশা! আর তোর এই ভুল! ছি:!’ আপশোশে এপাশ-ওপাশ মাথা নেড়েছিলেন বরাট স্যর : ‘মন দিয়ে প্র্যাকটিস কর—মন দিয়ে। আমি শিয়োর, তুই একদিন বড় কিছু একটা করে দেখাবি… বড় কিছু…।’
হ্যাঁ, শেষ পর্যন্ত ‘বড় কিছু একটা’ করে দেখিয়েছে সুখারাম। অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে একা পাঁচ-পাঁচটা ক্রিমিনালকে খতম করে দিয়েছে। আর সেই ‘বড়’ কাজটা করার সময় ওকে দৌড়তে হয়েছিল। এমন দৌড় ও লাইফে কখনও দৌড়য়নি।
এই সাংঘাতিক ঘটনাটার খবর পেয়ে বরাট স্যার থানায় ওর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। এসে প্রিয় ছাত্রকে আশীর্বাদ করেছিলেন, বুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন।
সেদিন স্যারের বুকে মুখ রেখে সুখারাম নস্কর হাউহাউ করে কেঁদে ফেলেছিল। আর একইসঙ্গে ও স্যারের খদ্দরের পাঞ্জাবি থেকে ঘামের গন্ধ পেয়েছিল।
সেই গন্ধে এত আদর আর আন্তরিকতা মাখানো ছিল যে, সুখারামের মনে হয়েছিল এই গন্ধটা স্বর্গ থেকে ভেসে আসছে।
•
রবিবারের সেই মেঘলা বিকেলটা সুখারামের স্পষ্ট মনে আছে। যে-বিকেল থেকে ওর জীবনটা বাঁক নেওয়া শুরু করেছিল।
কাঠ-মিলের মাঠে ফুটবল ম্যাচ ছিল। সুখারামদের বস্তির সঙ্গে পোড়া বস্তির ছেলেদের।
কাঠ-মিলের মাঠটা মাপে বিশাল বড়। তার তিন দিক ঘিরে রয়েছে বড়-বড় স’মিল। তার মধ্যে গোটা ছয়েক চালু রয়েছে, আর বাকিগুলো গা-ছমছমে ভাঙাচোরা পোড়োবাড়ি। কাঠ-মিলগুলোর সামনে ছোট-বড় কাঠের গুঁড়ির স্তূপ। লম্বা করে শোয়ানো। একটার ওপরে একটা চাপিয়ে সার দিয়ে ছোট-ছোট পিরামিডের মতো সাজানো। ক’দিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছে বলে গুঁড়িগুলো ভেজা, বাতাসে ভেজা কাঠের ভুসির গন্ধ। ছোটবেলায় সুখারাম যখন বন্ধুদের সঙ্গে মিলে ঝুলন সাজাত তখন এইসব মিল থেকে বিনাপয়সায় কাঠের ভুসি নিয়ে যেত।
কাঠ-মিলের মাঠের একদিকে ছাল-ওঠা এবড়োখেবড়ো পিচের রাস্তা। আর তারপরই নোংরা জলের সরু খাল।
খালের জল কালো, তেলচিটে—অনেকটাই কচুরিপানায় ঢাকা। খালের দু-পাড় থেকে কালো মাটি আর পাঁক ঢাল বেয়ে প্রায় মাঝখান পর্যন্ত চলে এসেছে। খালের পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে প্রবল দুর্গন্ধ নাকে এসে ধাক্কা মারে। তার একটা বড় কারণ, কুকুর-বেড়াল গোরু-ছাগল মারা গেলে তাদের ডেডবডি ফেলার জায়গাও এই খাল।
খালপাড় ধরে একটানা ঝুপড়ি। বর্ষার আক্রমণ ঠেকাতে নীল, সবুজ, কালো কিংবা লালরঙের পলিথিনের টুকরোয় ঢাকা।
মাঠের কাছ থেকে প্রায় কিলোমিটারখানেক দূরে পোড়া বস্তি। সুখারামের খুব ছোটবেলায় খালধারের ওই বস্তিটায় আগুন লেগে গিয়েছিল। তার পর থেকেই ওটার নাম হয়ে গেছে পোড়া বস্তি।
পোড়া বস্তির বেশিরভাগ ছেলেই চুরি, ডাকাতি আর ছিনতাইয়ের কাজে জড়িয়ে থাকে। তার সঙ্গে খুন-জখমের খেলাও আছে। ওদের মধ্যে ফেরোশাস যে দু-চারজন, তারা ধীরে-ধীরে ‘ভাইয়া’ বনে গেছে। ফলে তারা পয়সা করেছে। বস্তিতে থেকেও ঠাটবাট বজায় রাখতে পারে। মোটরবাইকে চেপে ঘুরে বেড়ায়।
