সুখারাম নস্কর নিজেও সেটা জানে। তবে যেটা অনেকেই জানে না সেটা হল, ঝগড়া কিংবা মারপিট করতে ওর ভালো লাগে না। ওর ভালো লাগে খোলা আকাশের নীচে দৌড়তে। দৌড়, দৌড়, দৌড়।
ও স্বপ্ন দ্যাখে, ও দৌড়চ্ছে—না, দৌড়চ্ছে না, উড়ে যাচ্ছে বাতাসের বেগে, আর ওর মাথার ওপরে নীল আকাশ আর সোনালি সূর্য।
অথচ হাফ-ম্যারাথন রানার সুখরাম নস্কর এখন সেন্ট্রাল জেলের ট্রান্সপারেন্ট ফাইবারের পাঁচিলের ঘেরাটোপে বন্দি।
সুখারাম পুরোনো অভ্যেস ছাড়তে পারেনি। একজন লং ডিসট্যান্স রানারের প্র্যাকটিসের অভ্যেস। এই জেলে আসার আগে, যখন ও স্বাধীন ছিল, তখন ও সপ্তাহে গড়ে ছাপ্পান্ন কিলোমিটার করে দৌড়ত। প্রতিদিন প্র্যাকটিসের সময় ওর কোচ বরাট স্যার স্টপ ওয়াচ হাতে লক্ষ রাখতেন। বলতেন, ‘সুখা, অ্যাভারেজে তোর এক-একমাইল কভার করতে পঞ্চান্ন সেকেন্ড লেগে যাচ্ছে!’ মাথা নাড়তেন বরাট স্যার : ‘কমা, কমা। টাইম আরও কমা। অন্তত পঞ্চাশ সেকেন্ড কর…।’
বরাট স্যার কোচিং-এর জন্য সবার কাছ থেকে টাকা নিতেন—শুধু সুখারামের কাছ থেকে কিছু নিতেন না। কারণ, তিনি সুখারামের বাড়ির অবস্থা জানতেন। অসুস্থ বিধবা মা, আর স্কুলে পড়া একটা ছোট বোন। অভাব ছাড়া ওদের সম্বল বলতে আর কিছু ছিল না। তিনটে প্রাণীর দু-বেলার খোরাকি জোটাতে সুখারাম ওল্ড সিটিতে দিনে দশঘণ্টা করে সাইকেল ভ্যান টানত। বরাট স্যার ওকে উৎসাহ দিয়ে বলতেন, ‘বাচ্চা, চালিয়ে যা। জানিস, লোড করা সাইকেল ভ্যান টানলে পায়ের কাফ মাসল কত ডেভেলাপ করে, কত স্ট্রং হয়!’
পঁচিশ বছরের সুখারাম সব বুঝত। বরাট স্যারের কথাগুলো মিথ্যে ছিল না। কিন্তু তার মধ্যে একটা আক্ষেপ লুকিয়ে থাকত। নিজের সেরা ছাত্র সুখারামের জন্য তিনি একটা ভালো চাকরি জোগাড় করে দিতে পারেননি।
সুখারামের তাতে দু:খ ছিল না। ও হাসিমুখে সাইকেল ভ্যান টানত। আর রোজ ভোরবেলা প্র্যাকটিসে আসত—একদিনও কামাই করত না। কারণ, দৌড়তে ওর দারুণ ভালো লাগত। ওর মনে হত, দৌড়টাই ওর জীবন।
সেইজন্যই সুখারাম ওর পুরোনো অভ্যেস ছাড়তে পারেনি। জেলের ভেতরে এই বিশাল খোলা মাঠে ও ড্রিলের সময়টায় দৌড় প্র্যাকটিস করে। রোজ গড়ে আট কিলোমিটার করে ওর দৌড়নো চাই-ই চাই। তা হলে সপ্তাহে ছাপ্পান্ন কিলোমিটারের কোটা পূরণ হয়। বরাট স্যার যা বলেছিলেন।
এই মাঠে যখন ও দৌড়য় তখন ওয়াচ টাওয়ারের ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা কোনও একজন সান্ত্রীকে ও বরাট স্যার বলে কল্পনা করে নেয়।
বয়েস পঞ্চাশ-বাহান্ন। রোগা চেহারা। মাথায় অর্ধেকটা টাক। চোখে চশমা। গাল বসা। কপালে অনেক ভাঁজ। পরনে খদ্দরের পাঞ্জাবি আর ঢোলা ফুলপ্যান্ট। এবং সেই পাঞ্জাবি বা ফুলপ্যান্টের কোথাও না কোথাও অল্পবিস্তর ছেঁড়া থাকবেই। মানুষটা রেগে গিয়ে যখন চিৎকার করে ছাত্রদের গালিগালাজ করত তখন তার মুখ দিয়ে থুতু ছিটকে বেরোত।
বরাট স্যার বয়েসকালে লং ডিসট্যান্স রানার ছিলেন। তবে দৌড়ে খুব বেশি এগোতে পারেননি। এ-পাড়া সে-পাড়ায় দু-চারটে লোকাল কাপ জিতেছেন—ব্যস, এই পর্যন্তই।
অনেকে আড়ালে ওঁকে ব্যঙ্গ করে বলে, যারা অ্যাথলেটিক্সে আলটিমেটলি কিছু করতে পারে না, তারাই বয়েস হলে কোচ হয়ে ইয়াং অ্যাথলিটদের ওপরে মাতব্বরি করে আর পয়সা কামায়।
কথাটা কী করে যেন পাঁচকান হয়ে বরাট স্যারের কানে গিয়েছিল। পরদিন ভোরবেলা মাঠে এসে বরাট স্যার বলেছিলেন, ‘শোন, আমি তোদের আর প্র্যাকটিস করাব না।’
সুখারামরা মোট পাঁচজন ছিল সেদিন। ওরা প্রায় একসঙ্গে জিগ্যেস করেছিল, ‘কেন, স্যার? শেখাবেন না কেন?’
বরাট স্যার ওদের খুব কাছে এগিয়ে এসেছিলেন। ভাঙা গলায় জানতে চেয়েছিলেন, ‘আমি তোদের ওপরে মাতব্বরি করি? তোদের কাছ থেকে পয়সা কামাই?’
বরাট স্যারের সেই অপমান মাখা কণ্ঠস্বর সুখারামের আজও মনে আছে। প্রশ্ন দুটো করার সময় বরাট স্যার কেঁদে ফেলেছিলেন। এবং সেই কান্না মেশানো গলায় একই প্রশ্ন বারবার করতে-করতে ভাঙাচোরা মানুষটা পাশের একটা গাছের নীচে বসে পড়েছিলেন। আর সুখারামরা স্যারকে ঘিরে ধরে প্রাণপণে সান্ত্বনা দিয়েছিল, আর বারবার বুঝিয়েছিল যে, কথাগুলো সব মিথ্যে।
প্রায় আধঘণ্টা পর চশমার কাচ মুছে আবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। এবং কোচিং শুরু করেছিলেন। কিন্তু সেদিন ততটা মন দিয়ে শেখাতে পারেননি।
স্যারের কথা ভাবতে-ভাবতে সুখারাম নস্কর জেলের মাঠে শুয়ে পড়েছিল। ওর চোখে জলও এসে গিয়েছিল। বরাট স্যার এখন কী করছেন কে জানে! তিনি যদি জানতেন, সুখারাম একজন সান্ত্রীকে বরাট স্যার ভেবে নিয়ে সেন্ট্রাল জেলের এই মাঠে রোজ বিকেলে দৌড় প্র্যাকটিস করে তা হলে কী খুশিই না হতেন!
চোখ বুজে স্যারের কথা ভাবছিল সুখারাম, আর মনে-মনে রেসিং ট্র্যাকে দৌড়চ্ছিল। ট্র্যাকের এক-একটা পাক শেষ করার সময় ট্র্যাকের ঠিক পাশে ও বরাট স্যারকে দেখতে পাচ্ছিল। স্টপ ওয়াচ দেখছেন আর উত্তেজিত হাতের ইশারা করে বলছেন, ‘চালিয়ে যা, সুখা! চালিয়ে যা!’
সুখারামকে স্যার খুব ভালোবাসতেন। সবসময় বলতেন, ‘তুই আমার সেরা ছাত্র। আমি শিয়োর—তুই একদিন কিছু না কিছু করে দেখাবি…।’
তো রিজিওন্যাল মিটে সুখারাম নস্কর পাঁচ কিলোমিটার রেসে ফার্স্ট হয়েছিল। কাপ, ক্যাশ প্রাইজ আর সার্টিফিকেট নিয়ে ডায়াস থেকে নামতেই বরাট স্যার ওকে জাপটে ধরেছিলেন। আবেগে মানুষটা কোনও কথা বলতে পারছিল না। বারবার শুধু বলছিল, ‘সুখা…সুখা…সুখা…।’
