রঙ্গপ্রকাশ হঠাৎ কেঁদে ফেললেন। পর্ণমালা স্বামীর গায়ে হেলে পড়লেন, ওঁর বাহু আঁকড়ে ধরলেন।
পর্ণমালার চোখ বোজা। ঠোঁট কাঁপছে।
রঙ্গপ্রকাশ কিছু বলতে চাইলেন, কিন্তু ওঁর কথা জড়িয়ে গেল।
জিশান ঠোঁটে আঙুল তুলে ইশারায় ওঁকে চুপ করতে বলল। তারপর উঠে দাঁড়াল।
‘ডক্টর, কিল গেমে জিতে আমি যে-একশো কোটি টাকা পাব তা দিয়ে ওল্ড সিটির প্রচুর মানুষকে আমি নিউ সিটির সিটিজেন করে দিতে পারব। আমি ওদের এখানে নিয়ে আসতে চাই কেন জানেন?’ ঠোঁটের কোণে হাসল জিশান। বলল, ‘আপনাদের এখানে মনুষ্যত্বের বড় অভাব। ওরা এখানে এলে সেই অভাব অনেকটা ঘুচবে…।’
এক লহমা চুপ করে থেকে জিশান বলল, ‘যাই, দেরি হয়ে যাচ্ছে। আশা করি সেপ্টেম্বরের দু-তারিখের পর আমাদের আবার দেখা হবে।’
ওঁরা দুজনেই রুদ্ধ গলায় বললেন, ‘হ্যাঁ, দেখা হবে। তখন আমরা অনেক গল্প করব। উইশ য়ু অল দ্য বেস্ট, জিশান—।’
স্যাটেলাইট ফোনটা পকেটে ঢোকাতে-ঢোকাতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল জিশান। খুব টায়ার্ড লাগছে। গালটাও সামান্য জ্বালা করছে। তবে মনটা ভালো লাগছিল।
জিশান ঘড়ি দেখল। না, আর দেরি করলে চলবে না। সুধাসুন্দরীর কাছে সময়ের মধ্যে ফিরতে হবে। কন্ট্রোলড ফ্রিডম।
বাইরে বেরিয়ে আসার সময় ও একটা হাই তুলল।
•
সুখারাম নস্কর মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকাল।
কী সাংঘাতিক নীল! দেখলে লোভ হয়। যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। বলছে, ‘চলে আয়!’
আর সেই নীলের চাদরে গাঁথা রয়েছে একটা ঝলমলে সোনালি বল। জ্বলছে। তবে এখন বিকেল বলে তেজ কম।
এই দুটো জিনিসের দিকে তাকালেই সুখারামের স্বাধীন হতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে এই সেন্ট্রাল জেল থেকে পালাতে। আর তখনই ওর মন-কেমন-করা শুরু হয়।
সেন্ট্রাল জেলের প্রকাণ্ড মাঠে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছিল কয়েদিরা। কেউ-কেউ বারবেল বা ডাম্বেল নিয়ে শরীরচর্চা করছে। কয়েকজন নিজেদের মধ্যে টিম তৈরি করে খেলাধুলো করছে। পাঁচটা ফুটবল মাঠের মধ্যে ছুটোছুটি করছে। তার পিছনে খেলোয়াড়রা। আবার কোথাও বা ক্রিকেট বল আর ব্যাট নিয়ে হইহই চলছে।
সব কয়েদির পরনে একইরকম পোশাক। ছাই রঙের টাইট স্লিভলেস ভেস্ট আর কালো রঙের টাইট প্যান্ট। প্রত্যেকের ভেস্টের ওপরে সামনে এবং পিছনে বারকোড প্রিন্ট করা। এই বারকোড লেজার স্ক্যানার দিয়ে স্ক্যান করলেই সেই কয়েদির সমস্ত খুঁটিনাটি স্ক্যানারের ফাইবার অপটিক কেবল দিয়ে চলে যাবে কম্পিউটারের মেমোরিতে। এবং কম্পিউটারের মনিটরে ফুটে উঠবে।
শুধুমাত্র বিকেলের এই ড্রিলের সময় কয়েদিদের সেল থেকে বেরোতে দেওয়া হয়। চারটে থেকে সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত এই ‘স্বাধীনতা’-র সময়টাকে ওরা ঠাট্টা করে বলে ‘ফান আওয়ার’। এই সময়টা জেলের খোলা মাঠে ওরা খেলাধুলো কি গল্পগুজব করে নিজেদের খুশিমতো সময় কাটায়।
জেল বিল্ডিং-এর এক কোণে রয়েছে ‘ড্রিল কাউন্টার’। সেই কাউন্টার থেকে কয়েদিরা নিজেদের পছন্দমতো ‘ড্রিল আইটেম’ পেতে পারে। ‘আইটেম’ বলতে ফুটবল, ব্যায়ামের যন্ত্র, ক্রিকেট খেলার ব্যাট-বল—এইসব। তারপর সাড়ে পাঁচটা বাজলেই সমস্ত আইটেম কাউন্টারে আবার ফেরত দিয়ে জেল বিল্ডিং-এ ঢুকতে হয়। কেউ যদি কোনও আইটেম কাউন্টারে জমা না দিয়ে জেল বিল্ডিং-এ ঢোকে তা হলে স্পেশাল লেজার স্ক্যানার লাগানো দরজা দিয়ে পার হওয়ার সময় বিশেষ ধরনের বিপিং সাউন্ড শোনা যাবে। তখন শাস্তি হিসেবে সেই ‘অপরাধী’-কে একটানা তিনদিন স্রেফ জল খেয়ে কাটাতে হবে।
সুখারাম মাঠের একটা জায়গায় পা ছড়িয়ে চুপচাপ বসে ছিল। চারপাশের চেনা দৃশ্যটা একজন নিরপেক্ষ দর্শকের চোখে দেখছিল। আর মাঝে-মাঝে চোখ তুলে আকাশের দিকে তাকাচ্ছিল।
ড্রিলের এই সময়টা মাঠে বসে বা শুয়ে আকাশের দিকে তাকালেই ওর এই সেন্ট্রাল জেল থেকে পালাতে ইচ্ছে করে। যদিও ও জানে সেটা অসম্ভব।
হঠাৎই সুখারামের নজরে পড়ল, বেশ খানিকটা দূরে দুজন কয়েদির মধ্যে হাতাহাতি লেগেছে।
ব্যস, সঙ্গে-সঙ্গে সেন্ট্রাল জেলের লং ডিসট্যান্স লেজার স্ক্যানার কাজ শুরু করে দিল। বেশ কয়েকটা ওয়াচ টাওয়ার থেকে সিকিওরিটি গার্ডদের লেজার স্ক্যানিং গান পলকে অ্যাক্টিভ হয়ে উঠল। সেই লেজারের আলো গিয়ে পড়ল যুযুধান দুই কয়েদির ওপরে। ওদের বারকোড স্ক্যান হয়ে সমস্ত তথ্য ঢুকে পড়ল জেলের কম্পিউটারে।
এরপর কী হবে সুখারাম জানে।
ওই কয়েদি দুজনকে নিয়মমাফিক কম-বেশি শাস্তি পেতে হবে।
সত্যি, এই সেন্ট্রাল জেলের নজরদারির প্রযুক্তির তুলনা নেই!
সুখারাম নস্করের বুক ঠেলে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। ও অলসভাবে চেয়ে রইল লড়াইখ্যাপা দুই কয়েদির দিকে।
কয়েদি দুজনের লড়াই একটু পরেই থেমে গেল।
এরকমটা প্রায়ই হয় : এই লড়াই, তো এই ভাব।
এই জেলে সুখারাম আছে তিন বছর, কিন্তু তিন বছরে মাত্র চারবার ওর সঙ্গে অন্য কয়েদির হাতাহাতি হয়েছে। আর প্রত্যেকবারই সুখারাম ঝগড়া মিটিয়ে নিয়েছে। তারপর হেসে হ্যান্ডশেক করেছে শত্রুর সঙ্গে।
কোনও-কোনও কয়েদি সুখারামকে দুর্বল ভাবলেও বেশিরভাগ কয়েদি তা ভাবেনি। বরং তাদের মনে হয়েছে, যে-ছেলেটা ছ’ফুট এক ইঞ্চি লম্বা, যার হাত আর পায়ের মাসল নমনীয় অথচ মজবুত, যে দৌড়ে হরিণকে হার মানাতে পারে, শূন্যে ছ’ফুট লাফাতে পারে, সে আর যা-ই হোক দুর্বল হতে পারে না।
