সম্পর্কের টানের অভাব বহুদিন ধরে টের পেয়েছে সিমান। আর একইসঙ্গে জানতে পেরেছে ই. আই.-এর নড়বড়ে অবস্থা। তাই হয়তো ও সুইসাইড করতে গিয়েছিল এবং জিশান দেবদূত হয়ে ওকে বাঁচিয়েছে। কিন্তু এখন কী হবে?
সিমানকে ফিরে পেয়ে রঙ্গপ্রকাশ আর পর্ণমালা প্রাণ ফিরে পেয়েছেন। কিন্তু এখন যদি সিমান জানতে পারে যে, ক্রিটিক্যাল ভ্যালুর নীচে নেমে যাওয়া এই ই. আই.-কে মেরামত করার কোনও ক্ষমতা ওঁদের নেই! তা হলে কী হবে? সিমান কি সেরে উঠে আরও উচ্ছৃংখল হয়ে উঠবে, নাকি আবার সুইসাইড করায় চেষ্টা করবে?
তখন?
রঙ্গপ্রকাশ পর্ণমালার দিকে তাকালেন। ভেতরে-ভেতরে ভীষণ ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। জিশানকে কি খুলে বলবেন নতুন সমস্যার কথা? যদি এক্ষুনি জিশানকে কিছু না জানান তা হলে পরে আর জানানোর সুযোগ পাওয়া যাবে না। জিশান হয়তো আর পাঁচ-দশ মিনিট কথা বলেই চলে যাবে। তারপর হয়তো ওর সঙ্গে আর কোনওদিনও দেখা হবে না।
রঙ্গপ্রকাশের বারবার মনে হচ্ছিল, জিশান এমনই একজন মানুষ যে সব পারে। সব সমস্যার সমাধান করে দিতে পারে নিমেষে। ওর সাইকোলজিক্যাল প্রাোফাইল থেকেও ওর ‘প্রবলেম সলভিং স্কিল’-এর ব্যাপারটা বোঝা যাচ্ছিল। তা হলে একবার বলেই দেখা যাক না!
রঙ্গপ্রকাশ স্ত্রীর দিকে ঝুঁকে এলেন। চাপা গলায় বললেন, ‘আমাকে ক্ষমা কোরো, পর্ণ। আমি তোমাকে ই. আই.-এর ব্যাপারটা সাহস করে বলে উঠতে পারিনি। আমি পাগলের মতো একটা সলিউশান খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম—কিন্তু কোনও পথ পাইনি।’
প্রায় ফিসফিস করে পর্ণমালা বললেন, ‘আমরা…আমরা এখন কী করব? আমাদের তা হলে নিউ সিটি ছেড়ে চলে যেতে হবে?’
‘জানি না।’ মাথা নাড়লেন রঙ্গপ্রকাশ : ‘হাতে এখনও মাস তিনেক সময় আছে। কিন্তু তাতে কী লাভ! যখন সামনে কোনও ওয়ে আউট দেখতে পাচ্ছি না…।’
‘ওল্ড সিটিতে গিয়ে থাকতে হলে আমি…আমি সিম্পলি মরে যাব। আর…আর সিমানও কতটুকু বাঁচবে জানি না…।’ পর্ণমালার চোখে জল এসে গেল। হাত দিয়ে চোখ মুছলেন।
জিশান খুব অস্বস্তি পাচ্ছিল। বুঝতে পারছিল, একটা অত্যন্ত ব্যক্তিগত আলোচনার আবহাওয়ায় ও ঢুকে পড়েছে।
রঙ্গপ্রকাশ জিশানের দিকে তাকালেন। একটু আগেই জিশান বলছিল, ও একজন ডেসপারেট ফ্যামিলি ম্যান। কিন্তু রঙ্গপ্রকাশের এখন মনে হল, জিশান একা নয়—তিনি নিজেও একজন ডেসপারেট ফ্যামিলি ম্যান।
রঙ্গপ্রকাশ দুবার ঢোঁক গিললেন। চোয়াল শক্ত করে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলেন। তারপর জিশানের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘জিশান, আপনি আমার ছেলেকে আজ বাঁচিয়েছেন বটে কিন্তু আসলে পুরোপুরি বাঁচাতে পারলেন না। কারণ, আমরা তিনজনেই শেষ হয়ে গেছি। আমাদের হাতে আর মাত্র তিন মাস সময়—তারপরই আমরা শেষ।’
জিশান বলল, ‘জানি—ভালো করেই জানি। আমি একসময় এই নিউ সিটিতে ছিলাম। আমার যখন বারো বছর বয়েস তখন এই ই. আই.-এর প্রবলেমের জন্যে আমাকে আর আমার বাবাকে নিউ সিটি ছেড়ে চলে যেতে হয়। বাবার চোখের জলের কথা আমার এখনও মনে পড়ে। তখন আমার নাম ছিল নিশান। ওল্ড সিটিতে গিয়ে বাবা আমার নতুন নাম রাখেন জিশান। আমি সেই দিনটার কথা ভুলতে পারি না, ডক্টর। আমার বাবা বাকি জীবনটা কী কষ্ট পেয়েছিলেন তা আমি ভালো করে জানি।’
রঙ্গপ্রকাশ মুখ নামালেন। জিশানের ব্যথাটা অনুভব করতে চাইলেন।
কিছুক্ষণ চুপ করে রইল জিশান। তারপর আস্তে-আস্তে বলল, ‘ডক্টর, আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের কোড নম্বরটা আমাকে দিতে পারেন?’
‘কেন?’ চমকে উঠে মুখ তুললেন রঙ্গপ্রকাশ।
জিশান বলল, ‘দিন না—একটু দরকার আছে—।’
রঙ্গপ্রকাশ পর্ণমালার দিকে তাকালেন। দেখলেন, ওঁর মুখেও বিস্ময়।
জিশানের কথা আর ভঙ্গিতে এমন একটা কিছু ছিল যে, রঙ্গপ্রকাশ আর আপত্তি করতে পারলেন না।
কিছুক্ষণ ইতস্তত করে পকেট থেকে একটা ম্যাগনেটিক কার্ড বের করলেন। জিশানও ওর পকেট থেকে স্যাটেলাইট ফোনটা বের করে নিল।
রঙ্গপ্রকাশ ব্যাপারটা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না। অ্যাকাউন্ট কোড কেন চাইছে জিশান? ও কি রঙ্গপ্রকাশের ই. আই.-এর ব্যাপারটা হাতে-কলমে যাচাই করে নিতে চাইছে?
খানিকক্ষণ ইতস্তত করে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের কোড নম্বরটা ধীরে-ধীরে বলতে শুরু করলেন। আর জিশানও টাচ স্ক্রিন কি-প্যাডে আঙুল ছুঁইয়ে সংখ্যাগুলো ওর ফোনে ইনপুট করতে লাগল।
নম্বর বলা শেষ হলে রঙ্গপ্রকাশ কার্ডটা পকেটে ঢুকিয়ে রাখলেন। তারপর জিগ্যেস করলেন, ‘এই কোড নাম্বার দিয়ে আপনি কী করবেন?’
‘এই কোড নম্বর দিয়ে আমি সিমানকে বাঁচাব। এবার বোধহয় ওকে পুরোপুরি বাঁচাতে পারব।’
‘তার মানে?’ পর্ণমালা। ওঁর চোখের পাতা সামান্য কাঁপছে।
হাসল জিশান : ‘ম্যাডাম, এই নিউ সিটিতে এসে আমি বহু টাকার প্রাইজ জিতেছি। আমার এক বন্ধু মনোহর সিং-ও ওর প্রাইজ মানি আমার ছেলেকে গিফট করে গেছে। আমার এখন অনেক টাকা। এই টাকাটা আমি কাজে লাগাতে চাই…।’ কথা বলতে-বলতে স্যাটেলাইট ফোনের কি-প্যাডে আঙুল ছোঁয়াচ্ছিল জিশান। কয়েক সেকেন্ড পরে মুখ তুলে রঙ্গপ্রকাশের দিকে তাকাল, হাসল : ‘আপনার অ্যাকাউন্টে আমি আট লাখ টাকা ট্রান্সফার করলাম, ডক্টর…। আপনাদের জন্যে না—সিমানের জন্যে। আর একটা কথা…প্লিজ, আমাকে কোনও ধন্যবাদ জানাবেন না…।’
