এমভিপির পরদায় শানুর ফুটফুটে মুখ দেখা গেল। জিশান ওর এমভিপি সেটটা নিয়ে চলে এল রঙ্গপ্রকাশের পাশে। পরদার ছবিটা দেখিয়ে বলল, ‘আমার ছেলে, ডক্টর। ওর কাছে ফিরে যাওয়ার জন্যে আমাকে কিল গেমে জিততে হবে। ওর মায়ের কাছে ফেরার জন্যেও। ওরাই আমার সবচেয়ে জোরালো টান, সবচেয়ে বড় শক্তি—।’
পর্ণমালাও ঝুঁকে পড়ে শানুকে দেখছিলেন। ওঁদের সিমানও একদিন এইরকম ফুটফুটে ছিল।
জিশান সরে এল নিজের সোফার কাছে। বসে পড়ল। আরও কয়েক মিনিট মিনি আর শানুর সঙ্গে কথা বলে কাটাল। তারপর সেটটা অফ করে দিল।
রঙ্গপ্রকাশ আর পর্ণমালা দুজনেই তাকিয়ে ছিলেন জিশানের মুখের দিকে। সেখানে এক অদ্ভুত দ্যুতি ওঁরা দেখতে পাচ্ছিলেন : প্রিয়জনের ভালোবাসার দ্যুতি। সেই দ্যুতির সঙ্গে প্রাণশক্তির উজ্জ্বলতাও মিশে ছিল।
রঙ্গপ্রকাশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আড়চোখে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলেন সেই দীর্ঘশ্বাসের কোমল শব্দ পর্ণমালা শুনতে পেয়েছেন।
জিশান বলল, ‘ডক্টর বিশ্বাস, আপনি আমার সাইকোলজিক্যাল প্রাোফাইল তৈরি করছেন। নিশ্চয়ই শ্রীধর পাট্টার জন্যে। কিল গেমের জন্যে। যাই হোক, আপনার কাজ আপনি করবেন। আমারটা আমি। তবে একটা কথা আপনাকে বলি। কিল গেমের ফরম্যাট অনুযায়ী দু-তারিখে তিনজন মার্ডারার—লাইফার—আমাকে খুন করতে নামবে। আমি ওদের ফাঁকি দিয়ে চব্বিশ ঘণ্টা বেঁচে থাকার চেষ্টা করব। যেটুকু জেনেছি তাতে এখানকার নিয়ম অনুযায়ী যাবজ্জীবনের সাজা পাওয়া আসামিকে সত্যি-সত্যি সারাটা জীবন জেলে কাটাতে হয়। তাই ওই তিনজনের সামনে কোনও নতুন ভবিষ্যৎ নেই। বর্তমানটাই ওদের ভবিষ্যৎ…’ একটু থামল জিশান। অপলক চোখে তাকাল রঙ্গপ্রকাশ বিশ্বাসের দিকে। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকার পর বলল, ‘কিন্তু আমার বর্তমান আর ভবিষ্যৎ এক নয়, ডক্টর। আমি মিনি আর শানুর কাছে ফিরে যাব। ফিরে যাওয়ার এই টানটা আমার বর্তমান, আর ফিরে যাওয়াটা আমার ভবিষ্যৎ।
‘আপনার তৈরি করা সাইকোলজিক্যাল প্রাোফাইলে এই ফিলিংটা নিশ্চয়ই নেই। আপনি কাইন্ডলি এটা ইনক্লুড করে নেবেন। আমি চাই নিউ সিটির সবাই জানুক আমি একজন ডেসপারেট ফ্যামিলি ম্যান—।’
জিশানের ফরসা মুখে লালচে আভা দেখতে পাচ্ছিলেন রঙ্গপ্রকাশ।
জিশান ওঁর বাড়িতে এসে হাজির হয়েছে, এত কথা বলছে—সেটা রঙ্গপ্রকাশের সাইকোলজিস্ট ব্যক্তিত্বের ভালো লাগছিল। কারণ, খুব দ্রুত প্রচুর তথ্য পাচ্ছিলেন। তিনি জিশানের প্রাোফাইল এ পর্যন্ত যা তৈরি করেছেন এখন পাওয়া তথ্যকণাসাগর তার সঙ্গে জুড়ে নিলে প্রাোফাইলটা অনেক গুণ সমৃদ্ধ হবে।
আর সরাসরি যেটা বুঝতে পারছিলেন, কিল গেমে জিশান সহজে হারবে না, সহজে মরবে না। ও সত্যিই একজন ডেসপারেট ফ্যামিলি ম্যান। ও হারার আগে মারবে, মরার আগেও মারবে। ফ্যামিলির জন্য টান ওর সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র।
কিন্তু যে-প্রশ্নটা রঙ্গপ্রকাশকে খোঁচাচ্ছিল সেই প্রশ্নটাই এবার করলেন, ‘আমি যে আপনার সাইকোলজিক্যাল প্রাোফাইল তৈরি করছি সেটা আপনি জানলেন কেমন করে?’
‘সিমান।’ বলে হাসল জিশান। মাথা দোলাল কয়েকবার। তারপর : ‘সিমান আরও অনেক কিছু জানে। ও জানে যে, আপনার ইকনমিক ইনডেক্স ক্রিটিক্যাল ভ্যালুর নীচে চলে গেছে। সেটা ইমপ্রুভ করার জন্যে আপনার হাতে সময় রয়েছে নব্বই দিনেরও কম…।’
রঙ্গপ্রকাশ স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। ভয় পাওয়া বিমূঢ় মুখে তাকিয়ে রইলেন জিশানের দিকে।
পর্ণমালা এক ঝটকায় ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়েছেন স্বামীর দিকে। এ কী কথা শুনছেন তিনি! ই. আই. নেমে গেছে!
রঙ্গপ্রকাশ কাঁপতে লাগলেন। বিস্ময় আর নপুংসক রাগ ওঁর ভেতরে উত্তাল ঢেউ তুলল।
সিমান এ-কথা জানল কেমন করে! যে-কথা রঙ্গপ্রকাশ ভীষণ যত্নে গোপন রাখতে চেয়েছেন সেটা এখন যেন হুড়মুড়িয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল সবার সামনে কফি টেবলের ওপরে।
পর্ণমালা যে এ-ঘটনায় বেশ ধাক্কা খেয়েছেন সেটা ওঁর বিহ্বল চোখ-মুখে স্পষ্ট ধরা পড়েছে।
রঙ্গপ্রকাশের মুখে যে-নীরব প্রশ্নটা ফুটে উঠেছিল সেটা জিশান পড়ে নিতে পেরেছিল। তাই ও আলতো গলায় থেমে-থেমে বলল, ‘সিমান…আপনার… আপনার ই-মেল অ্যাকাউন্ট…হ্যাক করেছে। হ্যাক করে সব জেনেছে। ই. আই. ক্রিটিক্যাল ভ্যালুর নীচে নেমে যাওয়ার কথাও…।’
পর্ণমালা স্বামীর পাশে চলে এলেন। অসহায় মুখে ওঁর দিকে তাকিয়ে ওঁর জামা খামচে ধরলেন : ‘এসব…এসব সত্যি? আমাদের ইকনমিক ইনডেক্স ক্রিটিক্যাল ভ্যালুর নীচে চলে গেছে! সিমান…সিমান তোমার মেল হ্যাক করেছে!’
রঙ্গপ্রকাশ মাথা ঝুঁকিয়ে বসলেন। সামান্য মাথা নাড়লেন ওপর-নীচে। ভাঙা গলায় বললেন, ‘সত্যি—সব সত্যি…।’
জিশান ভেঙে পড়া বাবা-মা-কে দেখছিল। ওর খুব খারাপ লাগছিল। নিউ সিটির ইকনমিক ইনডেক্সের ব্যাপারটা সিমানই ওকে বলেছে। জিশানের ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গিয়েছিল তক্ষুনি। মনে পড়ে গিয়েছিল বাবার কথা। যে-বাবা সবসময় মাথা তুলে বাঁচার কথা বলতেন।
ইকনমিক ইনডেক্স! মুখের ভেতরটা তেতো লাগল জিশানের। এই অমানবিক নিয়ম একমাত্র নিউ সিটিকেই মানায়।
এখন কী করবেন রঙ্গপ্রকাশ? কোথায় মুখ লুকোবেন? সিমান ওঁর মেল হ্যাক করে সবকিছু জেনেছে বলেই কি সুইসাইড করতে গিয়েছিল?
