‘একটা কথা বলি, ম্যাডাম—’ পর্ণমালার দিকে সরাসরি তাকাল জিশান : ‘আমাকে নিশ্চয়ই আপনাদের খুব কাছের মানুষ বলে মনে হচ্ছে। কারণ, গত তিনমাস ধরে টিভিতে, রাস্তাঘাটের বিলবোর্ডে, নানান জায়গায় আমাকে—আমার ছবিকে—বেপরোয়াভাবে প্রচার করা হয়েছে। আপনাদের মিডিয়া আমাকে আপনাদের ঘরের লোক করে তুলেছে। এই শহরে ঘুরে বেড়িয়ে আমি দেখেছি, কিল গেম পার্টিসিপ্যান্ট জিশান পালচৌধুরীকে নিয়ে অল্পবয়েসি ছেলেমেয়েদের মধ্যে কী উৎসাহ, কী উদ্দীপনা, কী হুল্লোড় মাতামাতি আর হইচই। ওদের কাছে আমি সুপারহিরো হয়ে গেছি—।’
রঙ্গপ্রকাশ বিড়বিড় করে বললেন, ‘আমাদের কাছেও।’
পর্ণমালা স্বামীর দিকে একবার তাকালেন। তারপর জিশানের দিকে আবার মনোযোগ দিলেন।
‘সেইজন্যেই বোধহয় সিমান ওর মনের কথা আমার কাছে বলেছে।… বলেছে, ও ইচ্ছে করে ফ্লাইওভার থেকে সেন্ট্রাল লেকের জলে ঝাঁপ দিয়েছিল। ওর আর বাঁচতে ইচ্ছে করছিল না…।’
•
আপনি ওর লাইফ সেভ করেছেন।’ রঙ্গপ্রকাশ বললেন, ‘উই আর গ্রেটফুল টু য়ু…।’
‘প্লিজ—’ অনুনয় করে বলল জিশান, ‘একটা মামুলি কর্তব্যকে শুধু-শুধু বড় করে দেখাবেন না। যাই হোক, ডক্টর বিশ্বাস, মিসেস বিশ্বাস…আপনাদের ছেলে প্রায় একবছর ধরে ড্রাগ, বেটিং আর গ্যাম্বলিং-এ মেতে আছে। আপনাদের এই নিউ সিটির সুপারফাস্ট লাইফস্টাইলে গা ভাসিয়ে দিয়েছে। অথচ এই লাইফস্টাইলের ভেতরটা যে ফোঁপরা সেটা আপনারা দুজন নিশ্চয়ই বোঝেন।
‘ডক্টর, টাকা খরচ করতে পারার ক্ষমতাটাই একমাত্র ক্ষমতা নয়, গায়ের জোরে কাউকে হারাতে পারার ক্ষমতাটাই একমাত্র ক্ষমতা নয়। যারা এসব সত্যি বলে ভাবে তারা ভালোবাসার ক্ষমতার কথা জানে না…।’ কফিতে আবার চুমুক দিল জিশান : ‘আসলে কী জানেন, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কে যে-টান—সেই টানটাই সবচেয়ে পাওয়ারফুল। আপনাদের সঙ্গে সিমানের রিলেশানের টান কতটা ডেভেলাপ করেছিল সেটা আপনারাই ভালো জানেন। তবে…তবে…’ একটু ইতস্তত করল জিশান। তারপর নীচু গলায় বলল, ‘সিমান বলছিল, সেই টানটা ও কখনও সেভাবে টের পায়নি। ওর সবসময় মনে হয়, ওর কোনও পিছুটান নেই—।’
রঙ্গপ্রকাশ অবাক হয়ে জিশানের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। এসব কী শোনাচ্ছে জিশান। রঙ্গপ্রকাশ আর পর্ণমালার সঙ্গে সিমানের সম্পর্কের গোপন কথা?
কে সাইকোলজিস্ট? রঙ্গপ্রকাশ, না জিশান?
রঙ্গপ্রকাশ জিশানের দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারছিলেন না। ‘কাইনেসিকস’ বলবে, তিনি আসলে বিষয়টাকে এড়িয়ে যেতে চাইছেন।
আড়চোখে পর্ণমালার দিকে তাকালেন। ওঁর অবস্থাও একইরকম। ঘরের ফার্নিচার খুঁটিয়ে দেখার কাজে মনোযোগ দিয়েছেন।
জিশান তখন বলছিল, ‘আপনাদের ব্যক্তিগত ব্যাপারে কথা বলছি বলে, প্লিজ, ক্ষমা করবেন। কিন্তু সিমানের কথাগুলো শুনে আমার মনে হল সেগুলো আপনাদের দুজনের কাছে পৌঁছোনো দরকার। তা হলে হয়তো সিমানের সঙ্গে আপনাদের কমিউনিকেশানের গ্যাপটা কমবে। যেমন ধরুন…।’ সামান্য মাথা ঝাঁকাল জিশান। রঙ্গপ্রকাশের দিক থেকে চোখ সরিয়ে আঙুলে আঙুল ঠেকাল।
রঙ্গপ্রকাশ বুঝতে পারছিলেন, যে-কথাটা জিশান এখন বলতে চায় সেটা বলতে ও ইতস্তত করছে, সময় নিচ্ছে। বোধহয় কথাটা বেশ স্পর্শকাতর।
‘যেমন ধরুন, আপনি—ডক্টর বিশ্বাস—আমার সাইকোলজিক্যাল প্রাোফাইল তৈরি করছেন…।’
রঙ্গপ্রকাশ চমকে গেলেন। জিশান এ-কথা জানল কেমন করে? ওর তো এসব জানার কথা নয়!
পর্ণামালাও অবাক হয়েছিলেন। ফার্নিচারের দিক থেকে চকিতে চোখ ফিরিয়ে তাকিয়েছেন জিশানের দিকে।
জিশান বলল, ‘না, না, ডক্টর—এতে আপনার অস্বস্তি পাওয়ার কিছু নেই। সেপ্টেম্বরের দু-তারিখে আমাকে কিল গেমে নামতে হচ্ছে। এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় সত্যি—এর মধ্যে কোনও ‘ইফস অ্যান্ড বাটস’ নেই। এবং আপনাকে বলে রাখছি, আমি সেদিন প্রাণপণ লড়ব। জেতার জন্যে মরিয়া হয়ে চেষ্টা করব। কেন জানেন, ডক্টর?’
হঠাৎই উঠে দাঁড়াল জিশান। পকেটে হাত ঢুকিয়ে ওর মাইক্রোভিডিয়োফোন ইউনিটটা বের করল।
এই মুহূর্তে ওর মিনির সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছে। ওকে দেখতে ইচ্ছে করছে। শানুকেও দেখতে ইচ্ছে করছে।
সেটটা অন করে একটু টিউন করতেই জিশানের আপনজনেরা চলে এল ওর চোখের সামনে।
মিনি। সুন্দর মুখে ঘাম এবং হাসি। জিশানের দিকে তাকিয়ে ওর চোখ দুটো আরও জীবন্ত হয়ে উঠল। আস্তে করে জিগ্যেস করল, ‘কেমন আছ?’
জিশান হাসল : ‘ভালো—।’
‘দু-তারিখ তো দেখতে-দেখতে এসে যাবে…।’ সামান্য চোখ নামাল মিনি।
‘হ্যাঁ, এসে যাবে। তারপর পেরিয়েও যাবে। তখন তোমাদের কাছে ফিরে যাব। আমার দেরি সইছে না।’
‘তখন…তখন…’ মিনির কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ল : ‘তখন যদি ওই শ্রীধর পাট্টা তোমাকে ফিরতে না দেয়?’
‘না দিলে ওকে চিবিয়ে গুঁড়ো করে ফেলব। তারপর তোমাদের কাছে ফিরে যাব।’
কথাটা বলার সময় জিশানের চোয়ালের রেখা যে শক্ত হল সেটা রঙ্গপ্রকাশের চোখ এড়াল না।
‘শানু কোথায়?’ জিশান ছেলেকে দেখতে চাইল।
মিনি ওর এমভিপি সেটটা নিয়ে গেল ছোট্ট ছেলেটার কাছে। বলল, ‘এই দ্যাখো, মেঝেতে খেলনা ছড়িয়ে কী কাণ্ড করছে!’
ছেলেকে দেখতে পেল জিশান। এই চার মাসে কত বড় হয়ে গেছে!
কয়েকটা ভাঙা গাড়ি আর রঙিন পুতুল চারপাশে ছড়িয়ে মেঝেতে বসে আছে।
