সেসব কথা খুব মনে পড়ছিল এখন।
অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর জিশান বলল, ‘গাড়িতে আসার সময় আমি সিমানের সঙ্গে…কথা বলছিলাম। তাতে যা…জেনেছি…সেগুলো আপনাকে…জানানো দরকার। সিমানের ভালোর জন্যে…।’
রঙ্গপ্রকাশ ছোট একটা ধাক্কা খেলেন। ‘সিমানের ভালোর জন্যে….।’ তার মানে?
উৎকণ্ঠিত হয়ে জিশানের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। অপেক্ষা করতে লাগলেন।
একসময় অধৈর্য হয়ে বলে উঠলেন, ‘বলুন—কী বলবেন…।’
টেবিলের দিকে চোখ নামাল জিশান। নীচু গলায় বলল, ‘আপনার ছেলে সিমান…সুইসাইড করতে চেয়েছিল…।’
এবার বড় একটা ধাক্কা খেলেন। সুইসাইড করতে চেয়েছিল সিমান?
কিছুক্ষণ কোনও কথা বলতে পারলেন না রঙ্গপ্রকাশ। ওঁর ঠোঁট সামান্য কাঁপতে লাগল। কিন্তু ওঁর বিজ্ঞানী সত্তা তখনও জিশানের অভিব্যক্তি আর নড়াচড়া লক্ষ করছিল।
না, জিশান যে মিথ্যে বলছে সেরকম কোনও লক্ষণ চোখে পড়ছে না।
রঙ্গপ্রকাশের বুকের ভেতরে কয়েকটা বিশাল লোহার বল গড়াতে লাগল। দম আটকে আসতে চাইল। স্পষ্ট বুঝতে পারলেন, এখন কথা বলার চেষ্টা করলে শুধুই কান্না বেরিয়ে আসবে।
যে-ছেলেটার জন্য তিনি সবসময় মানসিক চাপ আর যন্ত্রণার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন, যার জন্য নিউ সিটি ছেড়ে চলে যাওয়ার আতঙ্ক মনের আকাশে কালো মেঘের মতো ছেয়ে রয়েছে, সে রঙ্গপ্রকাশ আর পর্ণমালার জীবন থেকে চিরকালের জন্য চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
রঙ্গপ্রকাশ সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। পর্ণমালাকে এ-ঘরে একবার ডাকা দরকার। কারণ, জিশান এবার যে-কথাগুলো বলবে সেগুলো একা-একা শোনার মতো সাহস তিনি তৈরি করতে পারছেন না। নিউ সিটির ‘সাইকোঅ্যানালিসিস সেন্টার’-এর চিফ সাইেকোলজিস্ট এখন নিজের মনের শক্তি এবং গতি-প্রকৃতি নিয়ে বিভ্রান্ত।
জিশানকে বললেন, ‘আপনি একটু বসুন। আমার ওয়াইফকে একটু ডেকে নিয়ে আসি—।’
ভেতরের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন। টের পাচ্ছিলেন পা দুটো ঠিকঠাক জায়গামতো পড়ছে না। ভয় পাচ্ছিলেন, এই বুঝি টলে পড়ে যাবেন।
ভাগ্য নেহাত ভালো বলতে হবে যে, চারটে কি পাঁচটা পা ফেলার পরই পর্ণমালাকে দেখতে পেলেন। একটা শৌখিন ট্রে হাতে এগিয়ে আসছেন ওঁদের দিকে। ট্রে-তে স্ন্যাক্স আর কফি—জিশানের জন্য।
তাড়াতাড়ি সোফার কাছে ফিরে এলেন রঙ্গপ্রকাশ। সোফায় বসার আগে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে চাপা গলায় বললেন, ‘সিমান?’
কফির টেবিলে হাতের ট্রে-টা নামিয়ে রেখে শান্ত গলায় জবাব দিলেন, ‘ঘুমিয়ে পড়েছে। একটা নার্ভ সুদার দিয়েছি…।’
‘পর্ণ, তুমি একটু এখানে বোসো। মিস্টার পালচৌধুরী কী বলছেন শোনো—।’
স্বামীর কাছে বসলেন পর্ণমালা। জিশানের দিকে তাকালেন।
জিশান খেয়াল করল, সিমানের জন্য কান্নাকাটি করে পর্ণমালা ওর মেকাপের ধার যেটুকু নষ্ট করেছিলেন সেটা এটুকু সময়ের মধ্যেই সাধ্যমতো মেরামত করে এসেছেন।
জিশান কফির কাপে চুমুক দিল।
রঙ্গপ্রকাশ একটু ইতস্তত করে বললেন, ‘জিশান, বলুন, সিমানের কথা কী বলছিলেন—।’
‘হ্যাঁ-বলছি।’ পর্ণমালার দিকে তাকাল জিশান : ‘ম্যাডাম, আপনাদের ছেলে সিমান গাড়ি চালিয়ে স্কাই-হাই ফ্লাইওভার থেকে সেন্ট্রাল লেকে ঝাঁপ দিয়েছে। ও সুইসাইড করতে চেয়েছিল। তারপর…তারপর কীভাবে ওকে রেসকিউ করা হয়, মেডিক্যাল ট্রিটমেন্ট দেওয়া হয়, সেসব তো আগেই ডক্টর বিশ্বাসকে আমি ফোনে জানিয়েছি…।’
রঙ্গপ্রকাশ পাশে হাত বাড়ালেন। পর্ণমালার হাতটা খুঁজলেন। একসময় সেটা পেয়ে আঁকড়ে ধরলেন।
‘ও সুইসাইড করতে চেয়েছিল কী করে বুঝলেন?’ পর্ণমালার ভুরুতে ভাঁজ। কণ্ঠস্বরে হালকা বিদ্রোহ।
জিশান হাতে হাত ঘষল। এদিক-ওদিক উদ্দেশ্যহীন তাকাল। তাকাল, কিন্তু ওর চোখ কিছু দেখতে পেল না।
রঙ্গপ্রকাশ বুঝলেন, ও দোটানায় পড়েছে। স্পষ্ট কথা বলবে, নাকি মানবিক সৌজন্য বজায় রাখবে? একজন বাবা-মা-কে আঘাত দেবে, নাকি দেবে না?
শেষ পর্যন্ত সত্যের জয় হল।
জিশান রঙ্গপ্রকাশ আর পর্ণমালার দিকে একপলক করে তাকিয়ে মাথা নীচু করল। বলল, ‘সিমান নিজে আমাকে বলেছে…।’
খুব দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখালেন পর্ণমালা। পালটা জিগ্যেস করলেন, ‘কেন, সুইসাইড করতে চেয়েছে কেন? ওর কীসের কষ্ট? কীসের অভাব? আমাদের কোনও ব্যবহারে কি ও ব্যথা পেয়েছে?’
জিশান ইতস্তত করে বলল, ‘না, না, ঠিক সেরকম নয়। আমার খুব অস্বস্তি হচ্ছে। সিমান ওর খুব পারসোনাল কথা…গাড়িতে আসার সময় আমাকে বলেছে…।’
‘খুব পারসোনাল কথা। অথচ আমাদের না বলে আপনাকে বলেছে!’ পর্ণমালার ভুরু এখনও কুঁচকে রয়েছে। চোখের তারায় আলতো বিস্ময়।
জিশান একটু নড়েচড়ে বসল। সোফায় শরীরটাকে খানিকটা এলিয়ে দিল। কিছুক্ষণ চুপ করে গিয়ে কফির কাপে কয়েকবার চুমুক দিল। স্ন্যাক্সে কামড় দিল। তারপর বলল, ‘আশা করি আপনারা এগুলো সিমানের সঙ্গে আলোচনা করবেন না।’ ঠোঁটের ওপরে একবার আঙুল বুলিয়ে নিল জিশান। এপাশ-ওপাশ তাকাল। তারপর : ‘আলোচনা যদিও বা করেন, প্লিজ, বলবেন না যে, এসব আপনারা আমার কাছ থেকে শুনেছেন। তা হলে…তা হলে আমার প্রতি ওর যে আস্থা আর বিশ্বাস—সব নষ্ট হয়ে যাবে। সেটা…সেটা আমার ভালো লাগবে না…।’
‘আপনাকে এসব পারসোনাল কথা ও বলতে গেল কেন?’ পর্ণমালা এখনও সেই একই প্রশ্নে আটকে আছেন। কারণ, জিশানকে সিমানের ব্যক্তিগত কথাবার্তা বলার ব্যাপারটা পর্ণমালা আর রঙ্গপ্রকাশের সঙ্গে সিমানের সম্পর্কের দূরত্বটাকে বড্ড কুৎসিতভাবে আঙুল তুলে দেখাচ্ছে।
