অনেক পরে মনোযোগ গেল ছেলের দিকে।
ক্লান্ত-শ্রান্ত বিধ্বস্ত চেহারা। কপালে ব্যান্ডেজ। গায়ে হসপিটালের রুগিদের মতো ঢোলা পোশাক। জিশানের গায়ে হেলান দিয়ে কোনওরকমে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
কফির কাপ টেবিলে রেখে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন পর্ণমালা। চোখ ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল। আপাত সংযমের বর্মের নানান স্তর মোচার খোলার মতো খসে পড়ল একে-একে। দৃষ্টিহীন মানুষের মতো এলোমেলো পা ফেলে ছেলের কাছে এগিয়ে গেলেন। তারপর আচমকা ওকে বুকে জাপটে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন।
‘সিমান! সিমান! এ কী দশা হয়েছে তোর! কোথায় ছিলি তুই? কোথায় ছিলি, বাবা?’
জিশান আর রঙ্গপ্রকাশ মা আর ছেলেকে দেখতে লাগলেন। জিশানের মনে পড়ল অর্কনিশানের কথা! ও:! কতদিন ওর সোনামণি শিশুটাকে ও বুকে জড়িয়ে ধরেনি!
স্ত্রীকে দেখে খানিকটা যেন অবাক হচ্ছিলেন রঙ্গপ্রকাশ। সিমানের জন্য পর্ণমালার এতটা টান তিনি আগে কখনও বুঝতে পারেননি। মাতৃস্নেহ তা হলে সহজে মরে না!
জিশানের হাতে একটা বায়োডিগ্রেডেবল প্যাকেট ছিল। তার মধ্যে সিমানের ভিজে জামাকাপড় রয়েছে।
ও দু-পা সামনে এগিয়ে প্যাকেটটা কফি টেবলের ওপরে রাখল। বলল, ‘এর মধ্যে সিমানের ভেজা জামা-প্যান্ট রয়েছে…।’
জিশানকে সামনাসামনি দেখা আর সিমানকে ঠিকঠাক অবস্থায় ফিরে পাওয়ার শক ধীরে-ধীরে কাটিয়ে উঠলেন রঙ্গপ্রকাশ। সোফা ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। তারপর এক পা সামনে এগিয়ে জিশানের দিকে হাত-বাড়িয়ে দিলেন।
‘থ্যাংকস। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ…।’ রঙ্গপ্রকাশের চোখে জল এসে গেল। ভাঙা গলায় নিজের আর পর্ণমালার পরিচয় দিলেন।
জিশান হাত মেলাল। সামান্য হাসল : ‘ধন্যবাদ দেওয়ার কিছু নেই, ডক্টর বিশ্বাস। একজন সাধারণ মানুষ যা করত আমি তা-ই করেছি—তার বেশি কিছু করিনি—।’
এইজন্যই বোধহয় জিশান অসাধারণ। ভাবলেন রঙ্গপ্রকাশ।
‘আপনি প্লিজ বসুন…।’
একটা সিঙ্গল সোফার দিকে ইশারা করলেন ডক্টর। চোখ মুছে নিজের জায়গায় বসে পড়লেন।
জিশান বসল—রঙ্গপ্রকাশের মুখোমুখি। সিমান আর পর্ণমালাকে একপলক দেখল। তারপর অ্যাক্সিডেন্টের শুরু থেকে সব বলতে শুরু করল।
গাড়িতেই সিমানের নেশার ঘোর কেটে গিয়েছিল। তখন গাড়ি থামিয়েছে গুনাজি। জিশান গাড়ি থেকে নেমে সিমানের পাশে গিয়ে বসেছে। ওকে এক হাতে জড়িয়ে ধরে সফট এনার্জি প্যাক থেকে অল্প-অল্প করে এনার্জি ড্রিংক ওকে খাইয়েছে। তারপর ওর শরীরটাকে যত্ন করে আঁকড়ে ধরে বসে থেকেছে।
গুনাজির স্টিয়ারিং তখন রঙ্গপ্রকাশের বাড়ির সঙ্গে ওঁর সি থ্রু অটোমোবিলের দূরত্ব দ্রুতগতিতে কমাচ্ছে।
‘সিমানের সবরকম মেডিক্যাল ট্রিটমেন্ট করা হয়ে গেছে—’ জিশান রঙ্গপ্রকাশের চোখে চোখ রেখে বলল, ‘এখন ওর শুধু রেস্ট দরকার।’
জিশানের কাছে সব ঘটনা শুনতে-শুনতে রঙ্গপ্রকাশের চোখ আবার ভিজে উঠেছে। তিনি চট করে উঠে দাঁড়ালেন। সিমান আর পর্ণমালার কাছে গেলেন। ছেলের মাথায় স্নেহমাখা হাত বোলালেন কয়েকবার। বাঁ-হাতের পিঠ দিয়ে নিজের চোখের জল মুছলেন। ভারী গলায় পর্ণমালাকে বললেন, ‘ওকে ভেতরে নিয়ে যাও। বিছানায় শুইয়ে দাও। রেস্ট—অ্যাবসোলিউট রেস্ট। ওকে এত ভাঙাচোরা দেখাচ্ছে…।’
পর্ণমালা ছেলেকে নিয়ে ধীরে-ধীরে চলে গেলেন ভেতরের ঘরের দিকে।
রঙ্গপ্রকাশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর হঠাৎই যেন খেয়াল করলেন, সামনের কম্পিউটারের পরদায় জিশান চলে-ফিরে বেড়াচ্ছে—কিন্তু কোনও শব্দ নেই।
কম্পিউটারের মনিটর থেকে পঁয়ত্রিশ ডিগ্রি নজর ঘোরালেই আসল জিশান।
রঙ্গপ্রকাশের বিজ্ঞানী সত্তা বলে উঠল, ‘আচ্ছা, ছবির জিশান, আর সামনে বসে থাকা জলজ্যান্ত জিশান—কাইনেসিকস কি এই দুজনের শরীরের ভাষার তুলনামূলক বিচার করে নতুন কোনও উত্তর বের করতে পারে?’
সামনে বসা জিশানকে দেখছিলেন রঙ্গপ্রকাশ। স্পষ্ট বুঝতে পারছিলেন, জিশান যতই বিনয় করে বলুক না কেন, ও আসলে সাধারণ নয়। ও যে অন্যরকম, তার একটা অদৃশ্য বিকিরণের তেজ রঙ্গপ্রকাশ অনুভব করতে পারছিলেন। সেইসঙ্গে সিমানকে নিরাপদে ফিরে পাওয়ার স্বস্তি এবং আনন্দ মনের ভেতরে বুদ্বুদের ফোয়ারা তৈরি করছিল। আর সামনে বসা তরুণটির প্রতি কৃতজ্ঞতার ঢেউ বুকের ভেতরে আছড়ে পড়ছিল বারবার।
জিশান ঘরটা অবাক চোখে দেখছিল। দেখছিল সেমি-ট্রান্সপারেন্ট গ্লাস পার্টিকল ইমপ্রেগনেটেড পলিমারের ফার্নিচার। আর দেওয়ালের জায়ান্ট প্লেট টিভি এবং প্লাজমা কম্পিউটারের মনিটর।
রঙ্গপ্রকাশ ওকে লক্ষ করছিলেন।
জিশানের কপালে একটু ভাঁজ পড়েছে। একটা ভুরু সামান্য উঁচিয়ে রয়েছে। হাত, হাতের আঙুল উদ্দেশ্যহীনভাবে ইতস্তত নড়াচাড়া করছে।
সব মিলিয়ে বিস্ময়, কৌতূহল, অস্বস্তি।
সত্যি, ‘কাইনেসিকস’ বড় বিচিত্র বিষয়। প্রায় চারশো বছর আগে নৃবিজ্ঞানী রে বার্ডহুইস্টেল প্রথম এই শব্দটা ব্যবহার করেছিলেন। তিনি গবেষণা করে বুঝতে চেয়েছিলেন, মুখের ভাবভঙ্গি, হাতের ইশারা, পায়ের নড়াচড়া, দাঁড়ানোর ঢং এসবের মাধ্যমে মানুষ কীভাবে ভাবের আদানপ্রদান করে। এই নন-ভার্বাল ল্যাঙ্গুয়েজ ফর্মের ব্যাকরণও তৈরি করেছিলেন তিনি। বলেছিলেন, আমরা যে সামাজিক জীবনে নিয়মিত ভাব বিনিময় করি তার মাত্র তিরিশ কি পঁয়ত্রিশ শতাংশ করি ভাষার মাধ্যমে—আর বাকিটা অভিব্যক্তি আর অঙ্গভঙ্গি দিয়ে।
