কানোরিয়ার মধ্যে কনট্রাডিকশানের চূড়ান্ত দেখে শ্রীধর ভেতরে-ভেতরে টগবগ করছিলেন।
কী আশ্চর্য মিহি অপাশি কানোরিয়ার গলার স্বর! এ যেন কোনও মেয়ের গলাকেও হার মানায়!
অথচ এই লোকটাই গুনে-গুনে বত্রিশটা মানুষকে ঠান্ডা মাথায় খুন করেছে! বত্রিশ রান!
কিল গেমের দিন ও নিশ্চয়ই অনায়াসে আরও একটা রান স্কোর করতে পারবে!
•
সিমানকে অনেকক্ষণ ধরে ফোন করে পাচ্ছিলেন না রঙ্গপ্রকাশ। ওঁর কপালে ভাঁজ পড়ছিল। একইসঙ্গে ব্যথার জগতে হারিয়ে যাচ্ছিলেন।
প্রায়ই এরকম হয়। ছেলেটা বলতে গেলে সবসময়েই রঙ্গপ্রকাশ আর পর্ণমালাকে দুশ্চিন্তায় রাখে। কে জানে কোনও বিপদে পড়ল কি না!
সিমানের সঙ্গে-সঙ্গে নিজের ইকনমিক ইনডেক্স-এর কথাও ভাবছিলেন। ভাবছিলেন ক্রিটিক্যাল ভ্যালুর কথা।
মাথার দুপাশ দপদপ করছিল। কেউ যেন প্যাঁচ ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে ইস্পাতের তুরপুন চালিয়ে দিচ্ছে মাথার ভেতরে।
পর্ণমালা পাশের ঘরে। বোধহয় পামটপ নিয়ে ব্যস্ত। নিশ্চয়ই ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট কাউন্সিলের ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল করার চেষ্টা করছে। হয়তো ছেলেকে নিয়ে দুশ্চিন্তাও করছে, কিন্তু পর্ণমালাকে বাইরে থেকে দেখে ওর ভেতরের ঝড় খুব একটা আঁচ করা যায় না। কিন্তু রঙ্গপ্রকাশের সে-দক্ষতা নেই। তাই ওঁর কান্না পেয়ে যাচ্ছিল।
গলা তুলে পর্ণমালাকে এক কাপ কফি দেওয়ার জন্য বললেন। দেখা যাক, এক কাপ কফি তুরপুনের তেজ কমাতে পারে কি না।
প্লাজমা কম্পিউটারের মনিটরের দিকে তাকালেন। সেখানে জিশানের ভিডিয়ো ছবি চলছে—তবে সাউন্ড ‘মিউট’ করে দেওয়া। শব্দহীন চলচ্চিত্র দেখছেন ডক্টর রঙ্গপ্রকাশ বিশ্বাস। কারণ, ওঁর প্রিয় এলাকা হল ‘কাইনেসিকস’। অর্থাৎ, অঙ্গভঙ্গি আর শরীরের ভাষার মাধ্যমে ভাবপ্রকাশচর্চার বিজ্ঞান। না বলা মনের ভাব, উদ্দেশ্য ইত্যাদি বিশ্লেষণের মাধ্যমে বুঝে নেওয়া।
এখন জিশানের নি:শব্দ ছবি দেখে ওর মনের ভেতরের রহস্য আরও গভীরভাবে বুঝতে চাইছেন। যা-যা বুঝতে পারবেন সেসব চলে যাবে জিশানের সাইকোলজিক্যাল প্রাোফাইলের ফাইলে।
ঠিক এমন একটা সময়ে, প্রায় ঘণ্টাখানেক আগে, অচেনা একটা নম্বর থেকে ফোন এসেছিল।
তিনি ‘হ্যালো’ বলামাত্রই ও-প্রান্ত থেকে জিশান পালচৌধুরীর গলা শোনা গিয়েছিল। হ্যাঁ, জিশান—জিশান পালচৌধুরী!
টেলিফোনে জিশানের বলা কথাগুলো রঙ্গপ্রকাশের মনের ভেতরে হঠাৎই বেজে উঠল আবার।
‘হ্যালো, জিশান বলছি—জিশান পালচৌধুরী…।’
উত্তর দেওয়ার সময় রঙ্গপ্রকাশের গলা কেঁপে গিয়েছিল। তারপর…।
তারপর, সিমানের কথা শোনার পর, মন এবং গলা সংযত করে জিশানকে ধন্যবাদ দিয়েছেন। কিন্তু ফোনে কথা বলা শেষ করার পর নিজেকে আর সুস্থির রাখতে পারেননি। তাসের ঘরের মতো ছত্রখান হয়ে গিয়েছেন।
মরণাপন্ন জন্তুর মতো আর্তনাদ করে ডুকরে উঠেছেন। পাঁজরার পলকা হাড়গুলো যেন পটপট করে মটকে যাচ্ছিল।
অদ্ভুত যন্ত্রণার শব্দে পর্ণমালা ছুটে এসেছেন কম্পিউটার রুমে। বিস্ময়ের ধাক্কা খেয়ে দেখেছেন বিজ্ঞানী স্বামী টেবিলের ওপরে মাথা রেখে সব-হারানো বাচ্চার মতো কষ্টে জর্জরিত হয়ে ছটফট করছেন।
পর্ণমালার হাত থেকে গরম কফির কাপ খসে পড়েছে অ্যান্টি-স্ট্যাটিক ফ্লোরে। কাপটা পাঁচ টুকরো হয়ে গেছে। আর কফিও ছড়িয়ে গেছে যেখানে-সেখানে।
ওঁর মুখ দিয়ে গোঙানির মতো ‘সিমান! সিমান!’ শব্দটা বেরিয়ে আসছিল বারবার। ওঁকে দেখে পায়ে কুচলে দেওয়া কেন্নোর মতো লাগছিল।
ছেলেকে যে তিনি কতটা ভালোবাসেন সেটা যেন আবার নতুন করে বুঝতে পারছিলেন রঙ্গপ্রকাশ। ভয় হচ্ছিল, তিনি বোধহয় শত-সহস্র টুকরোয় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে শেষ পর্যন্ত ধুলো হয়ে যাবেন।
কিন্তু সেটা হল না পর্ণমালার জন্য।
ছুটে এসে স্বামীকে জাপটে ধরে সামাল দিতে লাগলেন। সান্ত্বনা দিতে, সাহস জোগাতে কত না এলোমেলো কথা বললেন। তারই মধ্যে উতলা গলায় জিগ্যেস করছিলেন, ‘কী হয়েছে? সিমানের কী হয়েছে?’
ওঁদের আপাত সুন্দর সুখী বাড়িটার ভেতরে দুশ্চিন্তা আর শোকের ঢেউ উথলে উঠছিল বারবার। কিন্তু বাইরের রাস্তা থেকে সেসব কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না।
প্রায় চল্লিশ মিনিট পর ওঁরা সামলে উঠলেন। তারপর সোফায় হেলান দিয়ে থমথমে মুখে অপেক্ষা করতে লাগলেন। সিমান কখন আসবে কে জানে!
স্বামীকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য পর্ণমালা আরও তিনবার কফি তৈরি করে নিয়ে এলেন। রঙ্গপ্রকাশকে দিলেন, নিজেও নিলেন। তারপর পরিস্থিতির চাপ হালকা করার জন্য প্লাজমা কম্পিউটারে জিশানের হলোগ্রাম ভিডিয়ো ইমেজ দেখতে শুরু করলেন।
রঙ্গপ্রকাশের চোখের কোল ফোলা। বারবার নাক টানছেন। কিন্তু একইসঙ্গে ওঁর চোখ আটকে রয়েছে কম্পিউটারের পরদায়। কীভাবে যেন ওঁর বিজ্ঞানী সত্তার একটা ছোট্ট অংশ কৌতূহলী হয়ে উঠেছে। ‘কাইনেসিকস’ রঙ্গপ্রকাশকে উসকে দিচ্ছে।
এভাবে কতক্ষণ যে কেটেছে ডক্টরের খেয়াল নেই। হঠাৎই ওঁর কম্পিউটার রুমের দরজায় হাজির হয়ে গেল দুজন মানুষ।
জিশান আর সিমান।
রঙ্গপ্রকাশ কয়েক সেকেন্ড কোনও কথা বলতে পারলেন না। নিষ্পলক চোখে জিশানের দিকে তাকিয়ে রইলেন। এই টগবগে তরুণ কোন এক অলৌকিক প্রক্রিয়ায় প্লাজমা কম্পিউটারের মনিটর থেকে লাফিয়ে নেমে পড়েছে ওঁর ঘরের দরজায়।
