হরিমোহন মার্শালের দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, ‘স্যার, আপনি এক বছর আগে সেন্ট্রাল জেল মডার্নাইজেশানের জন্যে যে-তিরিশ কোটি টাকা গ্রান্ট দিয়েছিলেন সেটা ইউটিলাইজ করেই এসব হাই-টেক ব্যাপার করেছি। এই দেওয়াল পেরোলেই হার্ডকোর ক্রিমিনালদের এলাকা। তাই দেওয়ালটা আক্ষরিক অর্থেই একদম ”হার্ডকোর”—মানে, ট্রান্সপারেন্ট, রেসিলিয়েন্ট আর বুলেটপ্রুফ।’
কথা থামিয়ে পরিতৃপ্তির চোখে মার্শালের দিকে তাকালেন হরিমোহন।
প্রভুভক্ত অ্যালসেশিয়ানের পিঠ চাপড়ে দেওয়ার ঢঙে চিফ জেলারের পিঠ চাপড়ে দিলেন শ্রীধর : ‘আপনার এফিশিয়েন্সি আমি ভালো করেই জানি। সেইজন্যেই তো আপনার ওপরে এতটা ডিপেন্ড করি…।’
হরিমোহন জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটলেন। ওঁর লেজ থাকলে সেটা নিশ্চয়ই এখন এদিক-ওদিক দুলত।
স্বচ্ছ দেওয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে চারজন সিকিওরিটি গার্ড। তাদের কোমরে শকার এবং হাতে মিসাইল পিস্তল। ওদের দেখে মনে হচ্ছিল ওরা মানুষ নয়—পাথরের মূর্তি। হরিমোহন আর শ্রীধরকে দেখে ওরা যান্ত্রিকভাবে বাও করল।
দেওয়ালের গায়ে কোনও দরজা চোখে পড়ছিল না শ্রীধরের। ঠিক যেন একটা সিমলেস বিভাজন পাত।
তিনি সামান্য ভুরু কুঁচকে হরিমোহনের দিকে তাকাতেই হরিমোহন পকেট থেকে একটা ছোট রিমোট ইউনিট বের করে সেটা দেওয়ালের দিকে তাক করে একটা দশ ডিজিটের কোড ইনপুট করলেন।
স্বচ্ছ দেওয়ালের একটা স্বচ্ছতর অংশ নি:শব্দে একপাশে সরে গেল। হরিমোহন শ্রীধরকে নিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লেন।
হার্ডকোর ক্রিমিনালদের এলাকায় আলোর কোনও ঘাটতি নেই। এ ছাড়া তার নানা জায়গায় আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া।
হরিমোহন অলিপথ ধরে হাঁটছিলেন আর রিমোটের কীসব বোতাম টিপছিলেন। পাথরের মেঝেতে ওঁদের জুতোর শব্দ ফাঁকা প্রতিধ্বনি তুলছিল।
একটু পরেই একটা সেলের সামনে এসে দাঁড়ালেন দুজনে।
স্বচ্ছ ফাইবারে তৈরি একটা ওয়ান রুম স্টুডিয়ো ফ্ল্যাট। ভেতরে উজ্জ্বল আলো। একজন মোটাসোটা লোক টেবিলের কাছে বসে কী যেন লেখালিখি করছে।
হরিমোহন চাপা গলায় বললেন, ‘অপাশি কানোরিয়া, মার্শাল স্যার—।’
শ্রীধর দেখলেন, ঘরটা সুন্দরভাবে সাজানো। এমনকী ঘরে রঙিন টিভি পর্যন্ত রয়েছে।
না:, এদের যত্নআত্তির ব্যাপারে কোনও খামতি নেই। হরিমোহন জানেন, এরা নিউ সিটির বলতে গেলে অ্যাসেট।
শ্রীধরদের দিকে একবারও চোখ তুলে তাকাল না অপাশি। নিজের মনে লিখতে লাগল। তারপর হঠাৎই টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। পায়চারি করতে লাগল। শ্রীধরদের কাছাকাছি এসে থমকে দাঁড়িয়ে কী যেন ভাবতে লাগল।
অপাশি সরাসরি শ্রীধরদের দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু চোখে শূন্য দৃষ্টি।
শ্রীধর পাট্টা অস্বস্তি পাচ্ছিলেন। ইতস্তত করে অবাক চোখে চিফ জেলারের দিকে তাকালেন।
হরিমোহন হেসে বললেন, ‘আপনাকে চমকে দেব বলে আগে থেকে বলিনি, স্যার। আমি রিমোটের বোতাম টিপে একটা স্পেশাল কোড ইনপুট দিলেই এই সেলের ফাইবারের ওয়ালগুলো সব ওয়ান ওয়ে মিরার হয়ে যায়। তাই অপাশি ওর ঘরের দেওয়ালগুলোকে এখন আয়না হিসেবে দেখছে—আমাদের দেখতে পাচ্ছে না।’
শ্রীধর অপাশিকে দেখতে লাগলেন।
একটু আগে কম্পিউটারে যা দেখেছিলেন, কনট্রাডিকশান যেন তার চেয়েও অনেক বেশি। যেমন নিষ্পাপ চেহারা ঠিক তেমনই নিষ্পাপ বডি ল্যাঙ্গুয়েজ আর অভিব্যক্তি। তবে ছোট-ছোট সরু চোখের কোথায় যেন মিশে আছে এক ফোঁটা সতর্কতা।
শ্রীধরের কেন জানি না মনে হচ্ছিল, এই ওয়ান ওয়ে মিরারের গল্পটা অপাশির অজানা নয়।
বেশ কয়েক মিনিট অপাশিকে লক্ষ করলেন ওঁরা দুজনে। তারপর শ্রীধরের ইশারায় রিমোট কন্ট্রোল ইউনিটের বোতাম টিপে সেলের ফাইবার ওয়ালের ক্যারেকটার পালটে দিলেন হরিমোহন। ওটা এখন টু ওয়ে সি থ্রু ফাইবার শিট হয়ে গেল। সঙ্গে-সঙ্গে অপাশি ওঁদের দুজনকে দেখতে পেল। সরলভাবে একগাল হেসে দিল ও।
সেই মুহূর্তে কনট্রাডিকশানের মাত্রাটা এক ঝটকায় এমন বেড়ে গেল যে, শ্রীধর পাট্টার মতন মানুষও চমকে উঠলেন।
হরিমোহন আবার রিমোট ইউনিটের বোতাম টিপলেন।
ওঁদের সামনের দেওয়ালে আটটা ছোট-ছোট জানলা তৈরি হয়ে গেল। দুটো সারিতে চারটে করে খুদে জানলা—প্রত্যেকটা মাপে এক ইঞ্চি বাই এক ইঞ্চি।
হরিমোহন গর্বের হাসি নিয়ে ঘুরে তাকালেন মার্শালের দিকে। বললেন, ‘সেলের কয়েদিদের সঙ্গে কথা বলার জন্যে এই ব্যবস্থা, স্যার…।’
শ্রীধর ওঁর দিকে চেয়ে একচিলতে হাসলেন শুধু।
এবার হরিমোহন অপাশির দিকে ইশারা করে ওকে ডাকলেন : ‘মিস্টার কানোরিয়া, প্লিজ, আমাদের কাছে আসুন—।’
শ্রীধর অবাক হয়ে চিফ জেলারের দিকে তাকালেন।
চিফ জেলার বললেন, ‘ও ”আপনি-আজ্ঞে” ব্যাপারটা খুব পছন্দ করে। তাতে বেশ হাসি-খুশি আর শান্ত থাকে।’
অপাশি কানোরিয়া শ্রীধরদের খুব কাছে এসে দাঁড়াল। মুখে হাসি, চোখে সামান্য কৌতূহল।
চিফ জেলার শ্রীধরের সঙ্গে অপাশির পরিচয় করিয়ে দিলেন।
‘মিস্টার কানোরিয়া, ইনি হলেন নিউ সিটির পিস ফোর্সের মার্শাল মিস্টার শ্রীধর পাট্টা। ঠিকভাবে বলতে গেলে, ইনিই নিউ সিটির শেষ কথা…।’
হাসল কানোরিয়া। বলল, ‘যেমন এই জেলে আপনিই শেষ কথা।’ তারপর শ্রীধরের দিকে তাকিয়ে : ‘হাউ আর য়ু, মার্শাল,? নাইস টু মিট য়ু…।’
শ্রীধর কানোরিয়ার শেষের দিকের কথাগুলো ঠিকঠাক শুনতে পাচ্ছিলেন না। কারণ, ওঁর মাথায় ঘুরছিল কনট্রাডিকশান।
