শ্রীধর পাট্টা চেয়ারে বসে পড়লেন আবার। হরিমোহনকে ইশারায় বসতে বললেন। হরিমোহন ঘাড়টা সামান্য বেঁকিয়ে বোধহয় একটা বেয়াদব ব্যথাকে শায়েস্তা করলেন। তারপর একটা খালি চেয়ার টেনে নিয়ে শ্রীধরের একরকম মুখোমুখি বসে পড়লেন। ওঁদের দুজনের মাঝখানের ফাঁকা জায়গা দিয়ে আর্ক কম্পিউটারের মনিটর চোখে পড়ছিল। সেখানে অপাশি কানোরিয়ার বেশ কয়েকটা রঙিন ফোটোগ্রাফ।
বাঁ-হাতের পিঠের ওপরে ডানহাতের আঙুল দিয়ে কয়েকবার তাল ঠুকলেন শ্রীধর। ছোট করে ওপর-নীচে থুতনি নাড়লেন কয়েকবার। তারপর খুব আলতো গলায় বললেন, ‘এই ক্রিমিনালটাকে আমার পছন্দ হয়েছে। জিশান পালচৌধুরীর মোকাবিলা করতে হলে এরকম হার্ডকোর ক্রিমিনালই দরকার। ওর সি-ভি আমার দারুণ লেগেছে।’ অল্প হাসলেন শ্রীধর : ‘ওকে কোথায় পেলেন? লাস্ট কিল গেমের সময় যখন আমি সিলেকশানে এসেছিলাম তখন ওর সি-ভি তো স্টোরেজ ফাইলে ছিল না!’
ছোট্ট করে দুবার কাশলেন হরিমোহন। মার্শালের স্মৃতিশক্তির তারিফ না করে উপায় নেই!
তারপর ওপরের ঠোঁটটা একবার চেটে নিয়ে বললেন, ‘ঠিকই ধরেছেন, স্যার। অপাশি কানোরিয়া আমার জেলে এসেছে আড়াই মাস। ওর ডোসিয়ারের ফার্স্ট পেজে ওর এন্ট্রির তারিখটা লেখা আছে। ওল্ড সিটির নর্দার্ন বেল্টের পাহাড়ি এলাকা থেকে ওকে আমরা অ্যারেস্ট করেছিলাম।’
‘আমি ওর ফাইলটা ওপর-ওপর স্ক্যান করেছি। ভয়ংকর মানুষ হিসেবে খুবই অ্যাট্রাকটিভ সি-ভি। ওর টোটাল ফাইলটার একটা সফট কপি আর একটা হার্ড কপি কাল বিকেলের মধ্যে আমার কিল গেমের ইন-বক্সে পাঠিয়ে দেবেন। এখন ওর ব্যাপারে ইন আ নাটশেল কিছু আমাকে বলবেন?’
জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটলেন হরিমোহন। বিনা প্রয়োজনে হাত কচলানোর ঢঙে হাতে হাত ঘষলেন। তারপর : ‘আপনি এগজ্যাক্টলি কী জানতে চাইছেন জানি না, স্যার… তবে…অপাশির ফেরোসিটি কোশেন্ট হল 9.4—অর্থাৎ, আলট্রা-হাই রেঞ্জে…।’
নিউ সিটির সেন্ট্রাল জেলে ভয়ংকর ক্রিমিনালদের রেটিং ঠিক করা হয় ফেরোসিটি স্কেল দিয়ে—অনেকটা ভূমিকম্পের রিখটার স্কেলের মতো। একজন অ্যাভারেজ ক্রিমিনালের ফেরোসিটি কোশেন্ট হল 4.5। আর, একজন সিরিয়াল কিলারের ফেরোসিটি কোশেন্ট 8.0।
শ্রীধর পাট্টার নির্দেশে ডক্টর মনসুখ চক্রপাণি আর ডক্টর গণপত আচারিয়া—যাঁদের শ্রীধর যথাক্রমে ‘এ’ এবং ‘কিউ’ বলে ডাকেন—এই ফেরোসিটি স্কেলের কনসেপ্ট আর তার ভ্যালু কমপিউট করার ইমপিরিক্যাল ফরমুলা আবিষ্কার করেছেন। সেন্ট্রাল জেলে সব অপরাধীরই ফেরোসিটি স্কেল হিসেব করা আছে।
‘চমৎকার! চমৎকার!’ হাঁটুতে ছোট-ছোট তিনটে চাপড় মারলেন শ্রীধর। ফেরোসিটি স্কেল যার ৯.৪ তার কাছ থেকে অনেক কিছুই আশা করা যেতে পারে।
দুবার জোরে-জোরে নাক টানলেন। তারপর ভুরু উঁচিয়ে হরিমোহনকে জিগ্যেস করলেন, ‘আর ফিজিক্যাল স্ট্রেংথ? সেটা কীরকম?’
হরিমোহন চটপট জবাব দিলেন, ‘সেটাও খারাপ নয়। তবে ওর হাত আর কাঁধে জোর সবচেয়ে বেশি। স্রেফ চপার চালিয়ে অপাশি একটা ছোটখাটো গাছের গুঁড়ি এককোপে কেটে ফেলতে পারে—।’
‘আর কোনও ইমপরট্যান্ট ইনফরমেশান?’
একটু ইতস্তত করলেন। তারপর : ‘এটা আদৌ কোনও ইনফরমেশান কি না জানি না—তবে অপাশি একটু একাচোরা টাইপের…।’
‘মানে?’
‘মানে…মানে…সবসময় একা-একা থাকতে ভালোবাসে। বিকেলের রিল্যাক্স আওয়ারে ও কারও সঙ্গে মেশে না। উঁহু, ”মেশে না” কী বলব, কথাই বলে না…।’
থুতনিতে আঙুল বোলালেন শ্রীধর। বিড়বিড় করে বললেন, ‘ওর সি-ভি-তে ক্রাইম রেকর্ডও একই কথা বলছে। সবক’টা খুন ও একা করেছে—সঙ্গে কোনও অ্যাকমপ্লিস নেয়নি। হি ইজ আ লোন অপারেটার।’
চিফ জেলারের সঙ্গে আরও কিছুক্ষণ কথা বলার পর শ্রীধর বললেন, ‘এবার আমি অপাশি কানোরিয়াকে দেখব। ওর সঙ্গে কথা বলব—।’
‘অফ কোর্স, স্যার।’ হরিমোহন চোখের পলকে ‘হুজুরে হাজির’ হয়ে গেলেন। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।
সঙ্গে-সঙ্গে দুজন অফিসার তাঁদের শরীরের ঢিলেঢালা ভাবটাকে পলকে ঝেড়ে ফেলে টান-টান হয়ে দাঁড়ালেন।
‘অপাশি কানোরিয়া—’ হরিমোহন বললেন : ‘কোড নম্বর A-1207। মার্শাল স্যার ওর সঙ্গে দেখা করতে যাবেন—কথা বলবেন। যান, গিয়ে অ্যারেঞ্জমেন্ট করুন, আমি মার্শাল স্যারকে নিয়ে আসছি…।’
অফিসার দুজন জুতোর গটগট শব্দ করে চলে গেলেন।
ওদের মিনিট দশেক সময় দিলেন হরিমোহন। শ্রীধরের সঙ্গে সেন্ট্রাল জেলের নানান সুবিধে-অসুবিধে নিয়ে কথা বলতে লাগলেন। তারপর একসময় বিনীত গলায় মার্শালকে বললেন, ‘চলুন, স্যার। অপাশি কানোরিয়া—।’
হরিমোহন চট্টোপাধ্যায় পথ দেখিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন। শ্রীধর চুপচাপ ওঁকে অনুসরণ করতে লাগলেন।
করিডর আর তার দুপাশের ঘর, দেওয়াল ইত্যাদি, আলোর ব্যবস্থা, এমনকী সিলিংও যথেষ্ট আধুনিক এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। দেখে জেলের বদলে একটা থ্রি স্টার হোটেলের কথা আগে মনে পড়ে। জেলের এই স্তরের যত্ন নেওয়ার খরচ জোগায় সিন্ডিকেট—অথবা, আরও সরাসরি বলা ভালো—শ্রীধর পাট্টা। কারণ, এই জেলের হার্ডকোর ক্রিমিনালদের ওপরে নির্ভর করছে কিল গেমের জনপ্রিয়তা এবং সাফল্য, বিজ্ঞাপনের রেভিনিউ, নিউ সিটির ইকনমি।
কিছুক্ষণ হাঁটার পর ওঁরা একটা লেসার ডিসপ্লে দেখতে পেলেন। তাতে লাল আলোর হরফে ইংরেজিতে লেখা ‘রেস্ট্রিকটেড এরিয়া’। তারপরই বিভাজনের স্বচ্ছ দেওয়াল।
