পকেট থেকে ছোট্ট একটা শিশি বের করলেন। হাঁ করে মুখ তুললেন ওপরদিকে। শিশির ছিপি খুলে কয়েক ফোঁটা এনার্জি সল জিভে ঢাললেন। তারপর আওয়াজ করে স্বাদ নেওয়ার ঢঙে জিভ দিয়ে টাকরায় টকাস-টকাস শব্দ করলেন। শরীরে শক্তির আগুন ঝাঁজিয়ে উঠল।
কিল গেমের তারিখ ক্রমশ এগিয়ে আসছে—দরজায় কড়া নাড়ছে।
শ্রীধর পাট্টার পাশে তিনজন অফিসার দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁদের প্রত্যেকের গায়ে ব্ল্যাক ইউনিফর্ম। নিউ সিটির সেন্ট্রাল জেলের সব অফিসারের পোশাকই এইরকম। শুধু চিফ জেলারের বুকে দশটা সিলভার স্টার বসানো।
চিফ জেলার হরিমোহন চট্টোপাধ্যায় শ্রীধরের ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। চেহারায় ছোটখাটো কিন্তু স্মার্ট। চোখে সরু মেটাল ফ্রেমের চশমা।
হরিমোহন জানেন যে, জানেন যে, কিল গেমের আগে মার্শাল নিজে সেন্ট্রাল জেলে আসেন। কিল গেমের তিনজন প্লেয়ারকে চুলচেরা বিচারের পর সিলেক্ট করেন। সেই সিলেকশানের সময় মার্শালের নানান প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। ডেথ সেন্টেন্স পাওয়া অপরাধীদের সম্পর্কে নানারকম তথ্যের জোগান দিতে হয়। সেজন্যই হরিমোহন সঙ্গে দুজন জুনিয়ার অফিসারকে ডেকে নিয়েছেন।
ওঁরা চারজন এখন যে-ঘরটায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন সেটা সেন্ট্রাল জেলের কন্ট্রোল রুম।
নিউ সিটি আর ওল্ড সিটির সীমানার গা ঘেঁষে সেন্ট্রাল জেলের চার কিলোমিটার বাই দু-কিলোমিটার বিস্তৃত এলাকা। শুটারে চড়ে উড়ে আসার সময় ওপর থেকে নীচে তাকালে সেন্ট্রাল জেলের মানচিত্রটা ছবির মতো ধরা পড়ে।
জেল এলাকার একটা দিক পরিখা বরাবর টানা দু-কিলোমিটার। সেদিক দিয়ে কোনও অপরাধীর জেল ভেঙে পালানোর কোনও উপায় নেই। কারণ, পরিখার খাড়া কংক্রিটের দেওয়াল। সেই দেওয়াল বরাবর পঁচিশ ফুট গভীরতায় গেলে তবেই জলের শুরু। আর সেই গভীর খালের মধ্যে কিলবিল করছে বিষধর সাপ আর পিরানহা মাছ। ওরা যাতে আরামে বেঁচে থাকতে পারে সেজন্য জলের উষ্ণতা, নোনতা ভাব—সবকিছুই সূক্ষ্ম পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
পরিখার দিকটা জেল বিল্ডিং-এর পিছনদিক। বিল্ডিংটা লম্বায় পাঁচশো মিটার। একতলা। গ্র্যানাইট পাথরে তৈরি। বিল্ডিং-এর সব গেটেই বুলেটপ্রুফ পলিমারের অটোমেটিক শাটার। সেন্ট্রাল লকিং সিস্টেম দিয়ে লক করা।
জেল বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে এলে পাওয়া যাবে এক অদ্ভুত দৃশ্য।
ডানদিকে আর বাঁ-দিকে সাড়ে সাতশো মিটার করে ধু-ধু মাঠ। আর সামনে চার কিলোমিটার ফাঁকা জায়গা। সেখানে দেড়-দু-ইঞ্চি লম্বা মিহি ঘাসের শিষ ছাড়া আর কিছু নেই। তাও ঘাস রয়েছে কোথাও-কোথাও—বেশিরভাগ জায়গাটাই ধুলো মাখা ধূসর মাঠ।
জেল বিল্ডিং ছাড়া বাকি জায়গাটা হাতের তালুর মতো ফাঁকা। পোকামাকড় ছাড়া আর কোনও প্রাণীর পক্ষে সেই খোলা জায়গায় লুকোনো সম্ভব নয়। যদি কোনও ক্রিমিনাল জেল ভেঙে পালাতে পারে তা হলে জেল বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে তাকে ধু-ধু মাঠের ওপর দিয়ে অন্তত সাড়ে সাতশো মিটার পেরোতে হবে।
সেই সময় তাকে লক্ষ্য করে ছুটে আসবে রক্ষীদের মিসাইল পিস্তলের গুলি। এই আলট্রামডার্ন পিস্তলের গুলি ইনফ্রারেড সোর্স লক্ষ্য করে ছুটে যায়। মানুষের শরীর থেকে যে-ইনফ্রারেড তাপ-তরঙ্গ বেরোয় সেটাই গুলিটাকে জানিয়ে দেয় কোথায় গিয়ে তাকে আঘাত করতে হবে। মানুষটা যেভাবেই এঁকেবেঁকে দৌড়োক না কেন গুলিও ‘বুদ্ধিমান’ ছুঁচোবাজির মতো তার পিছন-পিছন এঁকেবেঁকে ছুটবে। তারপর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সে ছুটন্ত মানুষটাকে গতিতে হারিয়ে দেবে। এবং খেল খতম।
ধরে নেওয়া যাক, কোনও অপরাধী মিসাইল পিস্তলের গুলিকে ফাঁকি দিয়ে জেল এলাকার সীমানায় পৌঁছতে পারল।
সেখানে তার মুখোমুখি হবে কুড়ি ফুট উঁচু বুলেটপ্রুফ পলিমারের মসৃণ স্বচ্ছ পাঁচিল। সেই পাঁচিল পেরোলেই মুক্তি।
কিন্তু সেই পাঁচিলের মাথার দিকে প্রায় এক ফুট-জায়গা জুড়ে রয়েছে অনেকগুলো সমান্তরাল তামার তার। সূর্যের আলোয় ঝকঝক করছে। পলিমার অন্তরক পদার্থ হওয়ায় তামার তারগুলো পলিমারের মধ্যে অর্ধেকটা করে গেঁথে বসানো—পরিভাষায় যাকে বলে এমবেড করা। সেই তারে রয়েছে 6.6 কিলোভোল্ট এসি সাপ্লাই।
স্বচ্ছ পাঁচিলের মাথায় যদি কেউ উঠতে চায় তা হলে তাকে ভয়ংকর শক খেয়ে মরতে হবে।
জেল এলাকার ধু-ধু মাঠের নানান জায়গায় রয়েছে ওয়াচ টাওয়ার।
ওয়াচ টাওয়ারগুলো একটু অদ্ভুত চেহারার।
স্বচ্ছ ফাইবারের একটা লম্বা খুঁটি খাড়া উঠে গেছে ওপরদিকে। সেই খুঁটির মাথায়—প্রায় চল্লিশ ফুট ওপরে—রয়েছে একটা ট্রান্সপারেন্ট কিউবিকল। সেখানে একজন সান্ত্রী মিসাইল পিস্তল নিয়ে পাহারা দিচ্ছে।
ওয়াচ টাওয়ারে যেহেতু ওঠা-নামার কোনও সিঁড়ি নেই তাই সান্ত্রী বদলের কাজটা করা হয় শুটার দিয়ে। সেন্ট্রাল জেলের আন্ডারে মোট দশটা শুটার রয়েছে।
ওয়াচ টাওয়ারের মাথা থেকে ছাতার ফ্রেমের মতো ন’টা মেটালিক আর্ম বেরিয়ে রয়েছে। প্রায় দশমিটার লম্বা এই বাহুগুলোর প্রান্তে লাগানো রয়েছে অতি শক্তিশালী মেটাল হ্যালাইড ল্যাম্প। রাতে এই বাতিগুলো জেল এলাকাকে আলোর বন্যায় ভাসিয়ে দেয়। সেই আলোয় একটা নেংটি ইঁদুরও ছায়ার আড়াল খুঁজে পায় না।
নিউ সিটির সেন্ট্রাল জেল নিউ সিটির গর্ব। দেশবিদেশ থেকে বহু হোমরাচোমরা মানুষ এই হাই-টেক আলট্রামডার্ন জেল দেখতে আসেন। এটা শ্রীধর পাট্টার খুব ভালো লাগে। গর্বে বুক কয়েক ইঞ্চি ফুলেও ওঠে হয়তো। কারণ, এই সেন্ট্রাল জেলের চিফ ডিজাইনার শ্রীধর নিজে।
