জিশানের চোখ এবার গুনাজিকে খুঁজতে লাগল।
বেশিক্ষণ খুঁজতে হল না। বরং গুনাজিই ওকে খুঁজে নিল। জটলার ফাঁক দিয়ে আচমকা হাজির হল। তারপর জিশানের হাত ধরে টান মারল : ‘দাদা, শিগগির চলে এসো—।’
ওরা দুজনে প্রায় দৌড়তে শুরু করল।
অটো-এলিভেটরে করে নামার সময় জিশান বলল, ‘সিমানের এনার্জি প্যাক তো আর নেওয়া হল না…।’
গুনাজি হাঁপাতে-হাঁপাতে বলল, ‘পথে কোথাও গাড়ি দাঁড় করিয়ে নিয়ে নেব।’
জিশানের ভালো লাগছিল না। ওর গাল জ্বালা করছিল। ও মারপিট করতে চায়নি। হুলস্থূল বাধাতেও চায়নি। কিন্তু কোথা থেকে যে কী হয়ে গেল!
পার্কিং লটে এসে ওরা গাড়িতে উঠে বসল। জিশান তাকাল সিমানের দিকে। এখনও অঘোরে ঘুমোচ্ছে।
গুনাজি গাড়িতে স্টার্ট দিতেই জিশান বলল, ‘তাড়াতাড়ি চলো। আমাদের অনেক দেরি হয়ে গেছে।’
‘চিন্তা কোরো না, দাদা—এক্ষুনি পৌঁছে যাব।’
বাইরে সন্ধে নেমে গেছে। রাস্তার দুপাশের বাড়িগুলোয় আলো জ্বলে গেছে। কখনও-কখনও চোখে পড়ছে বিজ্ঞাপনের রঙিন নকশা। এই রাতটাকে দেখে বোঝার উপায় নেই নিউ সিটি হিংসা আর প্রতিহিংসার ব্যাবসা করে।
জিশানের নিজের ওপরে ঘেন্না হল।
বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর ও অনেকটা যেন আপনমনেই বলল, ‘বিশ্বাস করো, আমি মারপিট করতে চাইনি…।’ নাকি কথাটা ও বলল মিনিকে?
সামনের রাস্তার দিকে চোখ রেখে গুনাজি বলল, ‘জানি, দাদা। আমি মার্শালের অফিসে খবর পৌঁছে দিয়েছি। বলেছি, তোমাকে ওই গুন্ডাগুলো টরচার করতে-করতে মেরেই ফেলত। বলেছি, তোমার কোনও দোষ নেই। দেখো, মার্শাল তোমাকে কিছুই বলবে না—গ্যারান্টি।’
শেষ শব্দটা শুনে জিশানের হাসি পেয়ে গেল। কিন্তু হাসতে গিয়েই গালে টান পড়ল। গালের জ্বালাটা বেড়ে গেল।
রঙ্গপ্রকাশের বাড়ি আর কতদূর? মনে-মনে ভাবল জিশান।
•
একটা আর্ক কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে বসে ছিলেন শ্রীধর পাট্টা। ধনুকের মতো বাঁকানো এল. সি.ডি. পরদায় একটা লোকের নিরীহ মুখ। ফরসা। বেশ গোলগাল দেখতে। চোখগুলো ছোট-ছোট। গালে থুতনিতে খাপছাড়াভাবে হালকা দাড়ি।
মুখটা খুঁটিয়ে দেখে শ্রীধরের পছন্দ হল। দারুণ কনট্রাডিকশান। দেখে যা মনে হয় না লোকটা ঠিক তাই। লোকটার মুখে কেমন একটা নিষ্পাপ বাচ্চা-বাচ্চা ভাব। অথচ লোকটা প্রথম সারির একজন হার্ডকোর ক্রিমিনাল। অপাশি কানোরিয়া। বয়েস পঁয়ত্রিশ কি ছত্রিশ।
ওর যা বয়েস ওর খুনের সংখ্যাও প্রায় তাই। এ পর্যন্ত বত্রিশটা খুন করেছে অপাশি। তার মধ্যে তিনটে ফ্যামিলি আছে যাদের ও এক-এক খেপে খুন করে রক্তের হোলি খেলেছে। পরিভাষায় যাকে বলে ম্যাসাকার।
প্রথম ফ্যামিলিতে চারজন ছিল। মাঝবয়েসি বাবা-মা। আর তাদের সদ্য তরুণ ছেলে আর মেয়ে। চপার হাতে আধঘণ্টার মধ্যে সেই চারজনকে ঘুমন্ত অবস্থায় খতম করেছিল অপাশি। ওদের ফ্ল্যাট রক্তে ভেসে গিয়েছিল।
দ্বিতীয় ফ্যামিলিতে ছিল পাঁচজন। অল্পবয়েসি বাবা-মা, আর তাদের ছোট-ছোট তিন সন্তান। দু-ছেলে, এক মেয়ে।
এই হত্যালীলায় অপাশি কানোরিয়ার অস্ত্র ছিল চপার আর শাবল। শাবলটা ও ওদের বাড়ির বাগানে খুঁজে পেয়েছিল।
তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ বুঝতে পেরেছিল যে, বয়েসে সবচেয়ে ছোট আট বছরের মেয়েটাকে অপাশি সবার শেষে খুন করেছিল। ওকে তাড়া করে অপাশি ধরে ফেলে বাড়ির বাগানে। তারপর ওইটুকু বাচ্চা মেয়েকে জঘন্য হেনস্থা করে শাবল দিয়ে পিটিয়ে মেরেছিল।
তৃতীয় ফ্যামিলিতে সদস্যের সংখ্যা ছিল তিন। বাবা-মা আর ষোলো বছরের একটি মেয়ে।
মাথায় থান ইটের বাড়ি মেরে অপাশি প্রথমে ওদের তিনজনকে অজ্ঞান করে দিয়েছিল। তারপর ইলেকট্রিকের তার দিয়ে কষে ওদের হাত-পা বেঁধে ফেলেছিল। সবশেষে ওদের গায়ে পেট্রল ঢেলে ওদের জ্যান্ত পুড়িয়ে মেরেছিল।
এ ছাড়া নানান কারণে অপাশি প্রচুর খুচরো খুন করেছে। ক্রিকেট খেলায় বাউন্ডারি না মেরে খুচরো এক রান কি দু-রান নেওয়ার মতো। ওর খুন-খুন খেলায় বাউন্ডারি বলতে ওই তিনটে : চার, পাঁচ, আর তিন।
আর্ক কম্পিউটারের পরদায় অপাশি কানোরিয়ার হুলিয়া দেখছিলেন শ্রীধর। আর ওর অত্যন্ত পোটেনশিয়াল সি-ভি খুটিয়ে পড়ছিলেন। কিল গেমের পক্ষে অপাশির সি-ভি সত্যিই এক্সপ্লোসিভ মেটিরিয়াল।
অপাশি কানোরিয়া সম্পর্কে যতটুকু জানা যায় তার সবই রয়েছে এই সফট ফাইলে। আর সমস্ত বিবরণের পর রয়েছে ফোটো-ফাইল। সেখানে অপাশির নানান ঢঙে তোলা অসংখ্য রঙিন ছবি রয়েছে। আর তার পরে, ওর জীবনীর শেষ অধ্যায় হিসেবে, রয়েছে ওর সাইকোলজিক্যাল প্রাোফাইল।
পরদার ওপরে ঝুঁকে পড়ে শ্রীধর পাট্টা লেখাগুলো এক মনে পড়ছিলেন আর ছবিগুলো খুঁটিয়ে দেখছিলেন। একইসঙ্গে মনের মধ্যে খুশি ছটফটিয়ে উঠছিল। কিল গেমে জিশানের সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য অপাশি কানোরিয়া ক্যান্ডিডেট হিসেবে একেবারে ‘খাপে খাপ, আবদুল্লার বাপ!’
ঠোঁটের কোণে হাসলেন শ্রীধর। কনট্রাডিকশান। সাইকোলজিক্যাল প্রাোফাইল যা বলছে, খুনি হিসেবে কানোরিয়ার দক্ষতা, হিংস্রতা আর অভিজ্ঞতা যা বলছে, ওর ফোটোগ্রাফগুলো ঠিক তার বিপরীত। যেন হাসি-খুশি এক নিষ্পাপ গোলগাল শিশু—যে একটা মশাও মারতে পারে না।
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন শ্রীধর। কিল গেমে জিশান পালচৌধুরীর সঙ্গে খেলার জন্য প্রথম প্লেয়ার বাছা হয়ে গেছে।
