জিশান যেন একটা শক খেল। ঝাপসা নজর স্পষ্ট হয়ে গেল পলকে। চটপট হাত-পা নেড়ে ও শরীরের ভেতরের একটা অদৃশ্য সুইচ অন করে দিল। শত্রুর সঙ্গে লড়াইয়ের সুইচ।
জিশান সবে চামোনের দিকে এক পা এগিয়েছে, সঙ্গে-সঙ্গে একটা চাপা গুঞ্জন উঠল। ফুড মলের দুজন সিকিওরিটি গার্ড গোলমালের খবর পেয়ে অকুস্থলে এসে হাজির হয়েছে। ওদের পরনে খাকি আর কালো রঙের নকশাদার ইউনিফর্ম। মাথায় কাপড়ের টুপি। হাতে লম্বাটে ওয়াকিটকি।
গার্ড দুজন চিৎকার করতে-করতে আসছিল আর মাঝে মাঝে ওয়াকিটকিতে কথা বলছিল।
ওরা ভিড়ের বৃত্ত ঠেলে-ঠেলে ভেতরে ঢুকে এল। চামোন আর জিশানকে লক্ষ করে একজন বলল, ‘অ্যাই এক্ষুনি হুজ্জুতি বন্ধ করো। যাও, বাইরে যাও!’
দ্বিতীয় গার্ড বলল, ‘এখানে এসব লাফড়া চলবে না। এক্ষুনি পিস ফোর্সের কাছে হ্যান্ডওভার করে দেব…।’
এরপর যা হল সেটা জিশান কল্পনাও করেনি।
চামোন গার্ড দুজনের দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে নি:শব্দে হাসছিল। কিন্তু ওর দুজন দোস্ত সবাইকে চমকে দিয়ে গার্ড দুজনের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
কোঁকড়ানো লম্বা চুল ছেলেটা সাপের ছোবলের ক্ষিপ্রতায় একজন গার্ডের ওয়াকিটকি কেড়ে নিয়ে সেটা প্রবল শক্তিতে সেই গার্ডের ব্রহ্মতালুতে বসিয়ে দিল। গার্ডটা একটা ‘আঁক’ শব্দ করে স্রেফ খসে পড়ল মেঝেতে।
ভুরুতে মাকড়িওয়ালা ব্যাকব্রাশ চুল সরাসরি দ্বিতীয় গার্ডটার গলা টিপে ধরল দু-হাতে। এবং নিজের মাথা দিয়ে সাংঘাতিক এক ঢুঁ মারল।
গার্ডটার মাথা কাত হয়ে গেল একপাশে। তখন ব্যাকব্রাশ চুল ওকে এমন হেলাফেলা করে ছুড়ে দিল যেন একটা ন্যাকড়ার পুতুল—তাও আবার জলে ভেজা।
গার্ড দুজনকে ডিঅ্যাক্টিভেট করার ব্যাপারটা এত আচমকা ঘটে গেল যে, জমায়েত পাবলিক হইচই চিৎকার করারও সুযোগ পেল না। মুহূর্তের জন্য সবাই কেমন থম মেরে গেল।
কদমছাঁট চুল হঠাৎই শব্দ করে হাততালি দিয়ে উঠল। আর একইসঙ্গে একজোড়া বন্ধুকে লক্ষ করে বলে উঠল, ‘শাবাশ! জিয়ো:!’
উত্তরে ব্যাকব্রাশ চুল মাথা নেড়ে সিটি বাজাল তিনবার। তারপর গার্ড দুজনের নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে চাপা গলায় নোংরা খিস্তি করে উঠল।
চামোন বক্সারদের মতো লাফাতে-লাফাতে জিশানের কাছে এগিয়ে এল। তারপর প্রচণ্ড এক ঘুসি মারার জন্য ডানহাতটা মুঠো করে পিছিয়ে নিয়ে এল।
গুনাজি আর থাকতে পারল না। চিৎকার করে উঠল, ‘দাদা, এবার মারো! পালটা মারো!’
জিশান যেন হঠাৎই ঘুম থেকে জেগে উঠল। হাড়ে-হাড়ে বুঝতে পারল ওর গাঁধিগিরি ব্যর্থ হয়েছে। কারণ গাঁধিগিরি প্রয়োগ করা যায় মানুষের ওপরে—অমানুষের ওপরে নয়। তা ছাড়া যে-গুনাজি একটু আগে ওকে ‘ঝামেলায়’ জড়াতে বারণ করছিল সে-ই গুনাজিই এখন বলছে, ‘দাদা, এবার মারো! পালটা মারো!’
জিশানের তাজ্জব লাগল। দুনিয়া কী দ্রুতই না রং পালটায়।
সুতরাং জিশান ডানহাঁটু ভাঁজ করে শূন্যে লাফ দিল বাজপাখির মতো। সামনে হাত বাড়িয়ে দু-হাতের তালুতে বন্দি করল কদমছাঁটের মাথা। এবং হাঁটুর গাঁট দিয়ে ওর চিবুকের নীচে এক মরণ-আঘাত করল।
ব্যাপারটা সেখানেই থামল না। ওর মুন্ডু শক্ত করে আঁকড়ে ধরে মেঝেতে চিৎ হয়ে আছড়ে পড়ল জিশান। সেই প্রবল টানে মাথায়-মাথায় ঠোকাঠুকি হল। শব্দ শুনে মনে হল এই বুঝি কারও খুলিতে ফাটল ধরল।
জিশানের মুখে তখন ছুঁয়ে রয়েছে কদমছাঁটের মুখ। নাকে আসছে উৎকট ঘামের গন্ধ। জিশান যেন চিড়িয়াখানায় কোনও জন্তুর খাঁচায় ঢুকে পড়েছে হঠাৎ।
নিউ সিটি জিশানকে লড়াইয়ের এইসব কলাকৌশল শিখিয়েছে। শিখিয়েছে জঙ্গলের মধ্যে কীভাবে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। তাই নিউ সিটির এই অসভ্য জানোয়ারটাকে নিউ সিটির শিক্ষা ফেরত দিচ্ছিল ও। এবং তারই শেষ দফা হিসেবে ও কদমছাঁটের গালে ভয়ংকর এক কামড় বসাল। ব্যাকরণের বাইরে লড়াই।
এর ফলে যে-চিৎকারটা তৈরি হল তাকে ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। কসাইখানায় ছুরি যখন আগু-পিছু করে কোনও শুয়োরের গলা কাটে তখন সে বোধহয় এরকম আর্তনাদই করে থাকে।
জিশান শরীরটাকে কয়েক পাক গড়িয়ে ছিটকে সরে এল চামোনের কাছ থেকে। ও তখন গালে হাত চেপে কাটা পাঁঠার মতো ছটফট করছে আর একইসঙ্গে পাগলের মতো চিৎকার করছে। ওর আঙুলের ফাঁক দিয়ে চুইয়ে-চুইয়ে রক্ত বেরিয়ে আসছে।
পাবলিক এবার চিৎকারের ঢেউ তুলল। তাতে উত্তেজনার সঙ্গে মিশে আছে ভয়ের ছোঁয়া। কেউ-কেউ ভয়ে সরে গেল অন্য কোথাও। কারা যেন কাদের নাম ধরে ডাকাডাকি করছে। কেউ বা ব্যস্তভাবে মোবাইল ফোনের বোতাম টিপছে।
জিশান উঠে দাঁড়াল। ওর চোখ, মুখ, চোয়ালের রেখা এখন অন্যরকম লাগছে। জিভে নোনা স্বাদ। সত্যিই ও এখন কিল গেমের পার্টিসিপ্যান্ট।
চামোনের দু-বন্ধু জিশানের প্রতিরোধের চেহারা দেখে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। জিশানের ক্ষমতা আর শক্তি ওরা এতক্ষণ আঁচ করতে পারেনি। কিন্তু এখন আঁচ করতে পারা সত্বেও বন্ধুর হেরে যাওয়ার অপমানের বদলা নিতে ওরা তিরবেগে ঝাঁপিয়ে এল জিশানের দিকে।
কিন্তু ওই পর্যন্তই।
ওরা বুলেটের মতো জিশানের দিকে আসছিল, কিন্তু ওদের রুখে দিল পাবলিক।
কোঁকড়াচুল আর ব্যাকব্রাশ এটা কল্পনাও করেনি। ওদের সঙ্গে পাবলিকের হুড়োহুড়ি আর ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে গেল। রেস্তরাঁর সামনের লাউঞ্জটা মুহূর্তে কুরুক্ষেত্রের চেহারা নিল।
