জিশান তাও হাল ছাড়ল না। ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে হাতজোড় করে ওদের শান্ত হওয়ার জন্য অনুরোধ করতে লাগল।
উত্তরে সমবেত জনতাকে রীতিমতো চমকে দিয়ে চামোন জিশানের রগে সপাটে এক ঘুসি বসিয়ে দিল।
পটকা ফাটার শব্দ হল। জিশানের বাঁ-কানে তালা লেগে গেল পলকে। একইসঙ্গে ও কাচ-চকচকে মার্বেলের মেঝেতে ছিটকে পড়ল।
ও যাতে গায়ের ওপরে এসে না পড়ে সেজন্য ভিড়ের বৃত্ত চট করে সরে গেল পিছনে। চিৎকারের একটা ঢেউ উঠল লাউঞ্জে।
গুনাজি আর দেরি করল না। পকেট থেকে একটা স্যাটেলাইট ফোন বের করে বোতাম টিপতে শুরু করল। পিস ফোর্সের লোকাল ইউনিটে এখনই খবর দেওয়া দরকার।
জিশান ঘুসির আঘাতটা সামলে নিতে পারল। মাসের পর মাস ধরে নিউ সিটিতে ট্রেনিং নিয়ে ও লড়াই করতে যেমন শিখেছে, সহ্য করতেও তেমন শিখেছে। ওর রোজকার ওয়ার্কআউট রুটিনে এক কণাও ছন্দপতন হয়নি। তাই মেঝেতে দুবার পাক খেয়েই ওর শরীরটা আবার উঠে দাঁড়াতে পেরেছে।
চামোন তখন পরের আক্রমণের জন্য তৈরি হয়ে অপেক্ষা করছে।
ওদের ঘিরে মানুষের ভিড় আরও বেড়েছে। জিশানকে চিনতে পেরে অনেকেই অবাক হয়ে গুনগুন করে ওর নাম বলছে, নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে।
জিশান শান্ত গলায় চামোনকে বলল, ‘ভাই, আমি মারপিট করতে চাই না। মারপিট আমার ভালো লাগে না। প্লিজ, কুল ডাউন। আমি…।’
উত্তরে চামোন ওর শরীরটা একপাশে হেলিয়ে জিশানকে লক্ষ করে জোরালো লাথি চালাল। জিশান কথা বলতে-বলতেই দু-হাত একজোট করে অনায়াসে লাথিটা রুখে দিল।
‘প্লিজ, আমার কথা শুনুন…’ জিশান বলতে লাগল, ‘মাথা ঠান্ডা করুন। আপনারা রেস্তরাঁয় ফিরে যান। হাতজোড় করে বলছি, মারপিট আমি ভালোবাসি না। শুধু ওই মেয়েটিকে আপনারা ডিসটার্ব করছিলেন বলে…।’
জিশানের কথা শেষ হওয়ার আগেই একটা লাথি এসে পড়ল ওর শরীরে। যেহেতু লাথিটা এসেছে ওর পিছন থেকে তাই জিশান এটা রুখতে পারল না। আবার ছিটকে পড়ল মেঝেতে।
লাথিটা মেরেছিল চামোনের ব্যাকব্রাশ চুল বন্ধু। সে কখন যেন জিশানের পিছনে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল।
সঙ্গে-সঙ্গে বন্ধুকে শাসিয়ে উঠেছে চামোন : ‘অ্যাই, কিছু করবি না। আমি একা। আমি একা—।’
এ-কথায় ব্যাকব্রাশ চুল দমে গেল। ওর মুখটা কাঁচুমাচু হয়ে গেল।
কথা বলতে-বলতে জিশানের হাত ধরল চামোন। ওকে টেনে দাঁড় করিয়ে দিল। ওর দিকে তাকিয়ে ন্যাকাবোকা ভঙ্গিতে হাসল। বলল, ‘আমি একা। তোমাকে আমি একা খতম করব, সুপারহিরো।’
গুনাজির খুব খারাপ লাগছিল। প্রথমটায় ওর মনে হয়েছিল জিশান বুঝি নিজের ওপরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটা মোকাবিলায় নেমে পড়তে চাইছে। কিন্তু তার পরের ঘটনাগুলো দেখে ওর উলটোটাই মনে হয়েছে। মনে হয়েছে, না, জিশান মারপিট ভালোবাসে না।
জিশান খুব সময়মতো নিজেকে সামলে নিয়েছিল। এটা ঠিকই যে, চামোনের অসভ্য আচরণ ওর মেজাজ খারাপ করে দিয়েছিল। ও ভেবেছিল, চামোনদের উচিত শিক্ষা দেবে। কিন্তু সেই মূহূর্তেই ওর মনে হয়েছে, সেটা ঠিক হবে না। হিংসা আর প্রতিহিংসা মানুষকে কখনও এগিয়ে দেয় না। তা ছাড়া ওর কন্ট্রোলড ফ্রিডমের কথা মনে পড়েছিল। হয়তো এখানে গন্ডগোল করলে কাল থেকে ওর গুনাজির সঙ্গে বেরোনো বন্ধ হয়ে যাবে। জিপিসি-র গেস্টহাউসেই দমবন্ধ করে মুখ গুঁজে থাকতে হবে। তারপর দেখতে-দেখতে এসে যাবে ২ সেপ্টেম্বর, রবিবার। জিশানের বাঁচা-মরার দিন। কিল গেম। হয়তো তিন তারিখ থেকে জিশান আর কিছুই দেখতে পাবে না। মিনিকে না, অর্কনিশানকেও না।
জিশান সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে অল্প-অল্প টলছিল, আর এসব কথা ভাবছিল।
চামোন জিশানের গালে অসম্ভব জোরালো একটা থাপ্পড় কষিয়ে দিল। জিশানের মুন্ডুটা এক ঝটকায় ষাট ডিগ্রি ঘুরে গেল। গাল ফেটে রক্ত বেরোতে শুরু করল।
জিশান যন্ত্রণার চিৎকার করে উঠেছিল, কিন্তু সেটা একটা ছোট্ট টুকরো মাত্র। চিৎকারের বাকিটা ও দাঁতে-দাঁত চেপে সহ্য করছিল। কিন্তু তার চেয়ে অনেক বড় আক্ষেপের শব্দ বেরিয়ে এল জিশানদের ঘিরে থাকা দর্শকদের ঠোঁট চিরে।
জিশান চোখে ঝাপসা দেখছিল। চারপাশের বিজ্ঞাপনের মিউজিক আর দর্শকদের গুঞ্জন কেমন জড়িয়ে জট পাকিয়ে হিজিবিজি শোনাচ্ছিল। ও কেমন করে চামোনদের বোঝাবে, নিউ সিটির লড়াইয়ে ও সাধ করে আসেনি! ওকে ফাঁদে ফেলে এখানে আনা হয়েছে।
জিশানের সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ল পিস ফোর্সের মার্শাল শ্রীধর পাট্টার ওপরে। চামোনদের এইরকম বখে যাওয়া আচরণের জন্য ওই শয়তান লোকটাই দায়ী। ওই লোকটাই নিউ সিটির মানুষের কাছে ভ্যালু আর প্রাইস—এই দুটো শব্দের মানে একাকার করে দিয়েছে।
জিশানের রাগটা আবার উথলে উঠছিল। ও গুনাজির দিকে একবার তাকাল। তাকানোর ভঙ্গিতে বোধহয় অনুমতি চাওয়ার একটা নীরব আরজি ছিল। সেই করুণ রক্তাক্ত মুখের দিকে তাকিয়ে গুনাজির চোখে জল এসে গেল। ও কান্না চেপে ভাঙা গলায় বলল, ‘দাদা, আর মার খেয়ো না। আমি পিস ফোর্সে খবর দিয়েছি। কিন্তু ওরা আসতে-আসতে তুমি…তুমি…শেষ হয়ে যাবে…।’ কথা শেষ করতে-করতে কেঁদে ফেলল গুনাজি। আর ঠিক তখনই চামোনের পা গুনাজির পেট লক্ষ করে ধেয়ে এল।
সংঘর্ষের ভোঁতা শব্দ হল। একইসঙ্গে গুনাজির মুখ দিয়ে একটা বীভৎস ‘ওঁক’ শব্দ বেরিয়ে এল। গুনাজির হাত থেকে সিমানের জন্য কেনা এনার্জি ড্রিংকের প্যাকটা ছিটকে পড়ল। ওর রোগা লম্বা শরীরটা ভাঁজ হয়ে প্রায় উড়ে গিয়ে পড়ল দর্শকদের ঘাড়ে। একটা মেয়ে ভয়ে চিৎকার করে উঠল।
