কদমছাঁটের দুজন সঙ্গী এখন জিশানের কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে।
জিশান ওদের দিকে একপলক দেখল। ওদের মুখে নেশাগ্রস্ত জঙ্গীভাব ফুটে উঠেছে।
এতক্ষণ পর কদমছাঁট চুলের মালিক জিশানের দিকে ভালো করে তাকাল। ঘেন্নায় নাক-মুখ কুঁচকে বলল, ‘তুমি যেখানে যাচ্ছ যাও। নইলে প্রবলেম আছে।’
‘কীসের প্রবলেম?’
এ-কথার উত্তর না দিয়ে ছেলেটা দরজার পাশের ধাতব দেওয়ালে প্রচণ্ড জোরে একটা ঘুসি বসিয়ে দিল।
দেওয়ালের পাত তুবড়ে গেল। দেওয়ালের সঙ্গে ঘুষির সংঘর্ষের শক্তি দরজার ফ্রেমের দিকে প্রবাহিত হয়ে দরজার কাচ ঝনঝন শব্দে ভেঙে পড়ল।
টিভির পরদার দিকে যারা তাকিয়েছিল তাদের নজর ঘুরে গেল দরজার দিকে। চাপা গুঞ্জন শুরু হল। একজন মহিলার ভয়ের চিৎকার শোনা গেল।
জিশান দেখল, ওর সামনে দাঁড়ানো সুন্দরী মেয়েটির মুখে ভয়ের লেশমাত্র নেই। কিন্তু ওর মা-বাবা আর ভাইয়ের চোখে আশঙ্কা ছায়া ফেলেছে।
জিশান কদমছাঁটের চোখের দিকে তাকাল। ধীরে-ধীরে বলল, ‘দেওয়ালরা খুব ভালো। কখনও পালটা ঘুসি মারে না…।’
কথাটা বলেই জিশান মাথা থেকে নীল টুপিটা খুলে মেঝেতে ছুড়ে ফেলে দিল।
•
কদমছাঁট চুল অসভ্য ছেলেটা সঙ্গে-সঙ্গে জিশানকে চিনতে পারল। ওর চকচকে মার্বেল-চোখ ছিটকে গেল টিভির পরদার দিকে। তারপর জিশানের দিকে। হ্যাঁ, টিভির সুপারহিরোটাই ওর সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
ছেলেটার মনোযোগ এবার মেয়েটির দিক থেকে সরে গেল—পুরোপুরি চলে এল জিশানের দিকে। এ কী অপূর্ব সুযোগ ওর মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে! বরাবর যা নিয়ে ওর সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তার সরাসরি সমাধান এই মুহূর্তে এসে গেছে হাতের মুঠোয়! একেই বলে কপাল!
কদমছাঁট চুল হেসে ফেলল। প্রথমে দাঁত-দেখানো নি:শব্দ হাসি—তারপর শব্দ করে তাচ্ছিল্যের হাসি।
জিশান ছেলেটার হাসির অর্থ একটু-একটু বুঝতে পারছিল। ও মেঝেতে পড়ে থাকা কাচের টুকরোগুলোর দিকে তাকাল। রেস্তরাঁর ভেতরে যদি হাতাহাতি শুরু হয়ে যায় তা হলে বাড়াবাড়িরকমের ভাঙচুর হতে পারে। তার চেয়ে রেস্তরাঁর দরজার বাইরে চলে যাওয়া ভালো।
সুন্দরী মেয়েটি জিশানের হাতের নাগালের মধ্যে ছিল। জিশান আচমকা ছোঁ মেরে ওর হাত খামচে ধরল। তারপর এক ঝটকায় ওকে টেনে নিল দরজার বাইরে। একইসঙ্গে চাপা গলায় বলল, ‘শিগগিরই এখান থেকে চলে যাও—।’
মেয়েটির মুখে তখন বিহ্বল ভাব। সেটা চট করে কাটিয়ে উঠে ও ইশারায় মা-বাবাকে বাইরে আসতে বলল।
প্রতিক্রিয়া দেখাতে কদমছাঁট চুল কয়েক পলক সময় নিল। তারপর জিশান যা ভেবেছিল ও ঠিক তাই করল। সরাসরি তেড়ে এল জিশানের দিকে। পিছনে ওর দুই শাগরেদ।
রেস্তরাঁর বাইরে একটা বড়সড় লাউঞ্জ। লাউঞ্জে ব্যাক লাইটেড গ্রাফিক গ্লাসের সিলিং আর চারপাশে অনেক বড়-বড় চৌকো ক্রিস্টালের পিলার। পিলারের গায়ে ফুটে উঠছে চলমান রঙিন ছবি—নানান জিনিসের রঙিন অডিয়োভিশুয়াল বিজ্ঞাপন। সেই রঙিন আলো জিশানের গায়ে পড়ছে। ওর মুখটা অদ্ভুত দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে, জিশান নিজেও একটা রঙিন বিজ্ঞাপন।
লাউঞ্জে যারা চলাফেরা করছিল তাদের দু-চারজন জিশানকে চিনতে পেরে দাঁড়িয়ে পড়ল। এই ছেলেটা সত্যিই কিল গেমে কোয়ালিফাই করা, টিভিতে দেখা, জিশান পাল চৌধুরী কি না তাই নিয়ে নিজেদের মধ্যে তর্ক জুড়ে দিল।
গুনাজি কখন যেন আবার জিশানের হাত ধরে ফেলেছিল, আলতো করে টান মারছিল। আসন্ন মারপিটের ব্যাপারটাকে ও এড়াতে চাইছিল। কিন্তু এড়ানো যে যাবে না মনে-মনে সেটাও বুঝতে পারছিল।
জিশানের তিন-চার হাতের মধ্যে এসে কদমছাঁট থামল। জিশানের চোখের দিকে তাকিয়ে চিবিয়ে-চিবিয়ে বলল, ‘কী সুপারহিরো, লাইভ টেলিকাস্ট ছাড়া রিয়েলিটি শো হবে নাকি?’
ওর শাগরেদ দুজন একে অপরের দিকে চোখ ঠারল। তারপর হেসে চেঁচিয়ে বলল, ‘জিশান, তুমি জিতলে আমরা চাঁদা তুলে তোমাকে প্রাইজমানি দেব। মাইরি—কসম খেয়ে বলছি…।’ নিজের টুটিতে আঙুল ছোঁয়াল একজন।
‘জিশান’ নামটা শোনামাত্রই গুঞ্জন উঠল লাউঞ্জে। জিশানদের ঘিরে ভিড়টা আরও গাঢ় হল। ভিড়ের বৃত্তের দ্বিতীয় কি তৃতীয় স্তরে মেয়েটি সপরিবারে দাঁড়িয়েছিল। চিবুক উঁচু করে জিশানকে স্পষ্ট করে দেখতে চেষ্টা করছিল। ওর মুখে উদ্বেগের ছোঁয়া।
কদমছাঁট ছেলেটা হাতের চার আঙুল নেড়ে জিশানকে কাছে আসার জন্য ওসকাচ্ছিল আর বলছিল, ‘এসো, সুপারহিরো—দাদাগিরির প্রাইজমানি নেবে এসো। ও:, কাম অন—।’
ওর শাগরেদ দুজনের একজন—বোধহয় কোঁকড়া চুল—হিংস্র গলায় কদমছাঁটকে লক্ষ করে বলল, ‘চামোন, মালটাকে গিলে খেয়ে নে!’
জিশান বুঝতে পারছিল, মেয়েটির ব্যাপারে হঠাৎ এভাবে উত্তেজিত হয়ে পড়াটা ওর ঠিক হয়নি। কদমছাঁট চুল ছেলেটিকে ওর ঠান্ডা মাথায় বোঝানো উচিত ছিল। কারণ, অসভ্যতাকে অ-সভ্যতা দিয়ে রুখলে ব্যাপারটা শেষ হতে চায় না। নিউক্লিয়ার চেইন রিয়্যাকশনের মতো তার তেজস্ক্রিয় বিকিরণ চলতেই থাকে। যেমন এখন চলছে।
তাই জিশান আচমকা গুনাজির মুঠো থেকে নিজের হাতটা টেনে ছাড়িয়ে নিয়ে জোড়হাত করে ফেলল। চামোনকে অনুরোধের গলায় বলল, ‘ভাই, কিছু মনে করবেন না। আমাদের কোথাও একটা ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে—।’
‘তাই?’ চামোন ন্যাকা গলায় জিগ্যেস করল। তারপর ওরা তিনজনেই বস্তির নোংরা ভাষায় গালাগাল ছুড়ে দিল।
