একটু দুশ্চিন্তাও ভেসে বেড়াচ্ছিল জিশানের মনে। মাথা ঘুরিয়ে পিছনের সিটের দিকে একপলক তাকাল ও। নেশায় অচেতন সিমান শুয়ে আছে।
ওকে পাড়ে নিয়ে আসার পর ‘ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট’ গ্রুপের লোকেরা ওর তদারকি করেছে। ওর ভেজা জামাকাপড় পালটে দেওয়া হয়েছে। ইমার্জেন্সি কেয়ার ইউনিট থেকে চিফ মেডিক এসেছেন, সিমানের ট্রিটমেন্ট করেছেন, ওকে একটা ইনজেকশানও দিয়েছেন—কিন্তু সিমানকে জাগানো যায়নি। অবশ্য ইনজেকশানটা ঘুমপাড়ানোর না নেশা থেকে জাগানোর সেটা জিশান জানে না।
‘লেক কন্ট্রোল রুম’-এর কর্মীরা ব্যাপারটা পিস ফোর্সের লোকাল ইউনিটে জানিয়েছে। তারপর যখন ওরা বলল যে, ছেলেটির আইডেনটিটি পাওয়া না গেলে ওকে কয়েকদিন পিস ফোর্সের হেফাজতে থাকতে হতে পারে, তখন জিশান আপত্তি করেছে। এবং ছেলেটির পরিচয় খোঁজার জন্য ওর ভেজা জামা-প্যান্টের পকেট হাতড়ে দেখার অনুমতি চেয়েছে।
জিশান এখন সকলের কাছে সুপারহিরো। তাই ওর কথায় ‘লেক কন্ট্রোল রুম’-এর অফিসাররা রাজি হয়ে গেল। জিশান ঝুঁকে পড়ে সিমানের ভেজা জামাকাপড়ের নানান পকেটে তল্লাশি শুরু করল।
একটু পরেই একটা ম্যাগনেটিক কার্ড পাওয়া গেল ওর পকেট থেকে। তাতে লেখা : ‘সিমান বিশ্বাস। বাবা রঙ্গপ্রকাশ। মা পর্ণমালা। বাড়ির স্থ্যনাঙ্ক : জে— সেভেনটিন কমা ফরটি সিক্স।’ এ ছাড়া রয়েছে ইমার্জেন্সি কনট্যাক্ট কোড।
অফিসারদের অনুমতি নিয়ে নেশায় অচল সিমানকে সি থ্রু অটোমোবিলের পিছনের সিটে তুলে নিয়েছে জিশান। তারপর ও আর গুনাজি সামনের সিটে বসেছে। এবং গাড়ি ছুটিয়ে দিয়েছে।
জিশানের স্যাটেলাইট ফোন থেকে গুনাজি সিমানের ইমার্জেন্সি কনট্যাক্ট কোডে ডায়াল করেছে।
ওপাশে কেউ কথা বলতেই জিশানের হাতে ফোন তুলে দিয়েছে গুনাজি। বলেছে, ‘দাদা, আপনি কথা বলুন—।’
‘হ্যালো, জিশান বলছি—জিশান পালচৌধুরী…।’
‘আমি ডক্টর রঙ্গপ্রকাশ বিশ্বাস বলছি…।’ কণ্ঠস্বর মসৃণ এবং স্থির রাখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সেটা পুরোপুরি হল না। শব্দগুলোর উচ্চারণে আঁকাবাঁকা ঢেউ খেলে গেল।
এই সেই জিশান! যার সাইকোজিক্যাল প্রাোফাইলিং নিয়ে দিনের পর দিন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা, সময় কাটিয়েছেন রঙ্গপ্রকাশ!
হ্যাঁ, নিশ্চয়ই সেই জিশান! কারণ, নিউ সিটিতে জিশান পালচৌধুরী একজনই।
জিশান এবার ধীরে ধীরে সিমানের অ্যাক্সিডেন্টের ব্যাপারটা খুলে বলল। বলল যে, দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই। ‘লেক কন্ট্রোল রুম’-এ সিমানের যথাসাধ্য ট্রিটমেন্ট করা হয়েছে। এখন ও জিশানের সি থ্রু অটোমোবিলে শুয়ে রয়েছে—বিশ্রাম নিচ্ছে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে জিশান ওকে নিয়ে রঙ্গপ্রকাশের বাড়িতে পৌঁছে যাবে।
রঙ্গপ্রকাশের মধ্যে মিশ্র অনুভূতি কাজ করতে লাগল। মনে হল, হঠাৎই একজন সেলিব্রিটি টিভির পরদা থেকে বেরিয়ে সরাসরি পা রেখেছে রঙ্গপ্রকাশের ঘরে।
রঙ্গপ্রকাশ কেমন একটা অলীক ঘোরের মধ্যে জিশানকে বারবার ধন্যবাদ জানালেন। তারপর বললেন, ‘আপনি আসুন। আমরা আপনার আসার জন্যে ওয়েট করছি—।’
একজিট বোতাম টিপে ফোন রিসেট করল জিশান। ফোনটা গাড়ির সিটে রেখে দিল। জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল। তারপর সিমানের দিকে একবার দেখল। ঘুমোচ্ছে।
গাড়ি চালাতে-চালাতে গুনাজি বলল, ‘দাদা, আপনাকে এ-শহরের বহু লোক চেনে। ভালোও বাসে।’
সামনের রাস্তার দিকে তাকিয়ে জিশান আনমনাভাবে বলল, ‘হুঁ—।’
গাড়ির ড্যাশবোর্ডের প্যানেলে রঙিন নেভিগেশান ম্যাপ। সেখানে উজ্জ্বল লাল রেখায় সিমানের বাড়ির স্থানাঙ্কে পৌঁছোনোর পথ আঁকা রয়েছে। গুনাজি জানাল, সেখানে পৌঁছতে মোটামুটি ঘণ্টাখানেক লাগবে।
এখন প্রায় সাড়ে পাঁচটা বাজে। সূর্য হেলে পড়েছে। জিশানের মনে হল, ঠিক এই সূর্যটাই একইরকমভাবে দেখা যাচ্ছে ওল্ড সিটিতেও।
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল জিশানের বুক থেকে।
একটু আগে অল্প খিদে পাচ্ছিল। এখন সেই খিদের বোধটা বড্ড জোরালো হয়ে উঠেছে। গুনাজিকে সে-কথাই বলল জিশান। তখন গুনাজি বলল, ‘দাদা, আমারও একই অবস্থা। আমাকে পাঁচটা মিনিট টাইম দিন, একটা ফুড মলে গাড়ি লাগাচ্ছি—।’
পাঁচ মিনিট নয়—তার কম সময়েই একটা অদ্ভুত চেহারার ফুড মলের পার্কিং লটে গাড়ি দাঁড় করাল গুনাজি।
ফুড মলটা একটা গাছের মতো শাখা-প্রশাখা মেলে দাঁড়িয়ে আছে। স্টেইনলেস স্টিল আর কাচ দিয়ে তৈরি। তার ওপর রঙিন আলোর আভা এক অলৌকিক মায়া তৈরি করেছে। ছাই রঙের আকাশের পটভূমিতে এক বিমূর্ত চেহারার আলোকবৃক্ষ।
সিমানকে গাড়িতে রেখে ওরা দুজন নেমে দাঁড়াল।
সন্ধে হয়ে এসেছে। তাই সানগ্লাসটা আর চোখে দিল না জিশান। শুধু নীল টুপিটা মাথায় দিয়ে নিল।
গাড়ির পিছনের দরজা খুলে সিমানের ওপরে ঝুঁকে পড়ল জিশান। ওর কপালে হাত বুলিয়ে তাপ নিল। না:, জ্বর-টর কিছু নেই।
গুনাজির দিকে তাকাল জিশান : ‘আমাদের বেশি দেরি করলে চলবে না। সিমানকে জলদি বাড়িতে পৌঁছতে হবে—।’
সায় দিয়ে ঘাড় নাড়ল গুনাজি।
‘ওর জন্যে একটা হেলথ ড্রিংক বা ওই টাইপের কিছু নিয়ে নিয়ো। যদি ঘুম থেকে উঠে কিছু খেতে টেতে চায়…।’
‘এক লিটারের একটা সফট এনার্জি প্যাক নিয়ে নেব, দাদা।’
ফুড মলের যে-রেস্তরাঁটায় গিয়ে ওরা ঢুকল সেটার নাম ‘হেভেনস কিচেন।’ রেস্তরাঁর বিশাল বড় প্লেট টিভিতে তখন জিশানের পিট ফাইট দেখানো হচ্ছে। ঘাম-চকচকে শরীর নিয়ে জিশান জাব্বার সঙ্গে লড়ছে।
