গাড়ির মধ্যে একটা ছেলেকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছিল। পাগলের মতো বেরোনোর চেষ্টা করছে গাড়ি থেকে, কিন্তু গাড়ির দরজা কিছুতেই খুলছে না। বরং গাড়িটা ধীরে-ধীরে লেকের জলে ডুবে যাচ্ছে।
অতটা উঁচু থেকে গাড়িটা পড়ার পরেও ছেলেটা যে বেঁচে আছে সেটা জিশানকে অবাক করেছিল। সে-কথা গুনাজিকে বলতেই ও বলল, ‘এখানকার সব গাড়িতেই অ্যান্টি-কলিশান এয়ারব্যাগ থাকে। হঠাৎ করে ছুটন্ত গাড়ি থেমে গেলে—মানে, কোনও কিছুতে ধাক্কা খেয়ে আচমকা গাড়ির স্পিড কমে গেল—ওই এয়ারব্যাগ 0.1 সেকেন্ডের মধ্যে ফুলে ওঠে আর ড্রাইভারের মাথাটা ঘিরে বসে যায়। ফলে ড্রাইভার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বেঁচে যায়। আর ড্রাইভারের পাশে যে বসে সে-ও একইভাবে সেভ হয়ে যায়…।’
গাড়িটা তখনও ডোবেনি, আর ছেলেটাও গাড়ির ভেতরের দেওয়ালে কিল-ঘুসি মারছিল। বন্ধ গাড়ির ভেতর থেকে ওর চাপা চিৎকারও শোনা যাচ্ছিল।
জিশান বুঝতে পারছিল, এইভাবে ছেলেটা আর বেশিক্ষণ বেঁচে থাকতে পারবে না। তখন অ্যান্টি-কলিশান এয়ারব্যাগের ব্যাপারটাই মাঠে মারা যাবে। ব্যাগটা ওকে ইমপ্যাক্ট ইনজুরি থেকে বাঁচিয়েছে, কিন্তু লেকের জল তো ওকে রেহাই দেবে না!
চারপাশে খুব দ্রুত নজর চালিয়ে নিল জিশান।
অন্যান্য বোটের লোকজন এবার মজা দেখছে। বিনাপয়সার রোমাঞ্চকর শো। ওরা গাড়িটার খাবি খাওয়া দেখছে, ছেলেটার মরিয়া হাত-পা ছোড়াছুড়ি দেখছে আর নিজেদের মধ্যে উত্তেজিতভাবে আলোচনা করছে।
রাস্তায় পামগাছের সারির কাছে দাঁড়ানো লোকজনের অবস্থাও তাই।
জিশান আর দেরি করল না। চোখ থেকে সানগ্লাস খুলে ছুড়ে দিল বোটের মেঝেতে। তারপর টুপিটাও। এবং ঝাঁপ দিল লেকের জলে।
আগের মজার সঙ্গে নতুন মাত্রা যোগ হওয়ায় দর্শকরা আবার উঁচু পরদায় হইহই করে উঠল।
জামা-প্যান্ট পরা অবস্থাতেই জিশান গাড়ি লক্ষ্য করে সাঁতার কাটতে লাগল। লম্বা-লম্বা হাত টেনে আধমিনিটের মধ্যেই ও গাড়িটার কাছে পৌঁছে গেল। ডুবন্ত গাড়ির বনেটের ওপরে উঠে ও সোজা হয়ে দাঁড়াতে চাইল, কিন্তু পারল না। কারণ, ইঞ্জিনের ভারে গাড়ির সামনের দিকটা ডুবে গিয়ে বনেটটা ঢালু হয়ে গিয়েছিল।
টাল খেয়ে পড়ে যেতে-যেতেও জিশান ডানপায়ের এক প্রচণ্ড লাথি কষিয়ে দিল গাড়ির উইন্ডস্ক্রিনের ওপরে। একটু পরেই আর-একবার।
গাড়ির উইন্ডস্ক্রিন ভেঙে ভেতরে ঢুকে গেল।
জিশান নীচু হয়ে ঝুঁকে হাত বাড়াল গাড়ির ভেতরে। পলকে আঁকড়ে ধরল ছেলেটার জামা। তারপর এক হ্যাঁচকা টানে ওকে ভাঙা উইন্ডস্ক্রিনের ফাঁক দিয়ে টেনে নিল বাইরে।
ছেলেটা আতঙ্কে চোখ বুজে গোঙাচ্ছিল। জিশান ওকে টেনে নিয়ে ভেসে পড়ল জলে। তাড়াতাড়ি ডুবন্ত গাড়িটার কাছ থেকে সরে যেতে চাইল। কারণ, ডুবে যাওয়া গাড়ির জন্য জলে যে-ঘূর্ণি তৈরি হবে তাতে ও তলিয়ে যেতে চায় না।
ছেলেটা হাঁকপাঁক করছিল। ওর কপালের একপাশ থেকে রক্ত বেরোছে। জিশান ওর চুলের মুঠি ধরে সাঁতরে চলল পামগাছের সারির দিকে।
ততক্ষণে লোকজন ওকে চিনতে পেরে গেছে। ওদের শহরের রিয়েলিটি শো-র হিরো জিশান। তাই ওরা উল্লাসে ফেটে পড়ল।
সব বোট তখন স্টার্টিং পয়েন্টে পৌঁছে গেছে। সেখান থেকে গুনাজি ‘দাদা! দাদা! চলে আসুন! আর-একটু! আর-একটু!’ বলে চেঁচাচ্ছে। ওর আশপাশে আরও অনেক লোক হাত নাড়ছে।
জিশানের মনে হল, ও যেন একটা কমপিটিশানে নাম দিয়েছে। সেখানে ও প্রচণ্ড উত্তেজনার মধ্যে ফিনিশ লাইন বা ওইরকম কোনও কিছুর দিকে এগোচ্ছে।
হঠাৎই লেক কন্ট্রোল রুম থেকে ছ’জন লোক ছুটে বেরিয়ে এল। ওদের গায়ে কালো সিল্কের জ্যাকেট। তার বুকে-পিঠে রুপোলি অক্ষরে ইংরেজিতে লেখা : ‘ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট।’ ওরা দুটো বোট নিয়ে চট করে পৌঁছে গেল জিশানের দুপাশে। অভ্যস্ত কৌশলে ওদের দুজনকে একটা বোটে তুলে নিল। তারপর বোট দুটো ছুটে চলল পাড়ের দিকে।
জিশানের ভেজা জামা-প্যান্ট থেকে জল ঝরে পড়ছিল। ও ছেলেটাকে দেখছিল। একটু আগে ছটফট করছিল, কিন্তু এখন নিস্তেজ হয়ে চুপচাপ মেঝেতে শুয়ে রয়েছে। বড়-বড় শ্বাস ফেলে হাঁপাচ্ছে। চোখ দুটো শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে আছে আকাশের দিকে।
ছেলেটার বয়েস সতেরো কি আঠেরো। ওর থুতনিতে এক চিলতে দাড়ি। আর বাঁ-গালে একটা ছোট্ট লাল ফুল—লেসার ট্যাটু।
জিশান হাঁটুগেড়ে বসে পড়ল ছেলেটার কাছে। ওর কপাল থেকে এখনও রক্ত পড়ছে। ওকে তাড়াতাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেওয়া দরকার।
ও ছেলেটার মুখের ওপরে ঝুঁকে পড়ল। গালে আলতো করে দুটো চাপড় মারল : ‘আমার কথা শুনতে পাচ্ছ? এই যে, শুনতে পাচ্ছ?’
ছেলেটার চোখ এবার জিশানকে দেখতে পেল যেন। কেমন একটা যন্ত্রণার গোঙানি বেরিয়ে এল ওর মুখ থেকে।
জিশান আবার আলতো চড় মারল গালে। জিগ্যেস করল, ‘তোমার নাম কী? বাড়ি কোথায়?’
ছেলেটার ঠোঁট নড়ল, কিন্তু কোনও কথা বেরোল না। ওর মুখ থেকে ঝিম ধরানো পেপারমিন্টের গন্ধ বেরোচ্ছিল। বোধহয় নেশা-টেশা করেছে।
জিশান ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে আবার চেঁচিয়ে জিগ্যেস করল, ‘তোমার নাম কী?’
ছেলেটা জড়ানো গলায় অতিকষ্টে উচ্চারণ করল, ‘সিমান—।’
•
গুনাজির আঙুল সি থ্রু অটোমোবিলের কন্ট্রোল প্যানেলের ওপরে নড়াচড়া করছিল। জিশান পাশের সিটে বসে আড়চোখে ওর দক্ষতা লক্ষ করছিল। আর মনে-মনে ওর তারিফ করছিল। তুলতুলে পালকটাকে আবার ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে গুনাজি।
