জিশান একটু অস্বস্তি পেল। মাথার টুপিটাকে টেনে কপালের ওপরে আরও খানিকটা নামিয়ে দিল।
গুনাজি চাপা গলায় বলল, ‘দাদা, আপনার ফাইট দেখাচ্ছে।’
‘হুঁ—।’ বলে একটা খালি টেবিলের কাছে এগিয়ে গেল জিশান। একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসল। গুনাজিও বসে পড়ল ওর পাশে।
স্বচ্ছ টেবিলে ফুটে ওঠা রঙিন ব্যকলাইটেড টাচস্ক্রিন মেনুর দিকে তাকাল গুনাজি। সেখানে হালকা স্ন্যাক্স আইটেমের ওপরে আঙুল ছুঁইয়ে অর্ডার দিল।
রেস্তরাঁটায় বেশ ভিড়। দু-তিনটে টেবিল ছাড়া সব টেবিলেই লোকজন রয়েছে। বেশিরভাগ খদ্দেরই পুরুষ, তবে কয়েকটা টেবিলে ফ্যামিলি চোখে পড়ছে।
প্রায় সকলেরই চোখ টিভির পরদার দিকে। লড়াই দেখতে-দেখতে অনেকে অনেকরকম মন্তব্য করছে। কেউ উত্তেজিতভাবে জিশানকে সাপোর্ট করছে, আর কেউ-বা জাব্বাকে। সব মিলিয়ে একটা চাপা গুঞ্জন আর হইচই।
জিশানের ভালো লাগছিল না। বারবার গাড়িতে রেখে আসা সিমানের কথা মনে পড়ছিল। কতক্ষণে ওকে বাড়িতে ফিরিয়ে দেওয়া যাবে সে-কথাই ভাবছিল।
আশপাশের টেবিল থেকে টুকরো-টুকরো কথাবার্তা ছিটকে এসে ওর কানে ঢুকে পড়ছিল। হঠাৎই ও শুনতে পেল পাশের টেবিলে একজন বলছে, ‘এই নিয়মটা বড্ড ফালতু যে, নিউ সিটির কোনও সিটিজেন এইসব কম্পিটিশানে নাম দিতে পারবে না—।’
জিশান তাকাল পাশের টেবিলটার দিকে।
তিনটে ছেলে বসে আছে সেখানে। হ্যামবার্গারে কামড় দিচ্ছে, চোখ প্লেট টিভির দিকে। ওদের সামনে তিনটে প্লেট আর তিনটে গ্লাস। গ্লাসে রঙিন তরল—সফট এনার্জি ড্রিংক কিংবা হার্ড এনার্জি ড্রিংক হতে পারে।
তিনজনের চেহারা তিনরকম, কিন্তু বয়েস আর পোশাক অনেকটা একই রকমের।
একজনের মাথায় কদমছাঁট চুল। গোঁফ কামানো। থুতনিতে একটু দাড়ি—সিমানের মতন। আর কানে চকচকে কোনও ধাতুর মাকড়ি। ছেলেটা বসে থাকলেও লম্বা যে, সেটা বোঝা যায়।
দ্বিতীয়জনের মাথায় লম্বা কোঁকড়ানো চুল। বড় বড় চোখ। চোয়ালের দুপাশের হাড় উঁচু। নাকটা থ্যাবড়ানো। নাকের নীচে সরু গোঁফ।
তৃতীয়জনের চুল ব্যাকব্রাশ করে আঁচড়ানো। কপালের ঠিক মাঝখান বরাবর চুলের এলাকা চোখা হয়ে নেমে এসেছে—ইংরেজিতে যাকে ‘উইডোজ পিক’ বলে। গাল ভাঙা। গালে খোঁচা-খোঁচা দাড়ি। ডানচোখের ভুরুর ওপরে একটা মাকড়ি ঝকঝক করছে।
ওদের দিক থেকে ভেসে আসা প্রথম কথার টুকরোটা জিশানের কৌতূহল উসকে দিয়েছিল। কারণ, ওর ধারণা ছিল নিউ সিটির কোনও মানুষ সুপারগেমস কর্পোরেশনের কোনও খেলায় নাম দিতে চায় না।
কোঁকড়া চুল তখন বলছে, ‘ফালতু মানে? একেবারে ন্যাকাচৈতন নিয়ম। এটা সিন্ডিকেট বোঝে না যে, প্রাইজ মানির কড়কড়ে রোকড়া সব ওল্ড সিটিতে টপকে যাচ্ছে!’
কদমছাঁট চুল তখন বলল, ‘ওই যে জিশান নামের ছেলেটা যে লড়ছে, ওকে পালিশ দেওয়া কি খুব একটা টাফ ব্যাপার? শালা ফালতু কিছু নোট এপার থেকে ওপারে চলে গেল। আর মাঝখান থেকে জিশান বড়লোক হয়ে গেল—।’
কথাগুলো গুনাজির কানেও যাচ্ছিল। ও জিশানের দিকে তাকাল। জিশান ইশারায় ওকে চুপচাপ থাকতে বলল। টুপিটা টেনে আরও খানিকটা সামনের দিকে নামাতে চাইল।
ওদের খাবার টেবিলে এসে গিয়েছিল। ও আর গুনজি মাথা নীচু করে খাওয়া শুরু করল।
চুল ব্যাকব্রাশ করা ছেলেটা বলল, ‘দাঁড়া, কালই সিন্ডিকেটে একটা রিটন অ্যাপিল করছি। তাতে রিকোয়েস্ট করব, নিউ সিটির লোকজনও যেন সুপারগেমস কর্পোরেশনের এই থ্রিলিং কমপিটিশানে নাম দিতে পারে—।’
‘সিন্ডিকেট?’ ব্যঙ্গের সুরে প্রশ্নটা করে কদমছাঁট ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসল : ‘সিন্ডিকেট মানে তো একপাল ইনটেলিজেন্ট বুরবাক—শুধু এই মার্শাল শ্রীধর পাট্টা ছাড়া। যাকগে, সে তুই চিঠি যা লেখার লেখ, কিন্তু বাইরের লোকজন এসে সব মালকড়ি নিয়ে কেটে পড়ছে এ-ব্যাপারটা আমার হেভি গায়ে লাগছে।’
কোঁকড়ানো চুল বেশ কিছুক্ষণ ধরে ঘাড় ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে ছিল। ওর নজর লক্ষ্য করে সেদিকে তাকাল জিশান।
কয়েকটা টেবিল পরেই একটি ফ্যামিলির চারজন একটা টেবিলে খেতে বসেছে। তার মধ্যে একটি অল্পবয়েসি মেয়েও রয়েছে। বয়েস খুব বেশি হলে কুড়ি-একুশ। পরনে উজ্জ্বল হলদে স্লিভলেস টপ। আর কালো রঙের স্কিনটাইট বারমুডা স্ল্যাক্স। মাথার চুল বিচিত্র ভঙ্গিতে উঁচু করে বাঁধা। টানা-টানা রূপসী চোখ। কপালে লেসার হলোগ্রামের টিপ। গলায় গোলাপি পাথরের একটা মালা।
মেয়েটার সঙ্গে রয়েছে সম্ভবত ওরা মা-বাবা আর ভাই। ওরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল, হাসাহাসি করছিল।
কদমছাঁট চুল বাঁকা হাসি হেসে কোঁকড়া চুলের পিঠে একটা থাপ্পড় কষাল।
ব্যাকব্রাশ চুল মজা করে বলল, ‘কী সার্ভে করছেন, স্যার?’
কোঁকড়ানো চুল ছেলেটা বন্ধুদের দিকে ফিরে চোখ টিপল : ‘গ্রেট স্টাফ। এখন ওর জিয়োগ্রাফি সার্ভে করছি। হিস্ট্রি পরে জানার চেষ্টা করব। আর, বস, হিস্ট্রির পর আসবে আর্কিওলজি—।’
কথাটা শেষ হতে না হতেই তিনজনে এমন নোংরা ভঙ্গিতে হাসল যে, কথার নোংরা ইঙ্গিতগুলো জিশানের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল। ওর গা ঘিনঘিন করে উঠল। সেইসঙ্গে রাগও হল।
গুনাজি জিশানকে লক্ষ করছিল। জিশানের মনের অবস্থাটা বুঝতেও পারছিল। তাই ও টেবিলের ওপরে হাত বাড়িয়ে জিশানের বাঁ-হাতের পাতার ওপরে রাখল, চাপ দিল। তারপর চাপা গলায় বলল, ‘দাদা, প্লিজ—। এখানকার বেশিরভাগ ছেলেছোকরাই এই টাইপের…।’
