ওর তুলনার ঢঙে জিশান হেসে ফেলল। একইসঙ্গে ওল্ড সিটির মা আর ছেলের চিন্তার জাল ছিঁড়ে পলকে চলে এল সি থ্রু অটোমোবিলে। ও গুনাজির দিকে একপলক তাকিয়েই চোখ ফেরাল সামনের দিকে। গাড়ির স্ক্র্যাচপ্রুফ স্বচ্ছ পলিমার উইন্ডশিল্ডটা এমন যে, আছে বলে চট করে বোঝা যায় না।
গাড়ি ছুটে চলল আরও চারমিনিট কি পাঁচমিনিট—তারপরই চোখ-জুড়োনো একটা জায়গায় জিশানরা পৌঁছে গেল।
সীমাহীন একটা হ্রদ। তার জল সত্যিই সাহেবদের চোখের মতো নীল। যেদিকে তাকানো যায় শুধু নীল আর নীল। সেই নীলের বুক চিরে চওড়া কালো ফিতের মতো রাস্তা। রাস্তার দুপাশে হলদে রঙের পাম গাছের ঘন সারি, আর সেগুলোর কোল ঘেঁষে ধবধবে সাদা ছোট-ছোট কটেজ।
রাস্তা থেকে নেমে ঘাসে ছাওয়া জমির ওপরে গাড়ি থামাল গুনাজি। জিশান আবার রোদচশমা আর টুপি পরে নিল। তারপর ওরা দুজনে গাড়ি থেকে নেমে লেকের কিনারায় গিয়ে দাঁড়াল।
লেকের অন্তত একশো মিটার ওপর দিয়ে পাঁচটা রঙিন ফ্লাইওভার চলে গেছে। ওগুলো কী করে শূন্যে ঝুলে আছে জিশান ভেবে পেল না। নিউ সিটির প্রযুক্তিকে মনে-মনে সেলাম দিল জিশান।
সামনে তাকালে দেখা যায়, দূরে—বহুদূরে লেকের নীল জল ঝাপসা সবুজ এক পাহাড়ে গিয়ে মিশেছে।
আর পিছনে, প্রায় সমান দূরে, চোখে পড়ছে হাই-রাইজের সারি।
‘এই হল আমাদের সেন্ট্রাল লেক।’ গুনাজি বলল, ‘নিউ সিটির সবচেয়ে অ্যাট্রাকটিভ টুরিস্ট স্পট। ওই যে কটেজগুলো দেখছেন—’ আঙুল তুলে কটেজগুলো দেখাল : ‘ওগুলোর চার্জ এত ভয়ংকর যে, শুধুমাত্র নিউ সিটির ব্যাপক বড়লোকরাই ওখানে থাকতে পারে। আর এখানকার হিসেবে যারা গরিব, তারা এখানে গাড়ি নিয়ে আসে, একটু ঘোরে-ফেরে, নৌকো চড়ে লেকে রাইড নেয়—তারপর সন্ধে হলে চলে যায়…।’
চারপাশে তাকিয়ে অনেক মানুষজন দেখতে পেল জিশান। লেকের কিনারায় অলস পায়ে বেড়াচ্ছে। বড়দের পাশাপাশি ছোট-ছোট ছেলেমেয়েরাও রয়েছে।
এ ছাড়া লেকের নীল জলে সুন্দর ছাঁদের রঙিন নৌকো ভেসে রয়েছে। বেড়াতে আসা মানুষরা তাতে বসে আনন্দে হইচই করছে।
প্রাণ ভরে দৃশ্যগুলো দেখতে লাগল জিশান। সত্যি, পৃথিবীটা কী সুন্দর! কিল গেমে যাওয়ার আগের দিন পর্যন্ত ও রোজ একবার করে এখানে আসবে। নিজেকে বারবার করে বিশ্বাস করাবে, পৃথিবী অপরূপ, অলৌকিক। নিউ সিটির যে-ভয়ংকর রূপ সেটা সাময়িক এবং লৌকিক।
সূর্যের দিকে তাকাল জিশান। বেলা সাড়ে তিনটের সূর্য খানিকটা পশ্চিমে হেলে পড়েছে। নীল লেকের জলে তার উজ্জ্বল ছায়া।
আরামের বাতাস বইছিল। হ্রদের জলে কাঁপন ধরিয়ে শিরা উঠছিল। জিশান চোখ বুজে দাঁড়িয়ে বাতাসটা শরীর শুষে নিতে চাইছিল। তখনই কয়েকটা পাখির শিস ওর কানে এল।
চোখ বুজে এক অদ্ভুত সৌন্দর্যকে অনুভব করতে লাগল জিশান।
একটু পরে চোখ খুলে ও তাকাল গুনাজির দিকে : ‘গুনাজি, আমরা কি একটা বোট নিয়ে লেকে বেড়াতে পারি?’
‘হ্যাঁ, দাদা—পারি।’ হাসল ছেলেটা : ‘আপনার সি. এফ. সি. স্মার্ট কার্ডটা দিন—আমি সোয়াইপ করে আনছি…।’
কার্ডটা নিয়ে লেকের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা ‘লেক কন্ট্রোল রুম’-এর দিকে চলে গেল গুনাজি। এবং ফিরে এল পাঁচ মিনিটের মধ্যেই। তারপর নীল রঙের একটা হাইটেক স্মার্ট বোট নিয়ে ওরা লেকের জলে ভেসে পড়ল।
বোটগুলোয় কোনও চালক নেই। সবটাই প্রি-প্রাোগ্রামড। ফলে চালানোর কোনও ব্যাপার নেই, স্টিয়ারিং ঘোরানোর কোনও ব্যাপার নেই। শুধু আরাম করে বসে থাকলেই হল। নৌকো নিজের মনে চলবে। তার অটোনেভিগেশান এমনই যে, কোনও একটা নৌকোর সঙ্গে আর-একটা নৌকোর কখনওই ধাক্কা লাগবে না। আর নির্দিষ্ট সময় পার হলেই নৌকো পাড়ের কাছে স্টার্টিং পয়েন্টে আবার ফিরে আসবে।
নীল জলের ওপরে জিশানদের নীল রঙের বোট ভেসে বেড়াচ্ছিল। জলের দিকে তাকালে দেখা যায় সেখানে জল আর আকাশ মাখামাখি। তারই মাঝে ফ্লাইওভারগুলো কালো ছায়ার দাগ টেনে হ্রদের জলকে চিরে দিয়েছে।
হঠাৎই একটা সংঘর্ষের শব্দ শোনা গেল।
আওয়াজটা এসেছে ওপরদিক থেকে।
সঙ্গে-সঙ্গে জিশান আর গুনাজি মাথা তুলে তাকাল আকাশের দিকে। দেখল, ফ্লাইওভারের রেলিং ভেঙে একটা সি থ্রু অটোমোবিল ছিটকে গেছে শূন্যে। নীল আকাশের বুকে গাড়ির স্বচ্ছ ফাইবারের বডি সূর্যের আলোয় ঝকঝক করছে। গাড়িটা শূন্যে লাট খেতে-খেতে নেমে আসছে নীচে।
লেকে ভেসে বেড়ানো বোটের যাত্রীরা চিৎকার করে উঠল। সে-চিৎকারে আতঙ্ক ছিল, কারণ প্রতিটি বোটই অটোনোভিগেশানে চলছে। শূন্যে বাতাস কেটে গাড়িটা যেভাবে নেমে আসছে তাতে ওটা যে-কোনও বোটের ওপরে এসে পড়তে পারে।
লেক কন্ট্রোল রুম থেকে বোধহয় কিছু একটা করল, কারণ, হঠাৎই সবক’টা নৌকো ছুটতে শুরু করল পাড়ের স্টার্টিং পয়েন্টের দিকে।
আর তখনই গাড়িটা উল্কার মতো ধেয়ে এসে লেকের নীল জলে ‘ঝপাস’ শব্দ তুলে আছড়ে পড়ল। পড়েই বেশ কয়েক হাত লাফিয়ে উঠল, তারপর আবার আছড়ে পড়ল।
লোকের জল বিস্ফোরণের স্প্লিন্টারের মতো চারিদিকে ছিটকে গেল। সেই জলে নৌকোয় বসা অনেক লোকের জামাকাপড় ভিজে গেল। যাত্রীদের হইচই চিৎকার কিছুতেই থামছিল না। গাড়িটা যে কোনও নৌকার ওপরে আছড়ে পড়েনি তার জন্য লোকজনের সেই চিৎকারে আতঙ্কের চেয়ে এখন আনন্দের ছাপ ছিল অনেক বেশি।
