সেই কথামতো জিশানের গাড়ি শহরের নানান জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল। কখনও শহরের পার্ক, কখনও লেক, কখনও অফিসপাড়া, কখনও বা সুপারগেমস কর্পোরেশানের বিল্ডিং কিংবা সিন্ডিকেটের হেডকোয়ার্টার।
শহরটা দেখতে-দেখতে জিশানের মনখারাপ হয়ে যাচ্ছিল। কারণ, ওর ওল্ড সিটির কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। ওর শহরটা একমনে গড়িয়ে যাচ্ছে ক্ষয়ের দিকে।
গাড়ির কন্ট্রোলের দিকে নজর রেখেছিল গুনাজি। আর একইসঙ্গে জিশানের গাইডের কাজ করছিল। শহরের নানান জায়গা সম্পর্কে ও যতটুকু জানে সেটাই অন্তরঙ্গভাবে জিশানকে বলার চেষ্টা করছিল।
শহরের রাস্তাঘাটে পথচারী মানুষজন প্রায় চোখেই পড়ে না। শুধু গাড়ি আর গাড়ি। নানান মাপের, নানান রঙের, নানান ঢঙের। শহরটা যেন শুধু যন্ত্র দিয়ে ঠাসা—ভাবল জিশান। কিন্তু গাড়িগুলো সব ব্যাটারি ড্রিভেন হওয়ায় আকাশ-বাতাস পরিষ্কার—দূষণের ছোঁয়া টের পাওয়া যায় না।
একটা ফ্লাইওভারের ওপর দিয়ে জিশানের গাড়ি ছুটছিল। নীচের দিকে তাকিয়ে জিশান হঠাৎই দেখতে পেল একটা সবুজ জঙ্গল। আকারে চৌকো। তার এক-একদিকের বাহুর মাপ চারশো কি পাঁচশো মিটার হবে।
‘নীচে ওটা কি, গুনাজি?’
‘ওটা পাখির বাসা।’
‘পাখির বাসা মানে?’ অবাক হয়ে গুনাজির দিকে তাকাল জিশান।
জিশানের দিকে চোখ ফেরাল গুনাজি। হাসল : ‘বার্ড স্যাংচুয়ারি, দাদা। আমি শর্টে বলি পাখির বাসা—।’
জিশান হেসে ফেলল।
গুনাজি বলল, ‘এ শহরে এরকম মোট দশটা স্যাংচুয়ারি আছে—শুধু পাখির জন্যে। ওই মিনি জঙ্গলগুলোয় পাখি ছাড়া আর কিছু নেই। যে-কেউ ইচ্ছে করলে টিকিট কেটে ওই জঙ্গলে ঢুকে পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়াতে পারে। তবে তার গায়ে মাইক্রো-ক্যামেরা ফিট করে দেওয়া হয়—যাতে পাখিদের কোনও ক্ষতি করতে না পারে। পাখি ধরতে বা মারতে চেষ্টা করলে জঙ্গলের সিকিওরিটি গার্ডরা তাদের মনিটরে সেটা দেখতে পাবে। আর তখনই শাস্তি—।’
‘কী টাইপের শাস্তি?’ জিশান জানতে চাইল।
‘এসব কেসে শাস্তি হচ্ছে ফাইন—মানে, টাকা। আর টাকার ফিগারটা এমন যে, তার ইকনমিক ইনডেক্স পড়ে যেতে পারে। মানে, বাই-বাই নিউ সিটি হয়ে যেতে পারে—।’
জানলা দিয়ে নীচে তাকাল জিশান। আরও একটা পাখির বাসা ওর চোখে পড়ল। শহরের মধ্যে দশ-দশটা পাখির অভয়ারণ্যের ব্যাপারটা ওর ভালো লাগল।
‘গুনাজি, শহরের মধ্যে পাখি ছাড়া আর কিছুর স্যাংচুয়ারি নেই?’
‘না, আর যা আছে সব শহরের বাইরে। নিউ সিটির মধ্যে শুধু পাখি। কারণ, আমাদের মার্শাল পাখি ভালোবাসেন…।’
জিশানের মনে পড়ে গেল শ্রীধরের অফিসের ফ্যানটেইলড লাভবার্ডস- গুলোর কথা। আর একইসঙ্গে মনে পড়ল পাখিগুলোর ‘কন্ট্রোলড ফ্রিডম’-এর কথা।
কিন্তু এই অভয়ারণ্যের পাখিগুলোর স্বাধীনতায় শ্রীধর পাট্টা কোনওরকম খবরদারি করেননি।
শহরের নানান জায়গায় জিশান অনেক ফ্লাইওভার দেখতে পাচ্ছিল। বিশাল-বিশাল, রামধনুর মতো তাদের চেহারা। আর তাদের প্রত্যেকের গায়ে লাল, নীল, হলদের মতো উজ্জ্বল রং। আর সবক’টাই এক অলৌকিক উপায়ে কোনওরকম পিলার ছাড়াই শূন্যে ভেসে আছে।
এখন যদি একটা সত্যিকারের রামধনু ওঠে তা হলে দারুণ হয়। ভাবল জিশান।
শহরে ঘোরাঘুরির পথে গুনাজির গাড়ি এক ফ্লাইওভার ছেড়ে আর-এক ফ্লাইওভারে উঠছিল। জিশানের মনে হচ্ছিল, ও নানান পাহাড়ে উঠছে আর নামছে। আর সেই ‘পাহাড়’ থেকে দেখতে পাচ্ছে গাছপালা, হাই-রাইজ, উড়ে যাওয়া পাখি আর শিস দিয়ে ছুটে যাওয়া শুটার।
দুপুরের খাওয়াদাওয়া সেরে নেওয়ার জন্য একটা ফুড মলের কাছে গাড়ি পার্ক করল গুনাজি।
প্রায় দশতলা উঁচু মল-বিল্ডিং। বাইরের চেহারা সুষম বহুভুজের মতো। পুরোটাই কাচে ঢাকা। আর বিল্ডিংটা খাড়াভাবে দাঁড়িয়ে খুব ধীরে-ধীরে ঘুরছে। বিল্ডিং-এর নানান তলায় বসে থাকা লোকজনকে আকাশের ছায়া-মাখা অবস্থায় দেখা যাচ্ছে।
শহরের বৈভব আর কারিগরি দক্ষতা জিশানকে যেন আবার নতুন করে ধাক্কা দিল।
গাড়ি থেকে নামার আগে গুনাজি বলল, ‘দাদা, সানগ্লাসটা চোখে দিয়ে নিন। আর এই ব্লু ক্যাপটা মাথায় পরে নিন—’ গাড়ির পিছনের সিট থেকে একটা ব্যাগ তুলে নিয়ে তার ভেতরে হাত ঢোকাল গুনাজি। একটা সানগ্লাস আর একটা নীল টুপি জিশানের হাতে দিয়ে বলল, ‘আমার ওপরে এরকমই ইনস্ট্রাকশন আছে। এই সানগ্লাস আর টুপি না পরলে পাবলিক চট করে আপনাকে চিনে ফেলতে পারে। তখন ভিড়-টিড় জমে গিয়ে ঝামেলা হবে…।’
জিশান গুনাজির দেওয়া জিনিস দুটো চোখে আর মাথায় পরে নিল। তারপর গাড়ি থেকে নামল।
খাওয়াদাওয়া আর আরামে ঘণ্টাদেড়েক কেটে গেল। মাইক্রোভিডিয়োফোনে মিনির সঙ্গে কথা বলল জিশান। প্রতিদিনের বরাদ্দ দশমিনিট থেকে কিছু-কিছু করে সময় জমিয়ে জিশানের টকটাইম ব্যালান্স এখন এক ঘণ্টারও বেশি। ওর মনে হয়েছে, কিল গেমে যাওয়ার আগের কয়েকটা দিন মিনির সঙ্গে ওর অনেক বেশি সময় ধরে কথা বলতে ইচ্ছে করবে। তাই ও গত একমাস ধরেই এমভিপি-র সময় জমাচ্ছে।
গুনাজি আবার যখন গাড়িতে স্টার্ট দিল তখন জিশান ‘ছদ্মবেশ’ খুলে রেখে মিনি আর শানুর ভাবনায় ডুবে আছে।
গাড়ি চালাতে-চালাতে গুনাজি বলল, ‘দাদা, আমরা এবার সেন্ট্রাল লেকের দিকে যাচ্ছি। এটা শহরের খুব সুন্দর জায়গা। লেকটা মাপে এত বড় যে, এপার থেকে ওপার দেখা যায় না। আর সাহেবদের চোখের মতো নীল জল…।’
