জিশান অবাক হয়ে ছেলেটাকে দেখতে লাগল।
গুনাজির বয়েস বড়জোর উনিশ কি কুড়ি। টগবগে। চাবুকের মতো। মুখ থেকে কম বয়েসের ছটা বেরোচ্ছে।
কিন্তু ছেলেটা জিশানকে হঠাৎ সেলাম ঠুকল কেন? আর ‘স্যার’ই বা বলছে কেন?
এই ব্যাপারগুলো জিশান মোটেই পছন্দ করে না। তাই গুনাজিকে বলল ‘গুনাজি, তুমি আমার ড্রাইভার নয়—আমার মাস্টারমশাই। আমাকে তুমি গাড়ি চালানো শেখাবে। আর একইসঙ্গে তুমি আমার গাইড, আমার বন্ধু। তুমি আমাকে ”স্যার” বলবে না, আর ওইরকম বোকা-বোকা সেলামও ঠুকবে না—।’
জিশানের কথায় ছেলেটা একটু দমে গেল যেন। তারপর বলল, ‘আপনার মতো করে কেউ কখনও বলেনি—সেই ষোলো বছর বয়েস থেকে গাড়ি চালাচ্ছি—।’ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর : ‘তবে আপনাকে সেলাম ঠুকেছি অন্য কারণে।’
‘কী?’
‘আপনার সমস্ত গেম আমি টিভিতে দেখেছি। আপনি এককথায় সুপার। আপনার মতন কাউকে দেখিনি। তা ছাড়া পিট ফাইটের সময় আপনি লাস্ট মোমেন্ট পর্যন্ত মাথা ঠান্ডা রেখেছিলেন। পাবলিক হাজারটা ওসকানি দেওয়া সত্বেও আপনি জাব্বাকে মেরে ফেলেননি—ছেড়ে দিয়েছেন। সেলামটা সেইজন্যে—।’
জিশান ছেলেটাকে দেখতে লাগল। ও তখনও কথা বলছিল।
‘আসলে আমাদের এই শহরটা থেকে দয়া, মায়া, ক্ষমা—এসব উঠে গেছে। তাই টিভিতে অনেকদিন পর সেটা দেখে খুব ভালো লেগেছিল। আমার কখনও যদি আপনাকে সেলাম করার ইচ্ছে হয় সেটা কিন্তু স্যার বারণ করবেন না।’
‘আবার স্যার?’
‘সরি।’ লাজুক হাসল গুনাজি। আঙুল তুলে বাইরের দিকে দেখাল : ‘চলুন, গাড়িটা ওইদিকে ডান সাইডে পার্ক করা আছে—।’
ওর সঙ্গে হাঁটা দিল জিশান। গুনাজির পাশাপাশি হাঁটতে ওর কেন জানি না ভালো লাগছিল।
ফোয়ারার জলে সকালের রোদ চিকচিক করছিল। অসংখ্য সোনার কুচি। জিশানের চোখ পলকের জন্য আটকে গেল।
তারপর আকাশের দিকে তাকাল। আজ অনেক বেশি নীল লাগছে। সেখানে বেশ কয়েকটা পাখি চোখে পড়ল। ডানা খেলিয়ে উড়ে যাচ্ছে।
জিশানের পাখি হতে ইচ্ছে করল। কন্ট্রোলড ফ্রিডম নয়—ওর টোটাল ফ্রিডম চাই। ওর একার জন্য নয়—সকলের জন্য।
জিশান একটা স্বপ্নের মধ্যে ঢুকে পড়েছিল।
ঠিক তখনই গুনাজি ওর দিকে মুখ ফিরিয়ে জিগ্যেস করল, ‘আপনার গায়ে খুব জোর, তাই না?’
জিশান ওর দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল। তারপর বলল, ‘শুধু গায়ে নয়, গুনাজি—মনেও জোর চাই…।’
•
বাতাসে পাখির পালক যখন ভেসে যায় তখন যে-কোমলতার স্পর্শ অনুভব করা যায় জিশানের ঠিক তেমনটাই লাগছিল। গুনাজি যেন গাড়ি চালাচ্ছিল না, একটা তুলতুলে পালক ভাসিয়ে নিয়ে চলেছিল নিউ সিটির নিখুঁত পরিপাটি রাস্তায়।
চারপাশে তাকালেই ছবির মতো সব বাড়ি, ছবির মতো মসৃণ রাস্তাঘাট, পার্ক, গাছপালা, বাগান, লেক। ছবিটা সবমিলিয়ে খুবই সুন্দর, তবে এটা যে ‘বাইরের’ ছবি সেটা জিশানের মনে পড়ল। ‘ভেতরের’ ছবিটা দেখার জন্য জিশান চোখ বুজল—কয়েক সেকেন্ড চোখ বুজে রইল।
গুনাজি গাড়ি চালাচ্ছিল আর টগবগ করে কথা বলছিল। জিশানকে ওর স্যাটেলাইট ফোনটা দিয়ে তার নানান বোতামের ব্যবহার বুঝিয়ে দিচ্ছিল। কী করে ফোন করতে হয়, কী করে ফোন ধরতে হয়, কী করে জি. পি. আর. এস. আর. জি. পি. এস ব্যবহার করতে হয়—এইসব।
‘তুমি এত কিছু শিখলে কী করে?’ জিশান ওকে জিগ্যেস করল।
গাড়ির সামনের কাচে চোখ রেখে হাসল গুনাজি : ‘স্যাটেলাইট ফোন নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করা আমার স্বভাব। তা ছাড়া আমাদের নিউ সিটির ”ডেটা কমিউনিকেশান সেন্টার”-এ আমি ছ’মাস ট্রেনিং নিয়েছি। আমি লাস্ট দেড় বছর ধরে সবাইকে স্যাটেলাইট ফোন অপারেট করা শেখাই আর সি থ্রু অটোমোবিল চালানো শেখাই। এই কাজটা আমার খুব ভালো লাগে…।’
যে-গাড়িটা গুনাজি জিশানের জন্য নিয়ে এসেছে সেটা ব্যাটারিতে চলে এবং সেটা সি থ্রু। অর্থাৎ, গোটা গাড়িটা স্বচ্ছ ফাইবারের তৈরি। তার ভেতরের বিভিন্ন পার্টস, মোটর, ক্লাচ, গিয়ার বক্স, ডিফারেনশিয়াল গিয়ার—সবই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। গাড়ির ডিজাইন এরোডায়ানামিক এবং একইসঙ্গে আরগোনোমিক। ছুটে যাওয়া গাড়িটাকে যাতে দেখতে কারও অসুবিধে না হয় তার জন্য গাড়িকে ঘিরে ফাইবারের বডির ওপরে ছ’ইঞ্চি চওড়া ফ্লুওরেসেন্ট ব্লু রঙের উজ্জ্বল পটি আঁকা আছে। এই নীল রং দিনে কিংবা রাতে নীল আগুনের মতো জ্বলজ্বল করে।
গাড়িটাকে দেখেই জিশানের তাক লেগে গিয়েছিল। সে-কথা গুনাজিকে বলতেই ও বলল, ‘এ-গাড়িটা ইমপোর্ট করা, স্যার…।’
‘আবার ”স্যার”?’ জিশান বকুনির ঢঙে বলল।
‘না, স্যার—মানে, দাদা। এটা ইমপোর্টেড গাড়ি। তবে কিউ মোবাইলের চেয়ে দামে সস্তা। এ-গাড়ি নিউ সিটিতে অনেক আছে।’
জিশান গাড়ির ভেতরটা অবাক হয়ে দেখছিল। অটো এয়ারকন্ডিশানিং সিস্টেম। অটো নেভিগেশান স্ক্রিন। স্মার্ট গিয়ার। ইন্টেলিজেন্ট কন্ট্রোল। আরও কত কী!
গুনাজি জীবন্ত ‘ম্যানুয়াল’ হয়ে জিশানকে সি থ্রু অটোমোবিল নিয়ে জ্ঞান দিচ্ছিল। ওর কথায় বোঝা যাচ্ছিল, এই গাড়ির কারিগরি নিয়ে ও অনেক সময় খরচ করেছে।
জিপিসি-র গেস্টহাউস থেকে গাড়ি ছাড়ার একটু পরেই জিশান গুনাজিকে বলেছে, ‘গুনাজি, আজ কিন্তু আমি গাড়ি চালানো শিখব না। আজ তুমি নানান জায়গায় ঘুরে আমাকে শহরটা চেনাবে, কেমন?’
‘যা বলবেন…।’
