হঠাৎই জিশানের দিকে এগিয়ে এল সুধা। হাতটা বাড়িয়ে দিল। বলল, ‘তোমার হিরোইকস আমি টিভিতে দেখেছি। য়ু আর অ’সাম। লাস্ট পাঁচ বছরে তোমার মতো কেউ আসেনি। মনে হচ্ছে, তুমি মার্শালের হিসেব ওলটাতে পারবে। উইশ য়ু অল দ্য বেস্ট ইন কিল গেম—।’
‘থ্যাংকস—’ বলে সুধার বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা মুঠোয় নিল জিশান। হ্যান্ডশেক করল।
স্যামি জিশানের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। জিশান কী ভেবে ওকে বলল, ‘আপনি একটু ল্যাবের বাইরে গিয়ে দাঁড়ান—আমি আসছি।’
চিকি তখন ওর কাজের টেবিলে চলে গেছে। ওর আর্ক কম্পিউটারের সামনে বসে পড়েছে।
জিশান চিকির দিকে একবার তাকাল। আন্দাজ করতে চেষ্টা করল, ও সুধাকে নীচু গলায় কোনও কথা বললে সেটা চিকি শুনতে পাবে কি না।
জিশান সুধার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোমাকে একটা কথা জিগ্যেস করব?’
‘কী কথা?’
প্রায় ফিসফিস করে জিশান বলল, ‘একটা ব্যাপার ভীষণ তাজ্জব লাগছে। তোমার মতো সুপার লেভেলের একজন সায়েন্টিস্ট শ্রীধর পাট্টার তৈরি নরকে বসে কী করছে—।’
সুধাসুন্দরীর মুখের উজ্জ্বল ভাবটা মিলিয়ে গেল। দাঁত দিয়ে নীচের ঠোঁট কামড়ে ধরল ও। বোধহয় ভাবতে লাগল।
একটু পরে ও বলল, ‘কাল তো তুমি আসছ। কাল বলব।’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল : ‘সত্যিই তো! এই নরকে আমার থাকার কথা নয়…।’
•
সকালে ব্রেকফাস্ট সেরে নেওয়ার পর গেস্টহাউসের ঘর ছেড়ে বাইরে এল জিশান। আজ ওর স্বাধীনতার প্রথম দিন।
সকাল সাতটার সময় অটোমেটিক প্লেট টিভি থেকে মিষ্টি গলার মেয়েটি জিশানের ঘুম ভাঙিয়েছে। তারপর ওর সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেছে।
‘গুড মর্নিং, জিশান।’
‘গুড মর্নিং—’ জিশানও পালটা বলল। ইন্টারঅ্যাকটিভ টিভিতে সে-কথা শুনতে পেল মেয়েটি।
দু-আঙুল তুলে জয়ের ‘ভি’ সংকেত দেখাল মেয়েটি : ‘স্বাধীনতা জিন্দাবাদ!’ তারপর হাসল।
‘থ্যাংকস।’
‘এখন কয়েকটা জরুরি কথা সেরে নিলে তোমার আপত্তি আছে?’
‘না, বলো—।’
‘আমাদের মার্শাল তোমার জন্যে একটা অটোমোবিল অ্যালট করেছেন। সেই গাড়িটা নীচের পার্কিং লটে এখন দাঁড়িয়ে আছে। তুমি আমাদের এই হাই-টেক গাড়ি প্রথম-প্রথম চালাতে পারবে না। তাই গাড়িতে একজন ড্রাইভার রয়েছে। এ ছাড়া তুমি গাড়িতে একটা প্যাকেট পাবে। তাতে জেনারেল প্যাকেট রেডিয়ো সারভিস আর গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম অ্যাক্টিভেট করা একটা স্যাটেলাইট ফোন রয়েছে—নিউ সিটিতে তুমি যতদিন আছ ফোনটা ততদিন তুমি ইউজ করবে। এ ছাড়া নিউ সিটি সম্পর্কে নানান তথ্য জানার জন্যে রয়েছে কয়েকটা ডিভিডি। গাড়ির ডিভিডি প্লেয়ারে তুমি ইচ্ছেমতো ওগুলো চালিয়ে দেখতে পারো—।’
‘নিউ সিটির কোথায় আমি যেতে পারব, আর কোথায় পারব না, তার কোনও ইনস্ট্রাকশন রয়েছে?’ জিশান জিগ্যেস করল।
‘হ্যাঁ, ওই প্যাকেটে রয়েছে তোমার সি. এফ. সি. স্মার্ট কার্ড। সিটির যে-যে জায়গায় তুমি বন্ধ দরজা পাবে সেখানে ঢোকার জন্যে তোমাকে এই সি. এফ. সি. কার্ডটা সোয়াইপ করতে হবে। তাতে দরজা যদি খুলে যায় তা হলে তুমি অ্যালাউড—আর না খুললে, নয়।
‘শোনো। ড্রাইভার ছেলেটির নাম গুনাজি। ভীষণ ব্রাইট বয়। ও তোমাকে সবরকমভাবে গাইড করবে, আর সব ব্যাপারে হেলপ করবে। বলতে গেলে ও তোমার লিভিং স্মার্ট কার্ড। ও.কে.?’
জিশান বলল, ‘ও.কে.।’
‘এনি ফারদার কোশ্চেন?’
জিশান ভেবে দেখল, ওর মনে এই মুহূর্তে আর কোনও প্রশ্ন নেই। তাই ও বলল, ‘থ্যাংক য়ু। নো কোশ্চেন।’
হাসল মেয়েটি : ‘গুড। তা হলে শেষ জরুরি কথাটা এবার বলি। টাকা। রাস্তায় বেরোলে তোমার কিছু খরচ হতে পারে। অনেকগুলো কমপিটিশানে জিতে তোমার এখন অনেক টাকা। সেই টাকা থেকে তুমি অনায়াসে খরচ করতে পারো। ওই সি. এফ. সি. স্মার্ট কার্ডই তোমার এটিএম কার্ড। তুমি নিউ সিটির যে-কোনও এটিএম কিয়োস্কে ওই কার্ড সোয়াইপ করে টাকা তুলতে পারো। তোমার এটিএম পিন গুনাজি তোমাকে বলে দেবে। হি ইজ আ ভেরি স্মার্ট বয়।’ হাত নাড়ল মেয়েটি, বলল, ‘বাই, জিশান—।’
‘বাই—।’
ইন্টারঅ্যাকটিভ টিভি অফ হয়ে গেল।
এখন, ব্রেকফাস্টের পর, জিশান ঘরের দরজা টেনে দিয়ে বাইরে বেরিয়েছে। পরনে ব্লু জিনস, কালো রঙের টি-শার্ট, কোমরে সরু কালো বেল্ট। বেল্টের সঙ্গে আটকানো একটা পাউচে মাইক্রোভিডিয়োফোনটা ঢুকিয়ে নিয়েছে। নিউ সিটিতে ঘুরে বেড়ানোর সময় মিনির সঙ্গে কথা বলতে চায় ও। শহরটা দেখতে কেমন তার একটা ধারাবিবরণী দিতে চায়।
গেস্টহাউস ছেড়ে নীচে নেমে পায়ে-পায়ে ফোয়ারার কাছে গিয়ে দাঁড়াল জিশান। ফোয়ারার দিকে তাকিয়ে ওর ফকিরচাঁদের কথা মনে পড়ল। মনে পড়ল ওর হতভাগ্য ভাইয়ের কথা। নেকরোসিটির কথা।
এদিক-ওদিক চোখ ফেরাল জিশান। এখন কী করে ও গুনাজিকে খুঁজে পাবে? ওর গাড়িটাই বা কোথায়?
হঠাৎই দেখল, মেন গেটের দিক থেকে অত্যন্ত রোগা লম্বা একটা ছেলে ওর দিকে এগিয়ে আসছে। ফরসা, খোকা-খোকা চেহারা। গোঁফের রেখা সদ্য গজিয়েছে। মাথার চুল সোনালি রঙে রাঙানো এবং হেয়ার জেলের দৌলতে বেশ খাড়া-খাড়া হয়ে আছে।
জিশানের কাছে এসে একগাল হাসল ছেলেটা। বিচিত্র ঢঙে সেলাম ঠুকে বলল, ‘স্যার, আমার নাম গুনাজি। ট্রান্সপোর্ট ডিপার্টমেন্ট থেকে আমাকে একটা গাড়ি দিয়ে আপনার কাছে পাঠিয়েছে। আপনার সঙ্গে সবসময় থাকব আমি। প্রচুর সার্ভিস দেব—।’
