‘তাই? আমার ভীষণ জানতে ইচ্ছে করছে—কী এই ম্যাজিক শট। এই ইনজেকশন নিলে কীভাবে কন্ট্রোলড ফ্রিডম পাওয়া যায়…।’
‘বলছি—’ বলে সুধাসুন্দরী স্যামির দিকে তাকিয়ে কয়েকটা টেকনিক্যাল ইনস্ট্রাকশন দিল। তারপর তাকাল জিশানের দিকে : ‘ছোট্ট একটা পলিমার কোটেড সিলভার ক্যাপসুল তোমার কানের নীচে আমি ইনজেক্ট করে দেব। সেই মোমেন্টটাই হল টাইম জিরো। তারপর থেকে ঠিক চব্বিশ ঘণ্টা পর তোমার ভীষণ জল তেষ্টা পাবে। ভয়ঙ্কর জল তেষ্টা। ডিমনিক থার্স্ট। তুমি কল্পনা করতে পারবে না এমন তেষ্টা।’
‘তেষ্টা পেলে জল খাব—সিম্পল।’ জিশান হালকাভাবে বলল।
‘উঁহু, ওটাই তো মজা! যত খুশি জল তুমি খাও না কেন, ওই তেষ্টা কিছুতেই কমবে না। কিছুতেই না।’
‘তা হলে?’
হাসল সুধা। বলল, ‘চব্বিশ-ঘণ্টা শেষ হওয়ার আগেই তোমাকে ফিরে আসতে হবে আমার কাছে—এই ল্যাবে। আমি রিমোট অপারেশানে সিলভার ক্যাপসুলটাকে নেক্সট টুয়েন্টি ফোর আওয়ার্স-এর জন্যে রিচার্জ করে দেব। তখন তুমি আবার স্বাধীন—ইচ্ছেমতো নিউ সিটির যেখানে-সেখানে ঘুরে বেড়াতে পারো—চব্বিশ ঘণ্টার জন্যে।’ একটু থামল সুধা। স্যামির দিকে একপলক তাকিয়ে আবার চোখ ফেরাল জিশানের দিকে : ‘আই হোপ নাউ য়ু আন্ডারস্ট্যান্ড হোয়াট ইজ কন্ট্রোলড ফ্রিডম—।’
‘জিশান মাথা নাড়ল ওপর-নীচে। হ্যাঁ, এবার ও ব্যাপারটা পরিষ্কার বুঝতে পেরেছে।
স্যামি একটা অদ্ভুত ধরনের পিস্তল আর একটুকরো সলিড স্টেরিলাইজার ট্রে-তে সাজিয়ে সুধাসুন্দরীর কাছে নিয়ে এল।
জিশানের ডানদিকের কানের নীচে স্টেরিলাইজার ঘষল সুধা। তারপর ট্রে থেকে অদ্ভুত ধরনের পিস্তলটা তুলে নিল।
জিশান লক্ষ করল, পিস্তলের নলটা অস্বাভাবিক মোটা, কালো রঙের। গুলির চেম্বারের গায়ে একটা ডিজিটাল ডিসপ্লে উইন্ডো। সেখানে কতকগুলো সংখ্যা দেখা যাচ্ছে।
সুধাসুন্দরী পিস্তলের নলটা জিশানের ডান কানের নীচে চেপে ধরল।
‘সরি, জিশান। এটা না করে আমার উপায় নেই।’
জিশানের ভেতরে কোনও প্রতিরোধ তৈরি হল না। ওর একটা মাংসপেশিও প্রতিরোধের প্রতিবর্তী ক্রিয়ায় শক্ত হল না। বরং মনে হল, আপাতভাবে ‘স্বাধীন’ হয়ে নিউ সিটিতে ঘুরে বেড়ানো যাবে, এটাই বা কম কী!
‘রেডি, স্টেডি, গো—।’ বলে পিস্তলের ট্রিগার টিপল সুধা।
ছোট্ট চাপা শব্দ হল। এবং জিশানের মনে হল একটা অন্ধকার কুয়োর ভেতরে ও পড়ে যাচ্ছে। পরিভাষায় যাকে বলে ‘ফ্রি ফল’।
ও পড়ছে তো পড়ছেই। পেটের ভেতরটা কেমন অদ্ভুতরকম খালি লাগছে।
কিন্তু একফোঁটাও যন্ত্রণা নেই।
বহুদূর থেকে একটা ফাঁপা নলের মধ্যে দিয়ে সুধাসুন্দরীর প্রতিধ্বনিময় গলা ভেসে এল, ‘স্টেডি, জিশান, স্টেডি—।’
হঠাৎই চোখের সামনে আলো ফুটে উঠল। চারপাশটা আবার স্বাভাবিক। ‘ফ্রিডম কন্ট্রোল ল্যাব’-কে আবার আগের চেহারায় দেখতে পেল জিশান। ওই তো সুধাসুন্দরী! ওই তো স্যামি আর চিকি!
সুধা হাসছিল : ‘উঠে দাঁড়াও, জিশান। এখন নিউ সিটির কোথাও তোমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা। এনজয় ইয়োর ফ্রিডম…।’
‘থ্যাংকস—’ বলে জিশান চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ডান কানের নীচে গলার পাশটায় হাত দিল। একটা মসৃণ চাকতি হাতে ঠেকল ওর। কেউ যেন একটা টিপ কপালের বদলে ওই জায়গাটায় শক্ত করে বসিয়ে দিয়েছে। একইসঙ্গে একটু ব্যথা টের পেল ও।
‘ওটা পোস্ট অপস পলিমার সিল। ক্যাপসুলটা শরীরে ঢোকার জন্যে সামান্য যেটুকু ড্যামেজ হয়েছে সেটা আমি সিলিং গান দিয়ে সিল করে দিয়েছি। তখন তুমি ব্ল্যাক আউট স্টেটে ছিলে। তিন ঘণ্টার মধ্যে সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে।’
জিশান ল্যাবের ভেতরে কয়েক পা পায়চারি করল। না, শরীর কোনও অসুবিধের কথা জানান দিচ্ছে না। সমস্ত পেশি জিশানের নিয়ন্ত্রণেই আছে।
‘আমি কি তা হলে এখন যেতে পারি?’ জানতে চাইল জিশান।
‘হ্যাঁ—পারো।’ সুধাসুন্দরী বলল, ‘কিন্তু কাল তোমাকে রাত ন’টার সময় আমার এই ল্যাবে ফিরে আসতে হবে। যদিও এখন সময়…’ কন্ট্রোল প্যানেলের ঘড়ির দিকে তাকাল : ‘…রাত প্রায় এগারোটা, আমি সেফসাইডে থাকার জন্যে তোমাকে দু-ঘণ্টা আগে আসতে বলছি এবং সেই সময়টাই ফিক্স করেছি। তখন আমি তোমার কন্ট্রোলড ফ্রিডম আবার পরদিন রাত এগারোটা পর্যন্ত রিচার্জ করে দেব। ইনিশিয়াল শটের সময় ওই ক্যাপসুলটা যে-রেফারেন্স টাইম ওর মেমোরিতে স্টোর করে সেই টাইমটার আর নড়চড় হয় না। সো—’ হাতে হাত ঘষল সুধা। ভোরবেলা ফোটা ফুলের মতো প্রশান্ত আয়ত চোখ মেলে জিশানকে দেখল : ‘টুমরো ইভনিং, নাইন ও’ ক্লক। তোমার সঙ্গে রোজ এই ল্যাবে আমার দেখা হবে—।’
‘হ্যাঁ—কিল গেমের আগের রাত পর্যন্ত।’
এ-কথায় সুধা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, ‘স্যামি তোমাকে সঙ্গে করে এখন নিয়ে যাবে। যা-যা ফরম্যালিটি আছে সেগুলো সেরে নেবে—।’
‘ফরম্যালিটি?’ জিশানের ভুরু কুঁচকে গেল।
‘হ্যাঁ—ফরম্যালিটি।’ মাথা নেড়ে বলল সুধাসুন্দরী, ‘রিমোট অপারেশানস ল্যাবে যাওয়া-আসার জন্যে তোমাকে একটা স্মার্ট কার্ড দেওয়া হবে। প্রতিদিন রাত পৌনে ন’টা থেকে সওয়া ন’টার মধ্যে তুমি ওই কার্ড সোয়াইপ করে আমার এই ল্যাবে ঢুকে পড়তে পারবে।’
‘তা ছাড়া তোমাকে একটা সি. এফ. সি. স্মার্ট কার্ড দেওয়া হবে। মানে, ”কন্ট্রোলড ফ্রিডম সিটিজেন” কার্ড। নিউ সিটিতে ঘুরে বেড়ানোর সময় নানা জায়গায় এই স্মার্ট কার্ডটা তোমার কাজে লাগবে। আর তোমাকে একটা পার্সোনাল গাড়িও দেওয়া হবে। তবে ওটা মার্শালের ব্যাপার। উনি ঠিক সময়ে ওটার ব্যবস্থা করে দেবেন।’
