সুধাসুন্দরীর মুখে অদ্ভুত এক আলো দেখতে পেল জিশান।
•
সুধাসুন্দরী কথা বলছিল, আর একইসঙ্গে ব্যস্ত হাতে কাজ করছিল। কন্ট্রোল প্যানেলের কাছে গিয়ে কতকগুলো মিটার রিডিং দেখল, একটা ছোট মাপের পুশবাটন প্যানেলে আঙুলের ডগা দিয়ে চটপট কয়েকটা বোতাম টিপল।
সঙ্গে-সঙ্গে দরজার কাছ থেকে একটা ‘ক্লিক’ শব্দ শোনা গেল আর দরজার কাচটা অস্বচ্ছ হয়ে গেল।
জিশানের কাছে এল সুধাসুন্দরী : ‘দরজাটা লক করে দিলাম। এবার তোমার ডানহাতটা চেয়ারের হাতলের ওপরে রাখো। হাতের চেটো ওপর দিকে—।’
জিশান কথা শুনল।
‘স্যামি! চিকি!’ আর্ক কম্পিউটারের সামনে বসে থাকা অ্যাসিস্ট্যান্ট দুজনের দিকে ইশারা করে বলল সুধা, ‘পেশেন্টকে গ্রিন টেস্টের জন্যে রেডি করো—।’
পেশেন্ট! জিশান এখন তা হলে পেশেন্ট? অন্তত সুধার চোখে।
জিশান অপেক্ষা করতে লাগল। অপেক্ষা করতে লাগল সুধাও।
চিকি আর স্যামি কম্পিউটার ছেড়ে উঠে এল। ছিপছিপে চেহারার দুজন স্মার্ট যুবক। একজনের চোখের দৃষ্টিতে কৌতূহল মাখানো, আর-একজনের চোখ একেবারে নির্লিপ্ত, ঠান্ডা।
ঠান্ডা চোখের যুবকটি চটপট জিশানের কাছে এল। জিশানের দুটো হাত চেয়ারের হাতলের সঙ্গে ফাইবারের স্ট্র্যাপ দিয়ে বেঁধে দিল। তারপর সে উবু হয়ে বসে পড়ল জিশানের পায়ের কাছে। গোড়ালির গাঁটের ঠিক ওপরটায় শক্ত করে স্ট্র্যাপ বেঁধে দিল।
জিশান অবাক হয়ে সুধার দিকে তাকাল।
হাসল সুধা। বলল, ‘সেফটি, জিশান। কারণ এখন যে-টেস্টটা করব তাতে তোমাকে একটা স্পেশাল মেডিসিন ইনজেক্ট করতে হবে। যদি তাতে তোমার কোনও রিয়্যাকশন না হয় তা হলে ওয়েল অ্যান্ড গুড। কোনও প্রবলেম নেই। কিন্তু…’ জিশানের কাছে এগিয়ে এল সুধাসুন্দরী : ‘কিন্তু যদি রিয়্যাকশন হয় তা হলে…তা হলে তোমার ঝামেলা হবে। ঠিক দশ সেকেন্ড তোমার শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা হবে। তখন তুমি পাগলের মতো হাত-পা ছুড়তেও পারো। তাই এই স্ট্র্যাপ। সেফটি।’ আবার হাসল ও।
‘আর যদি কোনও রিয়্যাকশন না হয়, তা হলে?’
‘তা হলে তুমি গ্রিন টেস্টে পাশ। দশ মিনিট পরেই তোমাকে ম্যাজিক শট দেওয়া যাবে।’
দ্বিতীয় লোকটি একটা অদ্ভুত ট্রে নিয়ে এসে দাঁড়াল সুধাসুন্দরীর সামনে। ট্রে-তে স্বচ্ছ প্লাস্টিকের মোড়কে একটা খুব সরু ইনজেকশন সিরিঞ্জ। একজোড়া হালকা নীল রঙের রাবার লেটেক্স-এর গ্লাভস। একটা ছোট্ট ওষুধের শিশি। শিশিতে গাঢ় সবুজ রঙের একটা তরল। আর তার পাশে ছোট্ট গোলাপি সাবানের মতো দেখতে একটা কী যেন।
এতক্ষণে ‘গ্রিন টেস্ট’ নামের মানে বুঝতে পারল জিশান।
সুধাসুন্দরী কাজ শুরু করল রোবটের মতো যান্ত্রিক দক্ষতায়। লেটেক্স গ্লাভস পরে নিয়ে ইনজেকশনের সিরিঞ্জটা বের করে নিল। ভায়ালে ছুঁচ ফুটিয়ে সবুজ তরলের প্রায় সবটাই টেনে নিল সিরিঞ্জে। ট্রে থেকে গোলাপি টুকরোটা তুলে নিয়ে ঝুঁকে পড়ল জিশানের ওপরে।
টুকরোটা জিশানের ‘চিত’ করা ডানহাতের শিরার ওপরে ঘষতে-ঘষতে সুধাসুন্দরী বলল, ‘এটা সলিড স্টেরিলাইজার। আর সিরিঞ্জটার স্পেশালিটি হল, এটার ছুঁচটা ভীষণ শক্ত অথচ সরু—এত সরু যে, তুমি টেরই পাবে না এটা তোমার শিরায় ঢুকছে।’
‘আর এই সবুজ লিকুইডটা?’ জিশান জিগ্যেস করল।
‘ওটা একটা স্ট্রেঞ্জ কম্পাউন্ড…’ হাসল সুধা : ‘আমার আবিষ্কার…।’
‘আপনার…মানে, তোমার আবিষ্কার? সত্যি?’
‘হ্যাঁ—এতে অবাক হওয়ার কী আছে? জানো, বায়োকেমিস্ট্রির ফিল্ডে আমার তেতাল্লিশটা পেটেন্ট আছে!’
‘পেটেন্ট?’ অবাক হয়ে সুধার দিকে তাকাল জিশান : ‘সেটা আবার কী?’
‘সোজা কথায় বোঝাতে গেলে, আমার তেতাল্লিশটা আবিষ্কার আছে। সেই আবিষ্কারগুলোর মালিকানা রেজিস্ট্রি করার নামই হল পেটেন্ট…।’ সিরিঞ্জের তীক্ষ্ণ ডগাটা জিশানের হাতের শিরায় ছুঁইয়ে সুধাসুন্দরী বলল, ‘রেডি, স্টেডি, গো—!’
এবং সবুজ তরলটা জিশানের শিরায় ঢুকিয়ে দিয়ে তৎপরভাবে দু-পা পিছিয়ে দাঁড়াল। জিশানের চোখের দিকে অপলকে তাকিয়ে রইল। বোধহয় মনে-মনে এক-দুই গুনে দশ সেকেন্ড পার করছিল। আর ওর অ্যাসিস্ট্যান্ট দুজন কন্ট্রোল প্যানেলের ডিজিটাল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ছিল।
জিশান কোনও যন্ত্রণা টের পাচ্ছিল না। ও স্বাভাবিক গলায় সুধাকে জিগ্যেস করল, ‘তুমি তা হলে খুব নামকরা সায়েন্টিস্ট?’
‘কে জানে!’ ঠোঁট ওলটাল : ‘লোকে তো বলে।’
অ্যাসিস্ট্যান্ট দুজন সুধাকে লক্ষ করে হাতের ইশারা করল। যার অর্থ হল, দশ সেকেন্ড পার হয়ে গেছে।
‘তুমি গ্রিন টেস্টে পাশ করে গেছ, জিশান। য়ু আর নাউ এলিজিবল ফর গেটিং দ্য ম্যাজিক শট।’ হঠাৎই জিশানের মাথায় হাত দিয়ে ওর চুল ঘেঁটে দিল সুধাসুন্দরী। যেমন করে গুরুজনরা বাচ্চাদের আদর করে, অনেকটা সেইরকম।
‘আমার হাত-পা কি এখনও বাঁধা থাকবে?’ চোখের ইশারায় হাত-পায়ের স্ট্র্যাপগুলো দেখাল জিশান।
‘না, না, এক্ষুনি ওগুলো খুলে দিচ্ছি। চিকি—।’
চিকি যন্ত্রের মতো কাজ করতে শুরু করল।
‘এই দশটা মিনিট আমরা কীভাবে কাটাব?’ প্রশ্নটা করে জিশান সুধাসুন্দরীর দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে রইল।
সুধাসুন্দরী ইনজেকশনের সিরিঞ্জটা স্যামির ট্রে-তে ফিরিয়ে দিয়ে বলল, ‘ম্যাজিক শট প্রিপেয়ার করো—।’ তারপর জিশানের দিকে তাকাল : ‘এখন আর ন’মিনিট বাকি আছে। এই সময়টা তোমার সঙ্গে আমি কথা বলতে পারি—ম্যাজিক শট নিয়ে।’
