জিশান অবাক হচ্ছিল। এই মেয়েটা শ্রীধরের রাজত্বে এসে পড়ল কেমন করে?
জিশানের তিনজন সঙ্গী চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। বোকা-বোকা নজরে এদিক-ওদিক দেখছিল। ওদের কাজটাই বোধহয় জিশানের সঙ্গে ছায়ার মতো লেগে থাকা।
আচমকা ওদের দিকে ডানহাত উঁচিয়ে কয়েকটা চুটকি দিল সুধা। মিষ্টি গলায় বলল, ‘আপনাদের এখন ল্যাবের বাইরে গিয়ে অপেক্ষা করার সময় এসে গেছে। দিস ইজ দ্য রুল অফ মাই ল্যাব।’
তিনজনের মধ্যে দুজন তক্ষুনি ল্যাবের দরজার দিকে রওনা হওয়ার ঝোঁক নিল, কিন্তু একজন একটু ইতস্তত করতে লাগল।
সেই লোকটা আমতা-আমতা করে বলল, ‘আমাদের বস বলেছেন জিশান পাল চৌধুরীর সঙ্গে-সঙ্গে থাকতে। ওকে এক মুহূর্তের জন্যেও ছেড়ে না যেতে…।’
সুধাসুন্দরী ঠান্ডা গলায় বলল, ‘কে তোমার বস জানি না, তবে হি ইজ ইয়োর বস আউটসাইড মাই ল্যাব। অ্যান্ড সো অল হিজ অর্ডারস সিম্পলি স্টপ আউটসাইড মাই ড্যাম ল্যাব ডোর। নিউ সিটির সবার সব অর্ডার আমার ল্যাবের দরজা পর্যন্ত এসে থেমে যায়—ভেতরে ঢুকতে পারে না…।’
কথা বলতে-বলতে সুধা কম্পিউটার-টেবিলের ওপর থেকে একটা সেল ফোন তুলে নিল। তাতে অটো ডায়াল করে ও-প্রান্তের কথা শুরু হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।
জিশান লক্ষ করল সুধার কপালে ভাঁজ, আয়ত চোখে বিরক্তি।
প্রতিবাদী লোকটা তখনও বলছিল, ‘ডক্টর, প্লিজ, ভুল বুঝবেন না। আমাদের জিশানের সঙ্গে-সঙ্গে থাকার জন্যে স্ট্রং ইনস্ট্রাকশন দেওয়া হয়েছে। আমরা…।’
‘মার্শাল স্যার, সুধাসুন্দরী বলছি। ফ্রিডম কন্ট্রোল ল্যাব থেকে—।’
জিশান অবাক হয়ে গেল। সুধা সরাসরি শ্রীধর পাট্টার সঙ্গে ফোনে কথা বলছে! ওর হাত এত লম্বা যে, শ্রীধরকে এককথায় ফোন করতে পারে?
শ্রীধরের গলা শোনা গেল, ‘ইয়েস, সুধা। বলো তোমার জন্যে কী করতে পারি।’
শ্রীধরের কথা শুনতে পাওয়ামাত্রই জিশান বুঝল ঘরের সবাইকে ও-প্রান্তের কথা শোনানোর জন্য সুধা ওর মোবাইল ফোনের স্পিকার অন করে দিয়েছে।
‘আমি এখন জিশান পাল চৌধুরীর ওপরে ”গ্রিন টেস্ট” শুরু করতে চলেছি। এসব টেস্ট কিংবা অপারেশানের সময়—আপনি তো জানেন—আমি আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট দুজন ছাড়া আর কোনও লোকের প্রেজেন্স পছন্দ করি না। কিন্তু এখানে একজন রয়েছে—জিশানের এসকর্ট—সে বলছে কোনও অবস্থাতেই জিশানকে ছেড়ে যাবে না। ওর ওপরে নাকি অর্ডার আছে—’ সুধা ফোনে কথা বলছিল আর এসকর্ট তিনজনের দিকে বারবার তাকাচ্ছিল। মাঝে-মাঝে জিশানের দিকেও। ওদের একজন জিশানের চেয়ারের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে, আর বাকি দুজন ল্যাবের দরজার কাছে—অনেকটা ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে।
একটু থেমে সুধাসুন্দরী বলল, ‘আপনি আমাকে দশ সেকেন্ডের মধ্যে ডিসিশান দেবেন, স্যার। না হলে আমি ইলেভেনথ সেকেন্ডে আমার রেজিগনেশান আপনাকে ই-মেলে সাবমিট করে দেব। বিকজ আমার ল্যাবে সায়েন্স ছাড়া আর কারও হুকুমে আমি চলি না।’
জিশান শুধু অবাক নয়, একেবারে হতভম্ব হয়ে গেল। ও স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি শ্রীধর পাট্টার সঙ্গে এইভাবে কথা বলা যায়।
ও একদৃষ্টে বিজ্ঞানী মেয়েটাকে দেখছিল।
শ্রীধর পাট্টার শান্ত গলা শোনা গেল : ‘সুধা, তুমি ফোনটা প্লিজ ওই এসকর্টকে দাও—।’
সুধা জিশানের চেয়ারটাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেল। প্রতিবাদী কর্মনিষ্ঠ এসকর্টটির হাতে নিজের ফোনটা তুলে দিল—কিন্তু একটাও কথা বলল না।
লোকটা ফোনটা কানে দিয়ে ‘হ্যালো’ বলতেই ওপাশ থেকে শ্রীধরের শান্ত গলা শোনা গেল : ‘তোমার নামটা কি জানতে পারি?’
লোকটার মুখ অনেকক্ষণ আগেই ফ্যাকাসে হতে শুরু করেছিল, এখন সেটা প্রায় ব্লটিং পেপারের কাছাকাছি। আর ওর শুকনো মুখে ভয়ের সিলমোহর।
কাঁপা গলায় ও বলল, ‘আ-আমার নাম বি-বিকাশ সাহা, স্যার।’
‘চমৎকার।’ বললেন শ্রীধর, ‘বিকাশ সাহা, তুমি এই মুহূর্তে ডক্টরের হাতে সেল ফোনটা ফেরত দিয়ে ল্যাব থেকে তোমার সাঙ্গপাঙ্গ কাচিয়ে নিয়ে বেরিয়ে যাও—।’
‘ও.কে., স্যার। ইয়েস, স্যার।’ বিকাশের গলা এবং শরীর কাঁপছে।
‘যদি ঘর থেকে বেরোতে তোমার পাঁচ সেকেন্ডের বেশি সময় লাগে তা হলে আমি তোমার সুইচ পার্মানেন্টলি অফ করে দেব।’
‘খট’ করে লাইন কেটে দেওয়ার শব্দ হল। বিকাশ কাঁপা হাতে ফোনটা সুধাকে ফেরত দিল। এবং প্রায় আলোর গতিতে ল্যাব থেকে বেরিয়ে গেল।
ওর দুজন সাথী ওর আগেই ল্যাবের বাইরে চলে গেছে।
সুধাসুন্দরী ওর মোবাইল ফোনটা অফ করে কম্পিউটার-টেবিলে রেখে দিল। তারপর যেন কিছুই হয়নি এমন মুখের ভাব করে জিশানের চেয়ারের পাশে এসে দাঁড়াল। বলল, ‘জিশান, প্রথমে তোমার ”গ্রিন টেস্ট” হবে। সেই টেস্টের রেজাল্ট পজিটিভ হলে তবেই ম্যাজিক শট—মানে, ম্যাজিক ইনজেকশান…।’
জিশান একটা হাত তুলে বলল, ‘আরে দাঁড়ান, দাঁড়ান—আগে আপনাকে কনগ্র্যাটস জানাই—তারপর ওসব টেস্ট-ফেস্ট হবে।’
‘কেন?’ সুধার ফরসা কপালে ভাঁজ পড়ল।
‘যেভাবে আপনি মার্শালের সঙ্গে কথা বললেন…ওই ফোর্স, ওই কনফিডেন্স…ভাবা যায় না। না:, ডক্টর, আপনাকে সেলাম জানাই।’
জিশানের ভেতরে-ভেতরে একটা সত্যিকারের ঢেউ উথালপাথাল করছিল। আনন্দের ঢেউ। নিউ সিটিতে এরকম দৃপ্ত সাহসী মানুষ আর ক’জন আছে কে জানে!
সুধা জিশানের চোখে চোখ রেখে তাকাল। কিছুক্ষণ পর বলল, ‘জিশান, দুটো কথা। এক, তুমি আমার সঙ্গে ”আপনি-আপনি” করে কথা বলবে না। ”তুমি”-টা ”আপনি”-র চেয়ে অনেক বেটার, অনেক সুন্দর।’ সুধা এবার আঙুল তুলে ইশারায় দুই দেখাল : ‘আর দু-নম্বর কথা হল, ওই ফোর্স, কনফিডেন্স এটসেটরা…। আমি এখানে চাকরি করি, জিশান—কিন্তু তাই বলে এঁদের চাকর নই। আমি শুধু বিজ্ঞানের চাকর—আর কারও নয়।’
