প্রযুক্তির এই অভিনব ‘ম্যাজিক’গুলো শেষ পর্যন্ত মানুষের ভালোর জন্য ব্যবহার করা হলে কত ভালো হত!
জিশানের বুকে ছোট্ট অথচ তীব্র একটা ব্যথা চিনচিন করে উঠল।
ঢোকামাত্রই জিশানকে ল্যাবের টিম টেকওভার করল।
ওকে প্রথমে পাঠানো হল স্টেরিলাইজিং স্ক্যানারের মধ্যে দিয়ে। তারপর কাচের গোলকধাঁধার ভেতরে এ-পথ সে-পথ দিয়ে হেঁটে অনেক ঘোরপ্যাঁচের পর ওকে তারা নিয়ে গেল একটা ল্যাবে।
ল্যাবের দরজায় লাগানো এল. সি. ডি. প্যানেলে লেখা ‘ফ্রিডম কন্ট্রোল ল্যাব’।
দরজা দিয়ে ঢুকেই বিশাল বড় মাপের একটা কাচের ঘর। ঘরের ডানদিকের দেওয়ালে একটা সুন্দর মসৃণ কন্ট্রোল প্যানেল। তার ওপরে বেশ কয়েকটা সি. আর. টি. স্ক্রিন আর ডিজিটাল মিটার লাগানো। তাতে নানান গ্রাফ আর সংখ্যা নাচানাচি করছে।
প্যানেল থেকে হাত তিনেক দূরে একটা লম্বা টেবিলে তিনটে লার্জ স্ক্রিন আর্ক কম্পিউটার। সেগুলোর সামনে বসে দুজন অপারেটর।
বাঁ-দিকে একটা ছোট কন্ট্রোল প্যানেল আর তার সামনে একটা বড় মাপের অদ্ভুত চেয়ার।
অদ্ভুত এই কারণে যে, চেয়ারটা দেখতে অনেকটা ডেন্টিস্টের চেয়ারের মতো হলেও আসলে তার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি। চেয়ারটার হাতলের কাছে বেশ কিছু জটিল যন্ত্রপাতি। পায়ের কাছেও কতরকম কনট্র্যাপশন আর অ্যাটাচমেন্ট।
সব দেখেশুনে জিশানের মনে হল, চেয়ারটা যেন কোনও ধর্মীয় পবিত্র বস্তু, কোনও ‘জাগ্রত’ দেবতার সিংহাসন—আর নানান মানুষ তাদের মনস্কামনা পূর্ণ হওয়ার আশায় ঢিলের বদলে নানান যন্ত্রপাতির টুকরো চেয়ারটার গায়ে বেঁধে দিয়ে গেছে।
চেয়ারের ঠিক পাশটিতে কাঠ-কাঠ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিল একজন ভীষণ রোগা তরুণী। পরনে হলুদ চুড়িদার, তার ওপরে বাদামি রঙের লেস দিয়ে বোনা একঝাঁক গোলাপ। গলায় একটা হলুদ ওড়না সাপের মতো প্যাঁচানো।
জিশান মেয়েটিকে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। বয়েস কত হবে? খুব বেশি হলে পঁয়ত্রিশ কি ছত্রিশ। ওর রিমিয়ার কথা মনে পড়ে গেল।
মেয়েটির রং কেমন যেন ফ্যাকাসে ধরনের ফরসা। বেশ রোগা হলেও লম্বা। ছোট্ট মুখ—অনেকটা পুতুলের মতো। চোখ দুটো অস্বাভাবিক বড়। প্রজাপতির কোমল ডানার মতো নাকের দুপাশে মেলে আছে।
রিমিয়া খুব স্বপ্ন দেখত। আর এই মেয়ের চোখ দুটো স্বপ্নের মতো—এবং স্বপ্ন দেখানোর মতো।
ওর গলায় বাদামি ক্রিস্টালের একটা মালা। চোখের জলের মতো চিকচিক করছে। আর বাঁ-হাতের অনামিকায় একটা চিকন আংটি।
মেয়েটি এত চুপচাপ স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে যে, জিশান ওকে প্রায় পুতুল বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল। ঠিক তখনই মেয়েটি জিগ্যেস করল, ‘তুমি জিশান তো?’
প্রশ্নের সপ্রতিভ ঢঙে জিশান অবাক হয়ে গেল। বহুদিনের চেনা মানুষ এইভাবে প্রশ্ন করে। ওর একটু অস্বস্তি হল, কারণ, ল্যাব টিমের তিনজন মানুষ ঠিক এই মুহূর্তে জিশানের পিছনে সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে। আর কম্পিউটারের সামনে দুজন।
জিশান সহজভাবে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করল, ‘হ্যাঁ, আমি জিশান—।’
‘আমি ডক্টর সুধাসুন্দরী…না, না, হেসো না—’ হাত তুলে ইশারা করল মেয়েটি : ‘আমি জানি আমি সুন্দরী নই, কিন্তু কী করব, এটা আমার সত্যিকারের নাম…বাবা-মা দিয়েছিল।’
জিশান বেশ অপ্রস্তুত হয়ে গেল। মেয়েটি যে সুন্দরী নয় সেটা ওকে কে বলল? জিশানের তো পুতুলটিকে যথেষ্ট সুন্দর বলে মনে হচ্ছিল।
একে তো নামটা বেশ অদ্ভুত, পুরোনো-পুরোনো। তার ওপর অজানা অচেনা লোকের সঙ্গে কী আজব আন্তরিক কথাবার্তার ঢং! নিউ সিটিতে এটা নতুন।
‘শোনো, জিশান—এখন যে-কাজটা আমি করব সেটা আমার খুব অপছন্দের। কিন্তু করতে হবে—’ ঠোঁট ওলটাল : ‘কাজ তো কাজ!’
জিশান ওর পিছনে রোবটের মতো দাঁড়িয়ে থাকা তিনজনের দিকে একবার তাকাল। ‘রিমোট অপারেশানস’ ল্যাবে ঢোকা ইস্তক এই তিনজন ওর সঙ্গে ছায়ার মতো জুড়ে গেছে।
দু-এক সেকেন্ডের দ্বিধা কাটিয়ে জিশান জিগ্যেস করে ফেলল, ‘কী কাজ?’
হাসল সুধাসুন্দরী : ‘তোমাকে ম্যাজিক শট দেওয়ার কাজ।’
‘ম্যাজিক শট?’ কপালে উঠল জিশানের ভুরু।
‘হ্যাঁ—স্পেশাল ইনজেকশান।’
কথা বলতে-বলতে সুধা ডানদিকের কন্ট্রোল প্যানেলটার কাছে চলে গিয়েছিল। ব্যস্তভাবে কয়েকটা বোতাম টিপল। দুটো মিটারের রিডিং খুঁটিয়ে দেখল। তারপর জিশানের দিকে ফিরে তাকিয়ে হাতে হাত ঘষল।
‘ও.কে., জিশান, আই অ্যাম রেডি। আই হোপ য়ু আর—।’
জিশান লক্ষ করল ওর ইংরেজি কথা বলার ঢং অনেকটা যেন সাহেবি ধাঁচের। ছোট্ট করে বলল, ‘আপনি রেডি হলেই আমি রেডি।’
‘চমৎকার। তা হলে ওই চেয়ারটায় শুয়ে পড়ো—।’
জিশান ল্যাবের চারপাশে তাকাল। তাকিয়েই অবাক হল। কখন যেন চারটে দেওয়ালের কাচ ঘোলাটে হয়ে গেছে। আর তার সঙ্গে-সঙ্গে ল্যাবের যে-উজ্জ্বল আলোগুলো এতক্ষণ তীব্র কর্কশ মনে হচ্ছিল সেগুলো যেন অনেকটা মোলায়েম হয়ে গেছে।
আরও কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বিশাল চেয়ারটার কাছে চলে গেল জিশান। ওটাতে বসে পড়ল, নাকি শুয়ে পড়ল? উঁহু, ব্যাপারটা বসা এবং শোয়ার ঠিক মাঝামাঝি দাঁড়াল।
‘গুড বয়।’ সুধাসুন্দরী ওর কাছে এগিয়ে এল : ‘অ্যান্ড স্টে কুল লাইক আ গুড বয়।’
জিশান চেয়ারে শুয়ে সুধাকে দেখছিল।
ওই রোগা ফরসা পুতুল-পুতুল মেয়েটার ‘পুতুল-পুতুল’ ব্যাপারটা স্রেফ ওপরের চেহারাতেই শেষ। ওর ভেতরে রয়েছে দক্ষতা আর আত্মবিশ্বাসে ঠাসা একজন ডক্টর।
