প্রৌঢ় দুজন হেসে সায় দিয়ে মাথা নাড়লেন।
জিশান একটু ধন্দে পড়ে গেল। কন্ট্রোলড ফ্রিডম জিনিসটা আবার কী?
শ্রীধর প্রৌঢ় দুজনের দিকে হাতের ইশারা করে বললেন, ‘এরা হলেন আমাদের টেকনিক্যাল কমিটির চিফ আর আর্মামেন্ট ডিপার্টমেন্টের হেড। কন্ট্রোলড ফ্রিডমের বুদ্ধিটা ওঁরাই বের করেছেন। দারুণ বুদ্ধি, তাই না, জিশান? সারাটা দিন তুমি স্বাধীনভাবে খুশি মতো ঘুরে বেড়াবে, আর সময় হলেই নিজে-নিজে ফিরে আসবে, গুটিগুটি ঢুকে পড়বে খাঁচায়…।’
কথা শেষ করে হেসে উঠলেন শ্রীধর।
কীভাবে এটা সম্ভব? জিশান চিন্তার গোলকধাঁধায় ঘুরতে লাগল।
ঠিক তখনই ফ্যান টেইলড লাভ-বার্ডগুলো জোরে-জোরে ডেকে উঠল।
জিশান ভাবল, ওর জন্য হয়তো নতুন ধরনের কোনও ফোর্স ফিল্ডের ব্যবস্থা করেছেন শ্রীধর। ওই পাখিগুলোর মতো।
কিন্তু সেটা কী?
•
জিশান মনে-মনে কন্ট্রোলড ফ্রিডমের গূঢ় অর্থটা বুঝতে চেষ্টা করছিল, কিন্তু রহস্যটা ভেদ করতে না পেরে তিনজন মানুষের মুখের দিকে বারবার তাকাচ্ছিল। ওঁদের হাবভাব আর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখে রহস্যের সমাধানটা আঁচ করার নি:শব্দ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিল।
জিশানের মুখে একটা অসহায় বোকা-বোকা ভাব ফুটে উঠেছিল। শ্রীধর পাট্টার দিকে তাকিয়ে ও বুঝল শ্রীধর সেটা বেশ রসিয়ে উপভোগ করছেন।
জিশান আর ভাবতে পারছিল না। হাল ছেড়ে দিয়ে মাথা নীচু করল। অপেক্ষা করতে লাগল।
একটু পরেই শ্রীধরের কথা শুনতে পেল ও।
‘আমিই জিশানকে ব্যাপারটা খুলে বলছি। যদি টেকনিক্যাল কোনও পয়েন্ট আমি মিস করি তা হলে সেটা আপনারা—প্লিজ—জুড়ে দেবেন…।’
জিশান মুখ তুলল।
শ্রীধর সরাসরি ওর দিকে তাকালেন। ঠোঁটে একচিলতে হাসির ছোঁয়া। ওঁর ঠিক পিছনেই বিশাল জানলা। ফটোক্রোমিক ন্যানোপলিমার প্লেট লাগানো। এই প্লেটের প্রতিসরাঙ্ক বাতাসের প্রতিসরাঙ্কের ভীষণ কাছাকাছি। ফলে প্লেটটা লাগানো আছে কি নেই সেটা ঠিক বোঝা যায় না।
জানলা দিয়ে আকাশ দেখা যাচ্ছে। ভোরের নীল আকাশ। তার সঙ্গে হাইরাইজ কয়েকটা বাড়ির জ্যামিতি।
আকাশে খেয়ালি মুডে ভেসে বেড়ানো বাচ্চা-বাচ্চা মেঘ। আর কখনও-কখনও তাদের চিরে দিয়ে ছুটে যাচ্ছে ব্যস্ত শুটার।
ঝরনার জলের কলকল শব্দ কানে আসছিল, আর লাভ-বার্ডগুলোর কিচকিচ। এ ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই।
বেশ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকার পর শ্রীধর মুখ খুললেন।
‘জিশান, আজ রাতে তোমাকে আর্মামেন্ট ডিপার্টমেন্টের ”রিমোট অপারেশানস” ল্যাবে নিয়ে যাওয়া হবে। তোমার ওপরে প্রথমে ”গ্রিন টেস্ট” করা হবে। যার পারপাস হল, তোমার শরীরের সুটেবিলিটি পরীক্ষা করা যে, তুমি কন্ট্রোলড ফ্রিডম প্রাোগ্রামটা নিতে পারবে কি না।’
‘ ”গ্রিন টেস্ট”-এ কোয়ালিফাই করে গেলে তারপর আসল অপারেশান। একটা পলিমার কোটেড সিলভার ক্যাপসুল…।’
শ্রীধর হঠাৎই থমকে গেলেন। চওড়া করে হেসে বললেন, ‘না:, থাক—আর কিছু বলব না। য়ু ফাইন্ড আউট ইয়োরসেলফ।’ সামনে ঝুঁকে এলেন : ‘তুমি জানো, জিশান, লাইফ কেন এত ইন্টারেস্টিং?’
জিশান চুপ করে রইল। পাশের প্রৌঢ় দুজনও চুপচাপ। তবে একজনের চোয়াল নড়ছে। তিনি কিছু একটা চিবোচ্ছেন।
শ্রীধর টেবিলে আঙুলের টোকা মারলেন। ভুরু উঁচিয়ে জিশানের চোখে চোখ রেখে বললেন, ‘জিশান, লাইফ ইজ ইন্টারেস্টিং বিকজ…বিকজ ইট ইজ ফুল অফ সারপ্রাইজেস। আমাদের জীবনে অনেক লুকোনো চমক থাকে যেগুলো আমাদের বাঁচার আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়। তুমি আমাদের চেয়ে অনেক লাকি, কারণ, তোমার লাইফে চমকের সংখ্যা অনেক বেশি—অন্তত তুমি নিউ সিটিতে আমাদের হাতে এসে পড়ার পর। আমি এই একটা চমক তোমার জন্যে বাঁচিয়ে রাখলাম। আজ রাতে…দশটার সময়…তুমি যখন ”রিমোট অপারেশানস” ল্যাবে যাবে তখনই জানতে পারবে, ”কন্ট্রোলড ফ্রিডম”-এর রহস্য। সো, য়ু মে লিভ নাউ। তোমার এখন ছুটি…।’
শ্রীধর আচমকা ছিলে ছেঁড়া ধনুকের মতো সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। মিটিং শেষের ইঙ্গিত।
জিশানও উঠে দাঁড়াল। একইসঙ্গে প্রৌঢ় দুজনও।
শ্রীধর জিশানের দিকে আঙুল দেখিয়ে প্রৌঢ় দুজনকে বললেন, ‘তা হলে রাত দশটায় জিশান আপনাদের চার্জে যাচ্ছে…।’
দুজনের মধ্যে একজন প্রৌঢ় বললেন, ‘কোনও চিন্তা করবেন না, স্যার—আমরা তৈরি আছি।’
শ্রীধর ছোট্ট করে হাসলেন। এই নিউ সিটিতে সবসময় তৈরি থাকাটাই দস্তুর।
•
চারজন সিকিওরিটি গার্ড জিশানকে ‘রিমোট অপারেশানস’ ল্যাবে পৌঁছে দিল।
হাতঘড়ির দিকে তাকাল জিশান। কাঁটায়-কাঁটায় সওয়া দশটা।
দরজার সামনে দাঁড়িয়েই গোটা ল্যাবটা প্রায় দেখা যাচ্ছিল। তার কারণ, চারদিকে শুধু কাচ আর কাচ। দরজা থেকে শুরু করে ল্যাবের সব দেওয়ালই কাচের। তার কোথাও-কোথাও স্টেইনলেস স্টিলের ফিটিংস আর কোথাও বা রঙিন পলিমার।
প্রায় ঘণ্টাখানেক আগে আর্মামেন্ট ডিপার্টমেন্টের হেড জিশানের সঙ্গে ইন্টারঅ্যাকটিভ টারমিনালে কথা বলেছেন। ‘রিমোট অপারেশানস’ ল্যাবের নানান টেস্ট আর ল্যাবের কাজকর্ম নিয়ে জিশানকে একটা ওপর-ওপর ব্রিফিং দিয়েছেন।
ওঁর কাছ থেকেই জিশান জেনেছে, এই ল্যাবের বিভিন্ন সাব-ল্যাবের চার্জে যাঁরা-যাঁরা আছেন তাঁরা ইচ্ছেমতো নিজের-নিজের অংশের কাচের দেওয়ালগুলোকে স্বচ্ছ কিংবা অস্বচ্ছ করতে পারেন। অর্থাৎ একটা স্বচ্ছ কাচকে অস্বচ্ছ করতে চাইলে ন্যানোঅপটিকস প্রযুক্তির জোরে চোখের পলকে সেই কাচটাকে সুপার-পোলারাইজড করে দেওয়া হয়। ব্যস, কাজ শেষ।
