তারপর : ‘জিশান, এবারে কাজের কথায় আসি। আমাদের কোর কমিটির মিটিং-এ কিল গেমের তারিখ মোটামুটিভাবে ঠিক হয়েছে সেকেন্ড সেপ্টেম্বর, রবিবার।’
জিশানের শরীরের ভেতরে বরফ-জলের স্রোত বয়ে গেল। অথচ এই স্রোতটা বয়ে যাওয়ার কথা ছিল না। যেহেতু গত তিনমাস ধরে সবই ওর জানা।
জিশান অবাক হল। ‘ফাঁসি’ হবে এটা নিশ্চিতভাবে জানা থাকা সত্বেও ‘ফাঁসি’র তারিখটা শুনলে এরকম হয়? ড্যাশ, কমা, কোলন, সেমিকোলন যতই থাক না কেন ফুল স্টপের ওজনই আলাদা। কিল গেমের এই তারিখটা যেন সেই ফুল স্টপ।
জিশানের মাথাটা কেমন ঘুরে গেল। চোখের সামনে শ্রীধর পাট্টার ছবিটা ঝাপসা হয়ে গেল। বরফ-জলের হিমশীতল স্রোতটা এখন শিরদাঁড়া বেয়ে নামছে।
সেকেন্ড সেপ্টেম্বর। ফুল স্টপ।
‘…দিনটা মোটামুটিভাবে ঠিক হয়েছে। এখনও হান্ড্রেড পার্সেন্ট ফাইনাল হয়নি।’ শ্রীধর তখনও কথা বলছিলেন।
জিশান বুঝতে পারছিল, শ্রীধরের কিছু কথা ও মিস করেছে—যেহেতু ওর মাথা ঠিকঠাক কাজ করছে না।
‘…তবে দু-তারিখটায় যদি কোনও প্রবলেম হয় তা হলে আমরা নাইনথ সেপ্টেম্বরে শিফট করব। কারণ, দিনটা রোববার হওয়াটা খুব জরুরি। বুঝতেই পারছ—আমাদের অসংখ্য ভিউয়ার্স দরকার। তা ছাড়া স্পনসরদের কোটি-কোটি টাকার ব্যাপার। আর তুমি যদি জিতে যাও—’ হাসলেন শ্রীধর : ‘তা হলে একশো কোটি টাকার প্রাইজ মানি তো আছেই!’
জিশান সম্মোহিতের মতো চুপচাপ বসে ছিল। শ্রীধরের কথা শুনছিল। কিন্তু ও এখনও বুঝে উঠতে পারছিল না শ্রীধর পাট্টা কেন ওকে সাতসকালে ওঁর অফিসে ডেকে পাঠিয়েছেন। তাই ও অপেক্ষা করছিল।
‘জিশান—’ চেয়ারে একটু নড়েচড়ে বসলেন শ্রীধর : ‘আমরা এবার কিল গেমের প্রাোমোশনাল পাবলিসিটি শুরু করতে চাই। তুমি হয়তো টিভিতে দেখেছ তোমার কিছু-কিছু ভিডিয়ো ক্লিপিংস আমরা নানারকম প্রাোডাক্টের অ্যাডে ব্যবহার করছি। কিন্তু এবার আমরা ফুল সুইং-এ ক্যাম্পেন শুরু করতে চাইছি। অর্থাৎ, বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে তোমাকে আমরা ব্যবহার করব—অবশ্য তার জন্যে তুমি পয়সা পাবে। এ ছাড়া কিল গেমের পাবলিসিটিতেও তোমাকে ভাগ নিতে হবে।
‘তুমি হয়তো জানো না, আমাদের কিল গেমের যে-লাইভ টেলিকাস্ট আমরা করি তার ভিউয়ার্সের সংখ্যা বিলিয়নস-এ হিসেব করতে হয়। টিভি আর ইন্টারনেটের মাধ্যমে এই এক্সাইটিং গেম একেবারে জ্যান্ত হয়ে ঢুকে পড়ে সবার ঘরে। সুতরাং, তুমি রাতারাতি একটা ইন্টারন্যাশনাল ফিগার হয়ে যাবে। একবার ভাবো তো! কোথায় তুমি ওল্ড সিটিতে একটা কেন্নোর মতো ধুঁকে মরছিলে…সেখান থেকে একেবারে ইন্টারন্যাশনাল সেলিব্রিটি! তুমি ভাবতেই পারছ না..।’
শ্রীধরের কথা শেষ হওয়ার আগেই জিশান চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল : ‘যদি আপনার আর কোনও কাজের কথা না থাকে তা হলে আমি এবার যাব—।’
শ্রীধর পাট্টা ভুরু উঁচিয়ে সামান্য কৌতুকের চোখে জিশানের দিকে তাকালেন। তারিফের গলায় বললেন, ‘দিস ইজ হোয়াট আই লাইক অ্যাবাউট য়ু। জোশ। তেজ। অথচ কুল ব্রেইন। এই ফ্যাকালটিগুলো তোমাকে নানান গেমে জিততে হেলপ করেছে—’ চেয়ারে হেলান দিয়ে শরীরটাকে দোলাতে লাগলেন : ‘বোসো, বাবু জিশান। শোনো আমার প্ল্যান…।’ এবার হাত দিয়ে জিশানকে বসতে ইশারা করলেন : ‘বোসো, বোসো…।’
জিশান বসে পড়ল আবার। তবে ওর মুখের বিরক্ত ভাবটা গোপন রইল না।
‘কেন তোমাকে এত কথা বলছি শোনো—’ ছোট বাচ্চাকে বোঝানোর মতো করে বলতে শুরু করলেন শ্রীধর, ‘কিল গেমের মোটামুটিভাবে একমাস আটদিন বাকি। এই সময়টা আমরা ইনটেনসিভ প্রাোমোশনাল ক্যাম্পেন করতে চাই। আমরা ফুল সুইং-এ যে-ক্যাম্পেন শুরু করতে চলেছি তাতে সবসময় তোমাকে দরকার হবে। ফলে তোমাকে নিউ সিটির হরেক জায়গায় নানান প্রাোগ্রামে যেতে হবে। তোমার ওপরে নজরদারির জন্য সর্বক্ষণ দু-চারজন গার্ডকে মোতায়েন রাখাটা আনইকনমিক এবং ইরিটেটিং। তা ছাড়া ব্যাপারটা নিউ সিটির সিটিজেনদের চোখে ভালোও ঠেকবে না। বরং তুমি যদি স্বাধীনভাবে সব জায়গায় যেতে পারো, সব প্রাোগ্রাম, অ্যাড ক্যাম্পেন অ্যাটেন্ড করতে পারো সেটা অনেক বেটার। মানুষ দেখবে স্বাধীন জিশান পালচৌধুরী নিউ সিটির যত্রতত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে। দ্যাট উইল বি গ্রেট, তাই না?’
জিশানের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য ওর দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে রইলেন শ্রীধর পাট্টা।
য়ুনিফর্ম পরা একজন লোক ট্রলি নিয়ে ঢুকল ঘরে। স্বচ্ছ কাপ-প্লেটে রাখা কফি আর কুকিজ সাজিয়ে দিল চারজনের সামনে। শ্রীধর ইশারায় সবাইকে কফি নিতে অনুরোধ করলেন। ওরা কাপে চুমুক দিতে শুরু করল।
কফির স্বাদটা তেতো লাগল জিশানের। ও একটা কুকিজ তুলে নিয়ে কামড় বসাল।
স্বাধীনতা? এই নামের কোনও বস্তু হয় নাকি শ্রীধর পাট্টার রাজত্বে?
জিশান নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। ও দেখল, ওর পাশে বসা প্রৌঢ় দুজন অল্প-অল্প হাসছেন, শ্রীধরের কথায় সায় দিয়ে মাথা নাড়ছেন।
‘হ্যাঁ, জিশান, তোমাকে আমি ফ্রিডম দেব…’ আবার কথা বলতে শুরু করলেন শ্রীধর, ‘তবে অ্যাবসলিউট ফ্রিডম নয়—কন্ট্রোলড ফ্রিডম। মানে, তুমি স্বাধীনভাবে যতই ঘোরাফেরা করো না কেন একটা প্রিঅ্যাসাইনড টাইমে তোমাকে জিপিসির গেস্টহাউসে ফিরে আসতেই হবে। রোজ। আর তুমি ফিরে আসবে নিজে-নিজে—কাউকে ধরে-বেঁধে নিয়ে আসতে হবে না। যেভাবে শুয়োর নিজে থেকে খোঁয়াড়ে ফিরে আসে। কী, তাই তো?’ শেষের প্রশ্নটা করলেন প্রৌঢ় দুজনের দিকে তাকিয়ে।
