অফিসঘরে জিশানকে ঢুকিয়ে দিয়ে পিস ফোর্সের ‘বোবা’ গার্ডরা চলে গেল। আর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিসে পা দিয়েই জিশান বিমূর্ত সৌন্দর্যের ধাক্কা খেল।
এত সুন্দর করেও একটা অফিসঘর সাজানো যেতে পারে!
ও হতবাক হয়ে ঐশ্বর্যময় অফিসঘরটাকে দেখছিল। ঘরের ডানপাশে একটা ফুলের বাগান। ফুটপাঁচেক চওড়া—গোল রিং-এর মতো। একটা স্বচ্ছ স্ফটিকের স্তম্ভকে ঘিরে খুব ধীরে ধীরে চক্রের মতো ঘুরছে।
বাগানে ছোট-ছোট ফুলের গাছ—তাতে রঙিন ফুল। এরকম সুন্দর প্রজাপতির মতো ফুল জিশান জীবনে দেখেনি।
বাগানের ঠিক ওপরে উড়ে বেড়াচ্ছে কয়েকটা ফ্যান টেইলড লাভ-বার্ড। অন্তত জিশানের দেখে তাই মনে হল।
পাখিগুলো কিচকিচ করে ডাকাডাকি করছে, বাগানের ওপরে একটা নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে উড়ছে—এখানে-ওখানে বসছে, কিন্তু কোনও অদৃশ্য মন্ত্রবলে যেদিকে-সেদিকে উড়ে চলে যাচ্ছে না।
এমনটা ভাবার কারণ, কোনও জাল কিংবা খাঁচাজাতীয় বস্তু জিশানের চোখে পড়ছে না।
বাগানের উলটোদিকের দেওয়ালে ঝরনার জল গড়িয়ে-গড়িয়ে পড়ছে। আলো পড়ে চিকচিক করছে। তার সঙ্গে জলের মৃদু কলকল শব্দ। এই ঝরনাকে পটভূমিতে রেখে অদ্ভুত স্টাইলে সাজানো রয়েছে আটটা বড় মাপের টিভির পরদা। তাতে নিউ সিটির কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ এলাকা দেখা যাচ্ছে।
ঘরের সিলিংটা অনেকটা ওলটানো কড়াইয়ের মতো। তাতে নীল আর সাদা ধোঁয়ার ছায়া আকাশের আভাস তৈরি করেছে। তার মধ্যে ছোট-ছোট হলদে আলোর ফুটকি জ্বলজ্বল করছে। যেন অসংখ্য তারা ঘরের আলোর জোগান দিচ্ছে।
ঘরের সমস্ত আসবাবপত্র স্বচ্ছ পলিমারের তৈরি। তার মধ্যে হালকা নীলরঙের আভা জ্যান্ত সাপের মতো নড়েচড়ে বেড়াচ্ছে।
এরকমই একটা বিশাল টেবিলের ওপারে পাথরের মূর্তির মতো বসে রয়েছেন শ্রীধর পাট্টা। ওঁর উলটোদিকে ছ’টা চেয়ার। তার মধ্যে চারটে চেয়ার খালি—ডান-দিকের শেষ দুটো চেয়ারে বসে রয়েছেন দুজন হোমরাচোমরা বয়স্ক মানুষ। ওঁদের ফিটফাট পোশাক আর বয়স্ক চেহারা দেখেই জিশান ওদের হোমরাচোমরা বলে আন্দাজ করেছে।
.
১৪.
দুজনেরই মাথায় টাক। চোখে চশমা। চর্বি ঠাসা গাল ঝুলে পড়েছে। মুখের চামড়ায় অনেক ভাঁজ।
শ্রীধরের টেবিলের সব জিনিস বেশ সুন্দর করে সাজানো। পেন, স্যাটেলাইট ফোন, রাইটিং প্যাড, মিনারেল ওয়াটারের সিপার ইত্যাদি এমনভাব সাজানো যেন কেউ ওগুলো বিক্রির জন্য দোকান সাজিয়ে বসেছে।
টেবিলের ডানদিকে একটা আর্ক কম্পিউটার মনিটর। তার কিবোর্ডের ওপরে শ্রীধরের ডানহাতের আঙুল নড়ছিল। জিশানকে দেখে আঙুল থামল। শ্বেতপাথরের মুখে সামান্য হাসি ফুটল।
‘এসো, জিশান—এসো। বোসো—।’ শ্রীধর উষ্ণ আহ্বান জানালেন।
জিশান টেবিলের কাছে এগিয়ে গেল। বসে থাকা দুই প্রৌঢ়ের সঙ্গে একটা চেয়ারের তফাত রেখে বসে পড়ল।
বসে পড়ার পরেও জিশান লাভ-বার্ডগুলোর দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছিল। ওদের ওড়াউড়ি দেখছিল। আর অদৃশ্য খাঁচাটার রহস্য ভেদ করার চেষ্টা করছিল।
সেটা লক্ষ করে শ্রীধর বললেন, ‘ওগুলো ফ্যান টেইলড লাভ-বার্ড। জোড়ায়-জোড়ায় থাকে। ওদের জোড়ের একটা মারা গেলে অন্যটাও দু-চারদিনের মধ্যে দু:খে মারা যায়।’
জিশান একটু হাসল, মাথা নাড়ল : ‘জানি। আমি ওদের খাঁচাটা দেখার চেষ্টা করছি।’
শ্রীধর শব্দ করে হাসলেন। জিশানের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বললেন, ‘দেখতে পাবে না। কারণ, খাঁচাটা ইনভিজিবল। ওটা ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড দিয়ে তৈরি। পাখিগুলো একটা স্ফিরিক্যাল ফোর্স ফিল্ডের ক্যাভিটির মধ্যে আছে। এলাকার বাইরে গেলেই ওরা স্ট্রং ফিল্ডটা সেন্স করতে পারে। তখনই চট করে কমফোর্টেবল জোনে ফিরে আসে।’ স্বচ্ছ টেবিলে আঙুলের ডগা ঠুকলেন শ্রীধর : ‘এই অদৃশ্য খাঁচা আমাদের সায়েন্টিস্টদের আবিষ্কার। দারুণ, না?’
‘হুঁ, দারুণ—।’ জিশান বলল।
কিন্তু জিশানের কথা ছাপিয়ে দুই প্রৌঢ়ের সম্মিলিত গলা শোনা গেল, ‘একসিলেন্ট, স্যার, একসিলেন্ট। আপনার ইনভেন্টিভ পাওয়ার রিয়েলি একস্ট্রর্ডিনারি—।’
জিশান চাটুকার দুজনের দিকে একবার তাকাল।
জিশান না হয় এই অদ্ভুত খাঁচা প্রথম দেখছে, কিন্তু এঁরা নিশ্চয়ই ব্যাপারটা নতুন দেখছেন না! তা হলে এই চাটূক্তির মানে কী? ‘চাটুকার’ শব্দটা কী ‘চাটা’ থেকে তৈরি হয়েছে?
মনসুখ চক্রপাণি আর গণপত আচারিয়ার কথা মনে পড়ে গেল জিশানের। নিউ সিটির একনম্বর এবং দু-নম্বর সায়েন্টিস্ট। শ্রীধর পাট্টার পা চাটার ব্যাপারেও ওঁরা একনম্বর এবং দু-নম্বর।
এই প্রৌঢ় দুজন কি তা হলে তিননম্বর এবং চারনম্বর?
বাবার একটা কথা মনে পড়ে গেল জিশানের।
‘বিজ্ঞানীদের কেউ-কেউ শাসকদের পা চাটতে পারে—কিন্তু জেনে রাখিস জিশু, বিজ্ঞান কখনও কারও পা চাটে না—।’
জিশান পাশে বসে থাকা লোকদুটোর দিকে ঘৃণার চোখে তাকাল। তারপর শ্রীধর পাট্টার চোখে চোখ রেখে জিগ্যেস করল, ‘বলুন, আমাকে কেন ডেকেছেন?’
‘শরীর কেমন আছে?’ মোলায়েম গলায় পালটা প্রশ্ন করলেন শ্রীধর।
জিশান ভীষণ অবাক হল। ওর শরীরের খবর নিচ্ছেন শ্রীধর। ঠিকাদার যেমন মাটি-কাটা শ্রমিকের শরীরের খবর জানতে চায়, সেরকম? নতুন কী ‘মাটি-কাটা’র কাজ রয়েছে জিশানের জন্য?
‘ভালো।’ ছোট্ট উত্তর দিল জিশান।
‘গুড। একটু কফি খাও—।’ বলে স্যাটেলাইট ফোন তুলে নিয়ে কাকে যেন ফোন করলেন। চারজনের জন্য কফি আর কুকিজ চেয়ে পাঠালেন।
