হলোগ্রাম ফাইট যতই শেষের দিকে এগোতে লাগল চিৎকার আর উত্তেজনার মিটার ততই চড়তে লাগল। সিমান ভিড়ের চক্র থেকে বেশ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আহত নজরে লড়াই দেখছিল আর শরীরের কেটে-ছড়ে যাওয়া জায়গাগুলো মেরামত করার চেষ্টা করছিল। ওর বুকের ভেতরে ঢিপঢিপ করে শব্দ হচ্ছিল। কে জিতবে? রেড, না ব্লু? ওর বাজি ধরা আট হাজার টাকা শেষ পর্যন্ত…।
হলোগ্রাম ফাইট শেষ হতেই চিৎকারের ফোয়ারা ছুটল। তার সঙ্গে তীব্র শিসের আওয়াজ, পশু-পাখির নকল ডাক।
যারা বাজিতে জিতেছে তারা পাগলের মতো হাত তুলে লাফাতে লাগল। আর যারা হেরেছে তাদের চিৎকার, লম্ভঝম্প সব স্তিমিত হয়ে গেল।
রেড ফাইটার শুয়ে পড়েছে মেঝেতে। তাকে আর দেখা যাচ্ছে না। ব্লু ফাইটার বিজয়ীর ভঙ্গিতে হাত তুলে নাড়ছে, এরিনায় ঘুরে বেড়াচ্ছে।
সেদিকে তাকিয়েই সিমান ভেঙে পড়ল। কাঁদতে শুরু করল। তারপর ওই অবস্থাতেই বসে পড়ল নকল ঘাসের মেঝেতে।
আট হাজার টাকা গেল! এখন তো সম্বল বলতে কিছুই প্রায় নেই! কাল যখন নেশার টানে মনটা আকুলিবিকুলি করবে তখন কী করবে ও? ‘জয় রুম’-এর এন্ট্রি ফি কোথা থেকে পাবে? টাকা চেয়ে বাবার কাছ থেকে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। আর মা? মা তো ওর সঙ্গে নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া কোনও কথাই বলে না!
তা হলে?
আগামীকালের নেশার তেষ্টার কষ্টটা সিমান যেন এখন থেকেই টের পেতে শুরু করল। ওর গলা শুকিয়ে এল। বুকের মধ্যে কেমন একটা চাপ তৈরি হল। আর একইসঙ্গে দু-চোখে জলের ধারা বইতে লাগল।
কিছুক্ষণ একইভাবে বসে থাকার পর সিমান চোখ মুছল। নাক টানল কয়েকবার। তারপর ধীরে-ধীরে উঠে দাঁড়াল।
না, হাল ছাড়লে চলবে না। ওর কাছে সামান্য যা কিছু টাকা আছে সেটাকেই পুঁজি করে আগামীকালের সন্ধেটা শুরু করতে হবে। যদি ও কয়েকটা ছোট-ছোট বাজি জিততে পারে তা হলেই আর চিন্তা নেই।
কিন্তু ভাগ্য ওকে সাহায্য করবে তো? ও পারবে তো জিততে?
এসব কথা ভাবতে-ভাবতে ভাঙাচোরা সিমান ‘জয় রুম’ থেকে বেরিয়ে এল।
•
গেম পার্টিসিপ্যান্টস ক্যাম্পাসের জীবন জিশানের অসহ্যরকম একঘেয়ে লাগছিল। সারাটা দিন ধরে শুধু অ্যানালগ জিম, ডিজিটাল জিমের ট্রেনিং, নানান আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ট্রেনিং, ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ, অ্যাথলেটিক অপারেশানস, কিল গেম সিমুলেটর-এ ট্রেনিং আর সাইকোলজিক্যাল সেশান। এরই ফাঁকে বিকেলে দেড় ঘণ্টার ব্রেক। তখন জিশান আর অন্য পার্টিসিপ্যান্টসরা নানান খেলাধুলো আর আড্ডা-গল্পে মেতে ওঠে।
আড্ডা মারার সময় বা গল্প করার সময় জিশান অবাক হয়ে খেয়াল করে ও হাসছে, আর অন্যান্য প্রতিযোগীও তার ব্যতিক্রম নয়। ওদের কেউ-কেউ বেশ জোরে-জোরে হেসে উঠছে। কয়েক মুহূর্তের জন্য ভুলে যাচ্ছে, কোন পরিস্থিতির মধ্যে ওরা দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওদের মাথার ওপরে ঠিক কী ধরনের এবং কতটা ধারালো খাঁড়া ঝুলছে।
পিট ফাইটের পর একমাস সাতদিন পার হয়ে গেছে। জিশান আরও একমাস সাতদিন এগিয়ে গেছে কিল গেমের দিকে। ওর এটা ভালো লাগছিল। কারণ, মিনি আর শানুর সঙ্গে ওর দেখা হবে কি হবে না তার একটা চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে চলেছে। এবং তার পরই ওর জন্য অপেক্ষা করে রয়েছে শান্তিপূর্ণ জীবন। মিনি-শানুর কাছে ফিরে যেতে পারলে যেমন ওর শান্তি, তেমনই ফিরে যেতে না পারলেও যেখানে ও যাবে সেখানে চিরপ্রশান্তি।
ঘুমের ঘোরে এসব কথা ভাবছিল জিশান। তখনই অটোমেটিক প্লেট টিভি থেকে মিষ্টি মেয়েটার মিষ্টি গলা শুনতে পেল ও।
‘জিশান! জিশান—ওঠো। ভোর হয়েছে…।’
জিশান চোখ খুলল। একটা হাই তুলে উঠে বসল বিছানায়।
প্লেট টিভি ‘অন’ হয়ে গেছে। তার রঙিন ‘পরদানশিন’ মেয়েটি মুখে সুন্দর হাসি ফুটিয়ে জিশানকে ডাকছে।
আশ্চর্য! জিশানের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই মেয়ে বলল, ‘গুড মর্নিং। তাড়াতাড়ি হাত-মুখ ধুয়ে রেডি হয়ে নাও। মার্শাল স্যার ঠিক সাতটায় তোমার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছেন। ওই ইমার্জেন্সি স্পেশাল মিটিং-এর পর তোমার অ্যানালগ জিমের শিডিউল শুরু হবে…।’
জিশান বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল। দেওয়ালের ঘড়ির দিকে তাকাল। ছ’টা বেজে পাঁচ মিনিট।
মেয়েটা মনে হল সরাসরি জিশানের দিকে তাকিয়ে আছে। এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন জিশানের ভিডিয়ো ইমেজ ও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে।
অসম্ভব কিছু নয়। লুকোনো ক্যামেরা আর আধুনিক প্রযুক্তি যদি হাতে হাত মেলায় তা হলে ব্যাপারটা জলের মতো সহজ।
জিশান মেয়েটির চোখে চোখ রেখে সামান্য জড়ানো গলায় বলল, ‘ও.কে.—থ্যাংক য়ু। আমি রেডি হয়ে নিচ্ছি…।’
টিভির পরদার আলো দপ করে নিভে গিয়ে অন্ধকার হয়ে গেল। স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্লেট টিভি অফ হয়ে গেছে।
জিশান তৈরি হতে শুরু করল। আর একইসঙ্গে ভাবতে লাগল, শ্রীধর পাট্টা আবার কেন ডেকে পাঠিয়েছেন।
জিপিসির বাইরে বেরোনোর জন্য ওকে শাস্তি দিতে ডেকেছিলেন শ্রীধর। চুলকুনি অস্ত্র দিয়ে অভিনব শাস্তি। কিন্তু তারপর তো চার দিন পার হয়ে গেছে! এর মধ্যে তো জিশান কোনওরকম গোলমাল করেনি! বরং ভালো ছেলের মতো নিয়ম করে রোজকার রুটিন মেনে চলেছে।
তা হলে?
প্রশ্নটার উত্তর পাওয়া গেল শ্রীধর পাট্টার অফিসে গিয়ে।
সিন্ডিকেট বিল্ডিং-এর একুশতলায় শ্রীধরের অফিস। এই ভোর সাতটাতেও অফিসটার চরিত্র সকাল এগারোটার মতন।
