এখন সেইরকম একটা মানুষের দিকেই তাকিয়ে ছিলেন রঙ্গপ্রকাশ। ফরসা তেলতেলে মুখ। মুখে কেমন একটা বাচ্চা-বাচ্চা ভাব।
অনেকক্ষণ চুপ করে রয়েছেন। এবার কিছু একটা বলা দরকার।
এ-কথা ভাবার সঙ্গে-সঙ্গেই শ্রীধর বলে উঠলেন, ‘ডক্টর, কিছু বুঝতে পারলেন?’
ঘোর থেকে জেগে উঠলেন রঙ্গপ্রকাশ। টেবিল থেকে কুকিজ তুলে নিয়ে মুখে দিলেন, সফট ড্রিংকের গ্লাসে চুমুক দিয়ে লম্বা শ্বাস টেনে বললেন, ‘স্যার, আপনার…আপনার সামনে যে-লড়াই…সেই লড়াইটা খুব মসৃণ হবে না। তাই আপনার মুখের রিফ্লেকশানে ওইরকম…চাকা-চাকা দাগ।’ মাথা ঝুঁকিয়ে বসলেন। ঘাড়ে একবার হাত বোলালেন। তারপর শ্রীধরের দিকে তাকিয়ে আলতো করে যোগ করলেন, ‘আক্রমণ যেটা আসবে…মানে, শত্রুর দিক থেকে…সেটা হবে আনএক্সপেক্টেড। মানে, আপনি আগে থেকে গেস করতে পারবেন না। সেইজন্যেই ওরকম অন্ধকার দেখেছেন…নড়েচড়ে বেড়াচ্ছে…জীবন্ত অন্ধকার।’
কে হতে পারে সেই অপ্রত্যাশিত শত্রু? কে হতে পারে সেই জীবন্ত অন্ধকার?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে নিজের অজান্তেই শ্রীধর পাট্টার কপালে ভাঁজ পড়েছিল। রঙ্গপ্রকাশ সেই দুশ্চিন্তাটাকেই যেন আরও তীব্র করতে প্রশ্ন করলেন, ‘এমন কোনও শত্রুর কথা কি আপনি ভাবতে পারছেন, স্যার? যাকে এখনও শত্রু বলে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না—অথচ যে আনএক্সপেক্টেড দিক থেকে সাডেনলি অ্যাটাক করতে পারে?’
সফট ড্রিংকে চুমুক দিয়ে মেঝের দিকে তাকালেন শ্রীধর। কয়েক সেকেন্ড মাথা ঝুঁকিয়ে থেকে ধীরে-ধীরে মাথা নাড়লেন এপাশ-ওপাশ।
‘না, এরকম এনিমি হিসেবে কাউকে এখন আইডেনটিফাই করতে পারছি না…।’
সোফা এবং নিজের শরীরের মাঝে খাড়া করে দাঁড় করানো গোলাপি ফোল্ডারটার দিকে রঙ্গপ্রকাশের চোখ গেল। জিশানের সাইকোলজিক্যাল প্রাোফাইল নিয়ে শ্রীধরের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তবে সেসব কথা শুরু করার আগে থেরাপির ‘কিউ অ্যান্ড এ’ সেশানটা সেরে নেওয়া যাক।
একবার হাতঘড়ির দিকে তাকালেন ডক্টর। তারপর বললেন, ‘যা-যা বললেন সে ছাড়া আর কোনও স্বপ্ন কি দেখেন আপনি?’
‘না:, শুধু ওইগুলোই। ঘুরেফিরে ওই স্বপ্নগুলোই আসে—তবে তার ডিটেইলের একটু-আধটু রকমফের হয়।’
‘তা হলে কোয়েশ্চেন-আনসার সেশান শুরু করি, স্যার?’
‘হ্যাঁ—করুন।’
কথাটা বলেই সোফায় শরীর এলিয়ে দিলেন শ্রীধর। সেই অবস্থাতেই পকেট থেকে স্যাটেলাইট ফোন বের করে দেওয়ালের একটা কালো ফাইবার প্লেটের দিকে তাক করে বোতাম টিপলেন। সঙ্গে-সঙ্গে ওয়াল মাউন্টেড একটা অডিয়ো সিস্টেম ‘রেকর্ডিং অ্যাকটিভ’ হয়ে গেল।
রঙ্গপ্রকাশের সঙ্গে প্রতিটি সাইকোথেরাপি সেশান রেকর্ড করে নেন শ্রীধর। সেই রেকর্ডিং-এ দিন এবং সময় বসিয়ে নেয় অডিয়ো সিস্টেম নিজেই। রেকর্ড করা সেশানের একটা কপি একটা মাইক্রোসিডিতে করে রঙ্গপ্রকাশকে দিয়ে দেন। ফলে ডক্টর এবং ক্লায়েন্ট দুজনেই থেরাপির প্রগ্রেস সম্পর্কে পুরোপুরি আপডেটেড থাকেন। প্রয়োজনে কখনও সেগুলো নিয়ে নিজেরা আলোচনাও করতে পারেন।
পকেট থেকে ছোট একটা নোটবই আর পেন বের করে নিলেন ডক্টর। কারণ, সেশানের মাঝে-মাঝে কোনও-কোনও পয়েন্ট নোট করে নেওয়ার দরকার হয়। এই নোটগুলো ওঁর নিজের। এগুলো শ্রীধর পাট্টার জন্য নয়।
ঠোঁটের ওপর জিভ বুলিয়ে নিলেন রঙ্গপ্রকাশ। তারপর আচমকা শুরু করলেন।
‘ছোটবেলাতে আপনি ফিরে যেতে চান?’
‘না—না।’
শ্রীধর চোখ বুজে ফেলেছিলেন। বোধহয় তীক্ষ্ণ মন:সংযোগ তৈরি করতে চাইছিলেন। ওঁকে দেখে রঙ্গপ্রকাশের মনে এক বিচিত্র ভাব জেগে উঠল। তীব্র প্রতিশোধকামী যে-নিষ্ঠুর মানুষটাকে তিনি জেনে এসেছেন এখন তাকে দেখে অসহায় ঘুমন্ত শিশু বলে মনে হচ্ছে।
‘ছোটবেলায় ফিরতে চান না কেন? অনেকেরই তো ছোটবেলায় ফিরে যেতে ইচ্ছে করে…।’
‘না, আমার ছোটবেলায় ফিরতে ইচ্ছে করে না।’
‘ছোটবেলায় সবাই ফিরে যেতে চায় সিকিওরিটির জন্যে। কারণ, তখন চারপাশে বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন—সব গুরুজনেরা থাকেন। তাঁরা ছোটবেলার নিরাপত্তার জোগান দেন। দে প্রাোভাইড দ্য সেফটি ওয়ালস…।’
‘না, আমি ফিরব না। আমার কোনও সেফটি ওয়াল ছিল না।’
‘তা হলে কী ছিল?’
‘কিছুই ছিল না। কেউ ছিল না। শুধু আমি ছিলাম। একা। একেবারে একা।’
‘একা থাকতে আপনার ভয় করত না?’
‘না। ফিয়ার ওয়জ মাই ওনলি রিলেটিভ। ওনলি ফ্রেন্ড…।’
নোটবইতে কয়েকটা পয়েন্ট টুকে নিলেন রঙ্গপ্রকাশ। অদ্ভুত মন্তব্য। ‘ফিয়ার ওয়জ মাই ওনলি রিলেটিভ। ওনলি ফ্রেন্ড…।’ ভয় আমার একমাত্র আত্মীয়। একমাত্র বন্ধু…।
‘ভয় কীভাবে আপনার আত্মীয় হল? বন্ধু হল?’
‘আমার চারপাশে ভয় ছিল। ভয় আমাকে ঘিরে থাকত। মাঝে-মাঝে মনে হত, ইট ওয়জ মাই সেফটি ওয়াল।’
‘আপনি কি তাড়াতাড়ি বড় হতে চাইতেন? মনে হত, এই দুনিয়ার সঙ্গে ঠিকঠাক মোকাবিলা করার জন্যে আপনার তাড়াতাড়ি বড় হয়ে ওঠা দরকার?’
‘হ্যাঁ—মনে হত। মাঝে-মাঝে মনে হত।’
‘আপনার তো বন্ধু ছিল না বললেন—তাই তো?’
‘হ্যাঁ—।’
‘কোনও শত্রু ছিল?’
‘প্রচুর। আমার মনে হত, আমার চারপাশে শত্রু। কিলবিল করছে। ওদের আমি ঘেন্না করি। আই ডেসপাইজ দেম।’
‘কারা সেই শত্রু? দু-একজনের নাম বলতে পারেন?’
‘নাম? নাম কী বলব! সবাই শত্রু। দ্য হোল সোসাইটি ওয়জ মাই এনিমি—।’
