শ্রীধরের উত্তর শুনতে-শুনতে নোট নিলেন ডক্টর। সোসাইটির প্রতি অ্যাপ্যাথি। সমাজ নাপসন্দ। সেই থেকেই হয়তো সমাজকে দখল করে শাসন করার ইচ্ছেটা অবচেতনে দানা বেঁধেছে। এখন নিউ সিটিতে তিনি যেটা করছেন। শাসন। অতিশাসন। অপশাসন।
‘সবাই কেন শত্রু হবে?’ কোমল গলায় বললেন ডক্টর। তারপর কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘ছোটবেলায় কে আপনাকে দেখাশোনা করত?’
শ্রীধরের যে বাবা-মা ছিল না সেটা আগের নানান থেরাপি সেশান থেকে রঙ্গপ্রকাশ জানেন। কিন্তু বাবা-মায়ের বদলে কারা ওঁকে ছোটবেলাটায় মানুষ করেছেন সেটা এখনও জানা যায়নি। শ্রীধর সবসময় প্রশ্নটা এড়িয়ে গেছেন। আজ আবার কথায়-কথায় সেই একই প্রশ্ন এসে গেছে।
শ্রীধর চোখ বুজে ছিলেন। ওঁর ফরসা মুখে অপ্রসন্নতার কয়েকটা ভাঁজ পড়ল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তারপর বললেন, ‘দেখাশোনা কেউ করত না। জ্ঞান হয়ে থেকেই দেখেছি আমি সবার ফাইফরমাশ খাটছি। আমাকে যে-সে শাসন করছে—চড়-থাপ্পড় মারছে—গায়ে থুতু দিচ্ছে।’
‘বাবা-মায়ের খোঁজ করেননি কখনও?’
‘প্রথম-প্রথম একে-তাকে জিগ্যেস করতাম…পরে আর করিনি।’
‘কেন, করেননি কেন?’
‘যারা ইচ্ছে করে লুকিয়ে পড়ে তাদের কখনও খুঁজে পাওয়া যায়! আমি বুঝতে পেরেছিলাম, আমার মা-বাবা আমাকে ফেলে পালিয়ে গেছে—লুকিয়ে পড়েছে—আর কখনও আমার সামনে আসবে না বলে…।’
‘বাবা-মাকে কাছে পাওয়ার জন্যে মন টানত না? কষ্ট হত না…কান্না পেত না?’
‘প্রথম-প্রথম মন টানত। আমার বয়েসি বাচ্চা-কাচ্চাগুলো রাস্তার ধারের নোংরা ঝুপড়িতে থাকত। দু-বেলা ঠিকমতো খেতে পেত না। খাবারের খোঁজে আবর্জনা ঘাঁটত। কিন্তু ওদের দেখতাম বাবা-মায়ের সঙ্গে খেলা করছে, হাসছে—কী আনন্দে আছে। তখন আমার কষ্ট হত, কান্না পেত। তারপর…তারপর…রাগ হত। অসহ্য রাগ। সবার বাবা-মায়ের জন্যে আমার ঘেন্না হত।’
নোট নিতে-নিতে মুখ তুললেন রঙ্গপ্রকাশ। শ্রীধরের দিকে তাকালেন। ওঁর মুখে একটা লালচে আভা। আর তার সঙ্গে ঘৃণা আর উত্তেজনার ছাপ।
‘হ্যাঁ—বুঝতে পারছি। কিন্তু…একটা কথা বলুন তো। ছোটবেলায় যেখানে আপনি থাকতেন—মানে, ওল্ড সিটিতে—সেখানে আপনার ফিরে যেতে ইচ্ছে করে না?’
‘না, না, না-না-না!’ শ্রীধরের ঠোঁট চিরে হিসহিস শব্দে ‘না’-এর স্রোতটা বেরিয়ে এল। মুখের লালচে আভা আরও গাঢ় হল।
কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন ডক্টর। শ্রীধরের উত্তেজনার পারদকে খানিকটা নেমে আসার সময় দিলেন। তারপর : ‘ওল্ড সিটিকে আপনার ভালো লাগে না?’
‘ভালো লাগবে?’ অবাক সুরে পালটা প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন : ‘কেন, ভালো লাগবে কেন?’
‘আপনার জন্মভূমি—তাই…।’
‘জন্মভূমি মাই ফুট। আই হেট ওল্ড সিটি। ওল্ড সিটিকে আমি ঘেন্না করি। ওই নোংরা, অসুস্থ, ক্লেদাক্ত শহরটা আমাকে কী দিয়েছে? কিছুই না! কিচ্ছু না! ওই শহরটাকে আমি হাতের মুঠোয় পিষে গুঁড়ো করে ফেলতে চাই। আই ওয়ন্ট টু অ্যানিহিলেট দ্যাট রটন হেল অ্যালংউইথ অল দ্য স্কাম ইন ইট।’
শ্রীধর বড়-বড় শ্বাস নিচ্ছিলেন। ওঁর ঠোঁট নড়ছিল। নি:শব্দে কিছু একটা বিড়বিড় করছিলেন।
নোটবইয়ের পাতায় রঙ্গপ্রকাশের পেন ব্যস্তভাবে চলছিল। একইসঙ্গে ওঁর মনের ভেতরে শ্রীধর পাট্টার মনস্তাত্বিক মূল্যায়নও চলছিল। সাইকোলজিক্যাল প্রাোফাইল তৈরি হচ্ছিল।
ওল্ড সিটির প্রতি শ্রীধরের এই একরোখা ঘৃণার জন্যই কি সুপারগেমস কর্পোরেশনের নানান হাই রিসক গেমসের প্রতিযোগী জোগাড় করা হয় শুধুমাত্র ওল্ড সিটি থেকে? এই কারণেই কি বড়লোক বানানোর লোভ দেখিয়ে ওল্ড সিটির গরিব ‘ছোটলোক’গুলোকে দোজখের দরজায় পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়?
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে শ্রীধরের পরিচয়হীনতার ক্ষোভ। সেখান থেকেই তৈরি হয়েছে সুস্থ সমাজের প্রতি ওঁর আক্রোশ।
শ্রীধর পাট্টার মনের গঠনের মানচিত্র যেন অস্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছিলেন রঙ্গপ্রকাশ। সন্দেহবাতিকগ্রস্ত একজন অতিমাত্রায় সংবেদনশীল মানুষ। ওঁর মধ্যে রয়েছে গোঁয়ার্তুমি, হিংসা, অসার আত্মগর্ব। এ ধরনের মানুষ নিজেকে ছাড়া আর কাউকেই কোনও গুরুত্ব দেয় না, আর নিজের ভুল বা ব্যর্থতার জন্য সবসময় অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপায়। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে অপরিণত বিবেক আর অপরিণত অপরাধবোধ।
সব মিলিয়ে একটা জটিল প্যারানয়েড পারসোনালিটি।
‘ওল্ড সিটি আপনি ছেড়ে এলেন কেমন করে?’ নোট নেওয়া শেষ করে প্রশ্নটা করলেন রঙ্গপ্রকাশ।
‘সেটা এক আশ্চর্য ঘটনা।’ চোখ বুজেই ঠোঁটে হাসলেন শ্রীধর। তারপর এমনভাবে কথা বলতে লাগলেন যেন স্লো মোশানে একটা সিনেমা দেখছেন এবং অস্ফুট স্বরে ধীরে-ধীরে সেটার বর্ণনা করছেন।
‘আমার দাদা বলধর পাট্টা আমাকে ওল্ড সিটিতে হঠাৎই খুঁজে পায়। আমার গলার একটা চেন দেখে চিনতে পারে। আমার খুব ছোটবেলায় এই নিউ সিটিতে পিস ফোর্সের একটা বিদ্রোহ হয়েছিল। শুনেছি তখন আমার বয়েস ছিল নাকি এক বছর দু-মাস। সেই বিদ্রোহের সময় পিস ফোর্সের ছ’জন বিদ্রোহী অফিসার আমাকে কিডন্যাপ করে শুটারে চেপে ওল্ড সিটিতে পালিয়ে যায়। ওরা দাদাকে থ্রেট করে—বলে যে, কাউকে এই কিডন্যাপিং-এর কথা জানালে ওরা আমাকে খুন করে ফেলবে। পরে দাদা মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করে সবক’টা বিদ্রোহীকে খুঁজে বের করে গুনে-গুনে খতম করে। কিন্তু আমাকে আর খুঁজে পায়নি। পেয়েছে তার অনেক বছর পরে—প্রায় তেরো বছর পরে। তখন দাদার কাছেই সব কথা শুনেছি—।’
