‘কী নেবেন বলুন, ডক্টর? হট, না কোল্ড?’
রঙ্গপ্রকাশ ল্যাপটপের স্ক্রিনসেভারের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। শ্রীধরের মধ্যে যে সামান্য মেগালোম্যানিয়ার লক্ষণ তিনি টের পেয়েছেন, বোধহয় সেটার কথাই ভাবছিলেন।
শ্রীধরের প্রশ্নে চমকে মুখ তুলে তাকালেন। বললেন, ‘কুকিজ। আর সফট ড্রিংক।’
শ্রীধর পকেট থেকে ছোট্ট একটা রিমোট কন্ট্রোল ইউনিট বের করলেন। পটাপট কয়েকটা বোতাম টিপলেন।
সঙ্গে-সঙ্গে ডোমেস্টিক রোবট সচল হল। ওটার পেটের কাছ থেকে একটা মেটাল ট্রে বেরিয়ে এল বাইরে। রোবটটা ভেন্ডিং মেশিনের কাছে গিয়ে বোতাম টিপল। মেশিন থেকে সফট ড্রিংক আর কুকিজ বেরিয়ে এল। রোবটটা সেগুলো ওর ট্রেতে সাজিয়ে নিল। তারপর কোমরের কাছে দুটো লুকোনো চেম্বারের দরজা খুলে দুটো ক্রিস্টালের গ্লাস বের করল। সফট ড্রিংকের বোতলের পাশে রাখল।
এবার রোবটটা ওর পায়ের চাকা গড়িয়ে কফি-টেবলের কাছে এল। নিখুঁত দক্ষতায় টেবিলে ওগুলো নামিয়ে সফট ড্রিংক অর কুকিজ সার্ভ করল। তারপর নিজের জায়গায় ফিরে গিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। শুধু দপদপ করা সবুজ আলোটা জানিয়ে দিতে লাগল যে, ও এখনও অ্যাকটিভ।
‘শেভ করেননি কেন?’
শ্রীধরের আচমকা প্রশ্নে রঙ্গপ্রকাশ কেমন হকচকিয়ে গেলেন। নিজের অজান্তেই গালে হাত চলে গেল। খোঁচা-খোঁচা দাড়িতে আঙুল বোলালেন। বললেন, ‘এমনি…।’
শ্রীধর কুকিজ তুলে মুখে দিলেন। সফট ড্রিংক সিপ করলেন। রঙ্গপ্রকাশকে স্থিরচোখে জরিপ করতে-করতে বললেন, ‘ও. কে., ডক্টর। আপনার টেনশান নিয়ে পরে কথা বলব।’ সোফায় হেলান দিয়ে শরীরটাকে ডুবিয়ে দিলেন : ‘আগে আমার টেনশান নিয়ে কথা হোক…।’
রঙ্গপ্রকাশ নড়েচড়ে বসলেন। কুকিজ তুলে কামড় বসালেন। সফট ড্রিংকের গ্লাসে চুমুক দিলেন। ঝাঁঝটা নাকে জ্বালা ধরাল। কিন্তু মিষ্টি তরলের ঠান্ডা ছোঁয়ায় কেমন যেন এক প্রশান্তি খুঁজে পেলেন। দু-হাতে মুখ মুছলেন। ইকনমিক ইনডেক্স নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত নিউ সিটির একজন নাগরিককে পিছনে ঠেলে দিয়ে সাইকিয়াট্রিস্ট ডক্টর রঙ্গপ্রকাশ বিশ্বাসকে সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা করলেন। গলায় পেশাদারি গাম্ভীর্য এনে প্রশ্ন করলেন, ‘এখন কেমন আছেন?’
‘ভালো না।’ ঠোঁট টিপে বললেন শ্রীধর। ফরসা মুখে অপ্রসন্ন ভাঁজ ফেললেন : ‘কতকগুলো স্বপ্ন বড় ঝামেলা করছে।’
‘স্বপ্ন?’ অবাক হলেন রঙ্গপ্রকাশ।
‘হ্যাঁ, স্বপ্ন—’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। চোখ বুজে ধীরে-ধীরে বললেন, ‘এমনিতে স্বপ্নগুলো হয়তো তেমন খারাপ কিছু নয়…কিন্তু আমার কাছে ওগুলো সিম্পলি নাইটমেয়ার—দু:স্বপ্ন।’
‘কেন? কী দেখেছেন স্বপ্নে?’ ভুরুতে ভাঁজ ফেললেন ডক্টর।
‘যেমন, একটা মরুভূমি। চারিদিকে শুধু হলদে বালি আর বালি। সেই বালি থেকে তাপ উঠছে। আমার পা পুড়ে যাচ্ছে…কিন্তু আমি হেঁটে চলেছি। ঢেউখেলানো বালির পাহাড় একের পর এক ডিঙিয়ে চলেছি—অথচ বালির শেষ নেই। বাতাসে বালির কণা উড়ছে—চোখে-মুখে এসে লাগছে। মনে হচ্ছে ওগুলো আগুনের কণা…।’
শ্রীধর চোখ বুজে কথা বলছিলেন। খুব ধীরে এক-একটা শব্দ স্পষ্ট করে উচ্চারণ করছিলেন।
রঙ্গপ্রকাশ বেশ বুঝতে পারছিলেন স্বপ্নের প্রতীক কী বলতে চাইছে, কীসের ইশারা করছে। দুর্ভিক্ষ, অনাহার, মৃত্যু, জাতিদাঙ্গা, সম্পত্তির বিপুল ক্ষয়ক্ষতি।
সোফায় শরীর এলিয়ে চোখ বুজে বসে থাকা এই নিষ্ঠুর মানুষটা এতদিন ধরে শুধু ভয় আর ক্ষয় বিক্রি করে চলেছে। এবার কি ওর সেগুলো কেনার পালা? স্বপ্নটা কি সে-কথাই জানাতে চাইছে?
কিন্তু সেসব তো শ্রীধরকে বলা যাবে না। কারণ, সেই ভয় আর ক্ষয়।
তাই উত্তরটাকে মনে-মনে সাজিয়ে নিয়ে বারকয়েক রিহার্সাল দিয়ে তারপর ডক্টর বললেন, ‘এর অর্থ হচ্ছে, আপনি একা। একজন সেলফমেড ম্যান। আর…আপনার সামনে লড়াই—।’
কিছুক্ষণ চুপচাপ।
শ্রীধর পাট্টা চোখ খুললেন। কুকিজ আর সফট ড্রিংক চলতে লাগল।
একসময় রঙ্গপ্রকাশ জিগ্যেস করলেন, ‘আর কী স্বপ্ন দেখেন আপনি?’
চোখ বুজলেন শ্রীধর। আলতো করে বললেন, ‘আয়নার স্বপ্ন দেখি। আয়নায় আমার…আমার মুখ দেখতে পাই…।’
•
‘স্পষ্ট দেখতে পান?’
‘হ্যাঁ…’ সফট ড্রিংক সিপ করলেন শ্রীধর : ‘প্রায় স্পষ্টই বলা যায়, আয়নার সামনে আমি দাঁড়িয়ে আছি। আমার মুখে চাকা-চাকা দাগ। অনেকটা জলবসন্তের গুটির মতো। আর আয়নায় আমার মুখের পেছনটা গাঢ় অন্ধকার। আমি খুব চেষ্টা করেও অন্ধকারের মধ্যে কিছু দেখতে পাচ্ছি না। অথচ…অথচ আমার মনে হচ্ছে…মনে হচ্ছে, অন্ধকারটা নড়েচড়ে বেড়াচ্ছে…।’
রঙ্গপ্রকাশ বুঝতে পারছিলেন। এই স্বপ্নের ব্যাপারটা যদি শ্রীধর ঠিকঠাক বলে থাকেন তা হলে এই স্বপ্নের অর্থ একটাই : শ্রীধর খুব শিগগিরই রূঢ় এবং কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। শ্রীধরের দিক থেকে দেখলে সেই বাস্তব কুৎসিত—তাই ওঁর মুখে জলবসন্তের গুটির চাকা-চাকা দাগ। আর ওই যে অন্ধকার, নড়েচড়ে বেড়াচ্ছে—সেটা হল অজানা আশঙ্কা, ভয়।
কিন্তু শ্রীধর পাট্টাকে এর কতটুকু বলা যায়?
কিংবা আদৌ কি বলা যায়?
এই লোকটা প্রত্যক্ষে বা পরোক্ষে কত মানুষের যে মৃত্যুর কারণ হয়েছে তার কোনও হিসেব নেই। অথচ লোকটার মধ্যে অপরাধবোধও নেই।
তার কারণ ওর অপরিণত বিবেক। সাইকোলজির ভাষায় যাকে বলে ‘আন্ডারডেভেলাপড কনশানস’। সোজা কথায় শ্রীধর পাট্টা একজন ‘মরাল মোরন’। এই ধরনের অ্যান্টিসোশাল পারসোনালিটির মানুষরা মুখে সবসময় মূল্যবোধের কথা বলে, কিন্তু বিবেক অপরিণত হওয়ায় মূল্যবোধের বোধটাই থাকে না। এদের বুদ্ধি ক্ষুরধার, কিন্তু বিবেক ভোঁতা।
