একবার রিং হওয়ার পরই দরজা খুলে গেল। চোখে পড়ল একটা হলঘর। একটা লুকোনো স্পিকারে শ্রীধরের সংক্ষিপ্ত আবাহন শোনা গেল : ‘ওয়েলকাম, ডক্টর।’
রঙ্গপ্রকাশের সামনে কেউ নেই। কেউ ওঁকে রিসিভ করতে আসেনি।
এতে রঙ্গপ্রকাশ মোটেই অবাক হলেন না। কারণ, এই অপরূপ সুন্দর, হাইলি অটোমেটেড এবং ল্যাভিশলি ফারনিশড তিনতলা বাড়িটায় শ্রীধর পাট্টা সম্পূর্ণ একা থাকেন। নিরাপত্তার কারণেই কাউকে তিনি বিশ্বাস করেন না।
খুবই স্বাভাবিক। কারণ, শ্রীধরের মধ্যে তিনি সোশিয়োপ্যাথিক ডিসঅর্ডার ছাড়াও প্যারানয়েড পারসোনালিটির হদিস পেয়েছেন। প্যারানয়েড পারসোনালিটির মানুষ হাইপারসেনসিটিভ আর সন্দেহবাতিকগ্রস্ত হয়।
রঙ্গপ্রকাশ হলঘরে ঢুকতেই ওঁর পিছনে দরজা বন্ধ হয়ে গেল। বন্ধ হওয়ার শব্দের ফাঁপা প্রতিধ্বনি শোনা গেল।
হলঘরের মাঝখান থেকে একটা স্টেইনলেস স্টিলের সিঁড়ি অদ্ভুত ছন্দে পাক খেয়ে উঠে গেছে দোতলায়। তারপর পাকের ব্যাসার্ধ বাড়িয়ে সেটা ঘরের দেওয়ালে সেঁটে গিয়ে একটা অদ্ভুত ব্যালকনি তৈরি করে ফেলেছে। ঘরের উজ্জ্বল সাদা আলোয় সিঁড়ি আর ব্যালকনি ঝকঝক করছে।
সেই ব্যালকনির এক কোণে দাঁড়িয়ে আছেন শ্রীধর পাট্টা। গায়ে ফুলহাতা কালো টি-শার্ট আর পায়ে কালো প্যান্ট। দেখে মনে হচ্ছে, টানটান ঋজু ভঙ্গিতে একটা কালো পাথরের মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে।
শ্রীধর চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন। কারণ, তিনি জানেন, রঙ্গপ্রকাশকে কোনওরকম নির্দেশ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
থমথমে নিস্তব্ধতার মধ্যে হলঘরের কার্পেটের ওপরে পা ফেলে এগোলেন ডক্টর। কার্পেটের ডিজাইনটা নিউ সিটির রঙিন ম্যাপ। এই কার্পেট বিদেশ থেকে অর্ডার দিয়ে তৈরি। এবং এই কার্পেট মাত্র একপিসই তৈরি করা হয়েছে।
হলঘরের দেওয়ালে আট-দশটা হলোগ্রাম পেইন্টিং। গত পাঁচশো বছরের নামি শিল্পীদের বিখ্যাত সব পেইন্টিং-এর হলোগ্রাফিক রিপ্রাোডাকশন। তার মধ্যে ভ্যান গঘ, সালভাদোর দালি, রবীন্দ্রনাথ, বিকাশ ভট্টাচার্য, মকবুল ফিদা হুসেনও রয়েছেন।
ছবি-টবি সব সাজিয়েছেন বটে, কিন্তু শিল্পী এবং শিল্পের খোঁজ শ্রীধর কতটা রাখেন সন্দেহ আছে।
এ-কথা ভাবতে ভাবতে স্টেইনলেস স্টিলের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করলেন রঙ্গপ্রকাশ। শ্রীধর একইভাবে দাঁড়িয়ে ওঁকে লক্ষ করতে লাগলেন।
রঙ্গপ্রকাশ যখন শ্রীধরের খুব কাছাকাছি চলে এলেন তখন শ্রীধর কথা বললেন, ‘চলুন—কনফারেন্স রুম ওয়ানে গিয়ে বসি।’ এবং সেদিক লক্ষ্য করে হাঁটা দিলেন।
শ্রীধরের বাড়িতে তিনটে কনফারেন্স রুম আছে। তাদের নম্বর ওয়ান, টু এবং থ্রি। রুম নম্বর ওয়ানটা মাপে সবচেয়ে ছোট। বড়জোর পাঁচজন মানুষ সেখানে বসে আলোচনা করতে পারে। দু-নম্বর ঘরটা পনেরোজনের জন্য। আর শেষ কনফারেন্স রুমটায় তিরিশজন বসতে পারে।
শ্রীধরের বাড়ির সমস্ত দরজা এবং জানলার কাচগুলো আসলে মামুলি কাচ নয়—ফোটোক্রোমিক ন্যানোপলিমার প্লেট। ওগুলো স্বচ্ছ তো বটেই, তার ওপর শ্যাটারপ্রুফ এবং বুলেটপ্রুফ। যদি কোনও স্নাইপার বহুদূরের কোনও হাইরাইজ বিল্ডিং থেকে হাই পাওয়ার টেলিস্কোপিক রাইফেল কিংবা অটো-কনভার্জিং রকেট লঞ্চার থেকে শ্রীধরের বাড়ির জানলা লক্ষ্য করে ফায়ার করে তবে সে ভীষণ হতাশ হবে।
আক্রমণকারীদের হতাশ করাই শ্রীধর পাট্টার একমাত্র মিশন।
কনফারেন্স রুম ওয়ানের কাচের দরজা ঠেলে ওঁরা দুজনে ঢুকে পড়লেন।
ঘরটা ঠান্ডা। সেন্ট্রাল এসি সিস্টেম নি:শব্দে কাজ করে চলেছে।
ঘরের ডানদিকে কনফারেন্স টেবিল, আর পাঁচটা মোটর অপারেটেড আরামের গদি-আঁটা চেয়ার। চেয়ারগুলোর পায়ায় চাকা লাগানো। আর, ডানদিকের হাতলে ছোট কন্ট্রোল প্যানেল। প্যানেলের বোতাম টিপে চেয়ারগুলোকে খুশিমতো চালানো যায়।
ঘরের বাঁ-দিকে অনেকটা ফাঁকা জায়গা। সেখানে দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা বেঁটেখাটো চেহারার ডোমেস্টিক রোবট। তার মাথাটা বেঢপ, হাত-পাগুলো দৈর্ঘ্যে ছোট হলেও বেশ মোটাসোটা, মজবুত। রোবটটার বুকের কাছটায় একটা চৌকো গর্ত—সেটা কালো কাচে ঢাকা। রঙ্গপ্রকাশ জানেন, ওটা রিমোট অ্যাক্টিভেশানের রিসেপটর। তার পাশেই দুটো সবুজ আলো—একটা স্থিরভাবে জ্বলছে, অন্যটা দপদপ করছে।
ডোমেস্টিক রোবটটার পাশেই দাঁড় করানো রয়েছে তিনটে অল-গ্লাস ভেন্ডিং মেশিন। তাদের প্রথমটায় কফি, দ্বিতীয়টায় বিভারেজ আর তৃতীয়টায় স্ন্যাক্স সার্ভ করার ব্যবস্থা রয়েছে। দরকার পড়লে কনফারেন্সে আমন্ত্রিত অতিথিদের এই ডোমেস্টিক রোবটই কফি, বিভারেজ এবং স্ন্যাক্স সার্ভ করে।
ঘরের সবচেয়ে দূর-প্রান্তে গাঢ় বাদামি রঙের দুটো সোফা। তাদের গালফোলা গদির রকমসকম দেখেই বোঝা যায় ওগুলো বসার পক্ষে অতিরিক্ত আরামের। বাদামি সোফা দুটির মাঝখানে একটা কালচে বাদামি রঙের কফি টেবল। তার কাঠের পালিশ অক্ষত রাখার জন্য সিরামিক ল্যাকারের কোটিং দেওয়া রয়েছে।
টেবিলের ওপরে একটা ল্যাপটপ কম্পিউটার খোলা। তার পরদায় শ্রীধর পাট্টার মুখের ছবি। শ্রীধরের ল্যাপটপের স্ক্রিনসেভার হিসেবে এর চেয়ে ভালো ছবি আর কী হতে পারে!
শ্রীধর ডক্টরকে ইশারা করলেন। তারপর দুটো সোফায় বসে পড়লেন দুজনে।
বড় করে একটা শ্বাস ছাড়লেন শ্রীধর। রঙ্গপ্রকাশকে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন।
