আর টিভি যদি চালু থাকে এবং তাতে অন্য চ্যানেল চলতে থাকে, তা হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চ্যানেল সোয়াপ হয়ে গিয়ে ইনটারঅ্যাকটিভ চ্যানেল পরদায় চলে আসে।
টিভির দিকে তাকিয়ে জিশান ওর আজকের নাইট সাফারির কথা ভাবছিল। ভাবছিল, ওকে নিয়ে বিজ্ঞাপনদাতাদের মাতামাতির কথা।
রিমোটের বোতাম টিপে টিভি অন করে দিল জিশান। চ্যানেল সার্ফ করে একটা গেমের চ্যানেলে গিয়ে থামল। লাইভ টেলিকাস্ট নয়—সেখানে তখন একটা ‘হাংরি ডলফিন’ গেমের ভিডিয়ো রেকর্ডিং দেখাচ্ছে। সমুদ্রের জলে ডলফিনের সঙ্গে মিশে আছে ডলফিনের ‘ছদ্মবেশ’ নেওয়া হিংস্র হাঙর। তাদের মধ্যে সাঁতারে বেড়াচ্ছে প্রতিযোগী।
হঠাৎই শুরু হল কর্মাশিয়াল ব্রেক। আর সেই ব্রেকের সময়ে টিভির পরদায় দেখা দিল জিশান। ওকে নিয়ে বিজ্ঞাপন শুরু হল।
অ্যানালগ জিমে জিশান ব্যায়াম করছে। বাটারফ্লাই ক্রাঞ্চ! রুমে এসি থাকা সত্বেও ওর ত্বকের ওপরে ঘামের চকচকে স্তর। হঠাৎ সেই ছবি সরে গিয়ে একটা ভাইটালাইজিং পাউডারের কনটেইনারের ছবি। পাশে একজন স্লিম সুন্দরী তরুণী। মিষ্টি গলায় পাউডারের নানান গুণপনার কথা বলছে। পাউডারের কৌটোটাকে উষ্ণ আদরের ভঙ্গিতে বুকে জড়িয়ে ধরেছে। আদুরে ঢঙে হাস্কি ভয়েসে বলছে, ‘তুমি আমার। আমার তুমি।’ তারপরই জিশানের হাসিমুখ। আবার জিশানের ব্যায়াম। আবার পাউডারের কৌটো।
বিজ্ঞাপনটা শেষ হওয়ার পর জিশান ভাবতে বসল। টিভিতে তখন অন্য বিজ্ঞাপন শুরু হয়ে গেলেও সেদিকে ওর মন ছিল না।
এই বিজ্ঞাপনের ব্যাপারটা জিশান জানতেও পারেনি। জিশানকে জানানোর দরকারও মনে করেনি কেউ। ওর ব্যায়ামের ছবির ক্লিপিং-এর সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে ওই ভাইটালাইজিং পাউডারের ছবি, মেয়েটির ছবি। তারপর এডিটিং-এর কারসাজিতে ছবিগুলো বিনুনির মতো জুড়িয়ে দিয়েছে। তারই মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছে জিশানের হাসিমুখ। কোনওসময় ও হয়তো মনোহর বা খোকনের সঙ্গে হাসি-মশকরা করছিল, তখন লুকোনো টেলিক্যামেরায় তুলে নিয়েছে ওর হাসিমুখের ছবি।
জিশানের খুব রাগ হল। কিন্তু পরমুহূর্তেই ও বুঝল, এ রাগের কোনও মানে নেই। ওর ফোঁসফোঁসানিই সার—ওর কামড়ে কোনও বিষ নেই।
হতাশা আর ক্ষোভে ওর চোখ জ্বালা করতে লাগল।
বিছানার মাথার দিকে তাকাল জিশান। বালিশের পাশেই পড়ে আছে এম. ভি. পি.—মাইক্রোভিডিয়োফোন।
মিনিকে ভীষণ ফোন করতে ইচ্ছে করল।
দেওয়াল-ঘড়ির দিকে তাকাল। রাত দেড়টা।
মিনি নিশ্চয়ই এখন ঘুমিয়ে আছে। আর মা-কে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে ছোট্ট শানু। তা ছাড়া এই মাঝরাতে মিনির এম. ভি. পি. নিশ্চয়ই সুইচ অফ করা আছে।
এতসব ভাবনার পরেও জিশান শরীরটা ঝুঁকিয়ে হাত বাড়িয়ে এম. ভি. পি.-টা মুঠো করে ধরল। সঙ্গে-সঙ্গে ওর মনে হল, মিনি এসে গেছে হাতের মুঠোয়।
সোজা হয়ে বসল। এম. ভি. পি.-টা মুখের সামনে তুলে ধরল। তারপর বোতাম টিপল।
আজকের রাতটার মধ্যে বোধহয় ম্যাজিক আছে। কারণ, ফোনের বাজনা তৃতীয়বার শেষ হওয়ার আগেই মিনি ফোন ধরল।
ছোট্ট এল.সি.ডি. পরদায় ওকে দেখতে পেল জিশান।
ঘরের অন্ধকারে ভাসছে মিনির সদ্য-ঘুম-ভাঙা মুখ। ফোনের আলোর আভায় ওর মুখটা অলৌকিক দেখাচ্ছে।
‘মিনি—।’
‘জিশান! কী হয়েছে? এত রাতে!’ ঘুম জড়ানো গলায় মিনি বলল। ওর কথায় আশঙ্কা উঁকি মারছে।
‘না, কিছু হয়নি।’
‘না—বলো। তুমি লুকোচ্ছ। প্লিজ বলো—!’
‘না, মিনি—কিচ্ছু না। বিশ্বাস করো।’ একটু চুপ করে থেকে আবার বলল, ‘আসলে তোমাকে ভীষণ ফোন করতে ইচ্ছে করল। দেখতে ইচ্ছে করল। আমি…শুধু-শুধু তোমার ঘুম ভাঙালাম…।’
‘তাতে কী আছে! তোমার ফোন আসতে পারে ভেবে আমি রোজ ফোনটা অন করে বালিশের পাশে রেখে শুই।’
‘আমার এখানে আর ভাল্লাগছে না।’ বাচ্চা ছেলের বায়নার ঢঙে বলল,’আমার কিছু ভাল্লাগছে না।’
‘ভালো লাগবে কেমন করে! নিউ সিটি মোটেই ভালো লাগার জায়গা নয়…সবাই জানে…।’
জিশান আর মিনি কথা বলতে লাগল। ওদের কথা আর ফুরোতে চায় না। কিন্তু বরাদ্দ দশমিনিট ধীরে-ধীরে ফুরিয়ে আসছিল।
জিশান বেশ বুঝতে পারছিল, ওরা দুজনেই কিল গেমের কথা এড়িয়ে যাচ্ছে। যেন ব্যাপারটাকে অস্বীকার করলেই ওটা উধাও হয়ে যাবে।
সময় ফুরিয়ে আসছিল বলে জিশান মিনিকে ওর নাইট সাফারির কথা বলল। বলল পান্ডা আর মূর্তির সাহায্যের কথা। আনমোলের কথা। সিকিওরিটি কন্ট্রোল রুমের অফিসারের কথা।
পান্ডা আর মূর্তির কথা মিনি জিশানের কাছে আগেই শুনেছিল। এখন জানতে পারল, আরও অনেক সিকিওরিটি গার্ড জিশানের ভালো চাইছে। চাইছে জিশান জিতুক।
জিশান এবার বিজ্ঞাপনের কথা বলল। বলল, কীভাবে সিন্ডিকেট ওকে বিপণনের কাজে লাগাচ্ছে।
‘…আমার হাত-পা বাঁধা। কিছু করতে পারছি না। মিনি, আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছে…।’ জিশান কেঁদে ফেলল।
‘হ্যাঁ—জানি, তোমার ভীষণ খারাপ লাগছে। কিন্তু উপায় কী! তোমাকে সহ্য করতেই হবে। প্লিজ, কেঁদো না…।’
জিশান চোখের জল মুছে বলল, ‘এরপর হয়তো ওরা ক্লিপিংস ইউজ না করে আমাকে দিয়ে অ্যাডের শুটিং করাবে। একটা বলির পাঁঠাকে নিয়ে আর কত হেনস্থা করবে ওরা! ওই শয়তানটা…ওই হারামজাদা শ্রীধর পাট্টা…ওকে খতম করতে পারলে…।’
‘শোনো, জিশান!’ ওকে বাধা দিয়ে বলল মিনি, ‘এইসব হেনস্থার জবাব তোমাকে দিতে হবে কিল গেমে।’
