‘কিল গেমে!’ হঠাৎ করে কিল গেমের প্রসঙ্গ সরাসরি উঠে আসায় জিশান অবাক হল। মিনির ছবির দিকে তাকাল।
‘হ্যাঁ। কিল গেমের দিন ঠিক হলে ওই গেম সিটিতেই তোমাকে জবাব দিতে হবে। ওই চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে—।’
চোয়াল শক্ত করল জিশান : ‘হ্যাঁ, তুমি ঠিক বলেছ।’ মাথা নাড়ল : ‘ওই চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই জবাব দিতে হবে।’ একটু থেমে আবার বলল, ‘চব্বিশ ঘণ্টা নয়—তেইশ ঘণ্টা ষাট মিনিটের মধ্যে—।’
‘হ্যাঁ। তুমি…।’
দশ মিনিট ফুরিয়ে গেল। এম.ভি.পি.-র পরদায় মিনির ছবি দপ করে নিভে গেল।
জিশান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ও যেন এতক্ষণ স্বর্গে ছিল—এই মুহূর্তে নরকের অন্ধকূপে খসে পড়ল।
এম.ভি.পি.-টা সুইচ অফ করে বালিশের কাছে ছুড়ে দিল। বল রিমোটের বোতাম টিপে প্লেট টিভি অফ করল। তারপর ঘরের আলোটাও নিভিয়ে দিল।
অন্ধকারে ডুবে গেল ঘর।
জীবন্ত প্রেতের মতো মাথা ঝুঁকিয়ে বসে রইল জিশান। হতাশার স্রোত ওকে আলোয়ানের মতো জড়িয়ে নিচ্ছিল। এবং অন্ধকারে চুপচাপ বসে ও প্রাণপণে তার সঙ্গে লড়াই চালাচ্ছিল।
এভাবে কতক্ষণ কেটে গেছে কে জানে! হঠাৎই টিভির ইনটারঅ্যাকটিভ চ্যানেল দপ করে চালু হয়ে গেল।
আলোর ঝলকানিতে চমকে উঠল জিশান। তাকাল টিভির দিকে।
একজন সুন্দরী মিষ্টি গলায় ওর নাম ধরে ডাকল : ‘জিশান! জিশান!’
মেয়েটি বোধহয় ভেবেছে জিশান ঘুমিয়ে আছে।
আরও দু-একবার ডাকার পর জিশান বিছানা ছেড়ে উঠল। টিভির কাছে গিয়ে বলল, ‘বলো। জেগে আছি।’
হাসল মেয়ে : ‘সরি, জিশান। ডিসটার্ব করছি। তোমাকে আমাদের পিস ফোর্সের মাননীয় মার্শাল ডেকে পাঠিয়েছেন। তুমি রেডি হয়ে নাও। পিস ফোর্সের গার্ডরা ঠিক সাত মিনিট পর তোমাকে নিতে আসবে। থ্যাংক য়ু।’
ইনটারঅ্যাকটিভ চ্যানেল অফ হয়ে গেল। মেয়ে মিলিয়ে গেল।
রিমোটের বোতাম টিপে আলো জ্বালল জিশান। ওয়ার্ডরোবের কাছে গিয়ে পাল্লা খুলল। একটা ছাই রঙা কর্ডের প্যান্ট আর নীল রঙের পোলো নেক টি-শার্ট পরে নিল।
শ্রীধর পাট্টা ওকে ডেকে পাঠিয়েছেন!
কিন্তু কেন?
সাত মিনিট শেষ হতে না হতেই দরজায় কলিংবেল। গার্ডরা এসে গেছে।
দরজা খুলল জিশান। পিস ফোর্সের তিনজন গার্ড। অভিব্যক্তিহীন মুখ। কোমরে শকার—সুইচ অন করা।
না, গার্ডদের একটা মুখও ওর চেনা নয়।
‘চলো—মাননীয় মার্শাল…।’ ওদের একজন বলতে শুরু করেছিল।
‘জানি।’ লোকটাকে থামিয়ে দিয়ে জিশান বলল। এবং ওদের সঙ্গে রওনা হল।
করিডর ধরে যেতে-যেতে জিশান ওদের কাছে বারবার জানতে চাইল, শ্রীধর পাট্টা ওকে কেন ডেকে পাঠিয়েছেন। কিন্তু ওরা কোনও জবাব দিল না।
আরও অনেকবার জিশান একই কথা জিগ্যেস করল। কিন্তু তা সত্বেও কোনও জবাব নেই।
এলিভেটরে করে নামার সময় জিশান ওদের অনুনয় করে বলল, ‘প্লিজ, ভাই! যদি জানা থাকে আমাকে বলো। প্লিজ!’
গার্ডরা নিজেদের মধ্যে একবার মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। তারপর বরফ গলল। ওদের একজন জিগ্যেস করল, ‘তুমি আজ রাতে গেস্টহাউস ছেড়ে বেরিয়েছিলে?’
জিশান কোনও উত্তর দিতে পারল না। হতবাক হয়ে গার্ডের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
আর-একজন গার্ড বলল, ‘তুমি জিপিসি-র ক্যাম্পাস ছেড়ে বেরিয়েছিলে। মনে হয়, শ্রীধর পাট্টা সেটা জানতে পেরেছেন…।’
জিশানের বুকের ভেতর দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নামতে শুরু করল। আবার তা হলে ‘রোলারবল’?
কিন্তু শ্রীধর জানতে পারলেন কেমন করে!
.
১১.
জিপিসির গেস্টহাউস থেকে নীচে নেমে এল জিশান। তিনজন গার্ডের সঙ্গে পা ফেলে এগিয়ে গেল একটা কিউ-মোবাইলের দিকে।
গাড়িতে একজন পাইলট স্টিয়ারিং-এর সামনে বসেছিল। তার পাশে জিশানকে বসিয়ে একজন গার্ড জিশানের বাঁ-পাশ ঘেঁষে বসে পড়ল। আর বাকি দুজন পিছনে। ওরা সবাই গাড়িতে উঠে বসতেই গাড়ির চারটে দরজা বন্ধ হয়ে গেল। গাড়ি চলতে শুরু করল।
জিপিসি-র ক্যাম্পাস ছেড়ে বেরিয়ে কিউ-মোবাইল ছুটে চলল। গাড়ির ড্যাশবোর্ডের ইলেকট্রনিক প্যানেলের দিকে তাকাল জিশান। ডিজিটাল ঘড়িতে দুটো দশ। তার পাশেই বসানো ছোট টিভির পরদায় রক ব্যান্ডের লাইভ শো দেখানো হচ্ছে।
গন্তব্যের খুব কাছাকাছি এসে পড়ার পর জিশান বিল্ডিংটাকে চিনতে পারল : সিন্ডিকেট হেডকোয়ার্টার। এত রাতেও বহুতল বিল্ডিংটার নানান ফ্লোরে আলো জ্বলছে। আগেই জিশান শুনেছিল, এখানে প্রায় সব অফিসেই নাইট শিফটে কাজ হয়।
গাড়ি থেকে নেমে পায়ে হেঁটে সিন্ডিকেট বিল্ডিং-এর দিকে এগোল ওরা।
রাতের বাতাস কেটে শিসের শব্দ শুনতে পেল জিশান। মাথা তুলে ওপরে তাকাল।
দুটো শুটার বাঁক নিয়ে ছুটে গেল আকাশে। বোধহয় রাতে ওরা নিউ সিটির আকাশে টহল দেয়। নজরদারির কাজ করে। হয়তো ওই শুটার থেকেই কোনও টহলদার গার্ড জিশানের নাইট সাফারির কথা জানতে পেরেছে—তারপর শ্রীধর পাট্টাকে খবর দিয়েছে।
বিল্ডিং-এর ভেতরে ঢুকে পড়তেই শীতাতপ পরিবেশে উষ্ণতা বেশ কয়েক ডিগ্রি নেমে গেল। অথচ গ্রানাইট, কাচ, প্লাস্টিক আর স্টেইনলেস স্টিল দিয়ে তৈরি আধুনিকতম সব ঘর আর বারান্দার নকশা। অথচ চারপাশে তাকালে কেমন যেন নিষ্প্রাণ যান্ত্রিক ভাব।
জিশান লক্ষ করল, করিডরে লোক চলাচল দিনের তুলনায় বেশ কম। তবে যে-ক’জন গার্ডকে নজরে পড়ল তারা সকলেই একইরকম স্মার্ট এবং ওদের কোমরে ঝোলানো শকার একইরকম সক্রিয়।
