‘তা ছাড়া নানান ক্লাবের নানারকম বয়েসের লিমিট আছে।’ পান্ডা বলল। আঙুল তুলে ‘ফানডম’-এর নীচের লেখাটা দেখাল: ‘ওই যে…ওইরকম।’
এরপর ”ই-ল্যান্ড”-এর আরও অনেকগুলো বিল্ডিং ঘুরে দেখল ওরা। ট্রান্সপারেন্ট ফাইবারের এসক্যালেটরে চড়ে বহুবার ওপর-নীচ করল। হরেকরকম বিনোদনের পসরা দেখে জিশানের চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছিল। বেশ কয়েকটা দোকানে জায়ান্ট স্ক্রিন টিভিতে নিজেকে দেখতে পেল জিশান। ওকে নিয়ে তৈরি দু-তিনটে বিজ্ঞাপনও দেখল।
আশ্চর্য! এই বিজ্ঞাপনের ব্যাপারটা ও কিছুই জানে না!
পান্ডা আপনমনে বলল, ‘তোমাকে সিন্ডিকেট প্রাইজ মানি দিচ্ছে ঠিকই—কিন্তু সেই টাকা কড়ায়-গন্ডায় উশুল করে নিচ্ছে। তোমাকে নিয়ে ওরা মিডিয়া হাইপ তৈরি করছে। কিল গেমের ব্যাপক পাবলিসিটি করছে—যাতে প্রচুর অ্যাড পাওয়া যায়।’
জিশান চুপ করে রইল। সিন্ডিকেটের অঙ্কটা মনে-মনে বোঝার চেষ্টা করল। বিজ্ঞাপনের শুটিং করতে হবে ওকে! ওকে পাবলিসিটি দিয়ে জনপ্রিয় করে তুলে তারপর ফায়দা তোলার পালা। আর সবশেষে রয়েছে পাঁঠাবলির লাইভ টেলিকাস্ট।
‘ই-ল্যান্ড’ থেকে বেরিয়ে ওরা কিউ-মোবাইলে উঠে আবার রওনা দিল। নানান রাস্তা ঘুরে জিশানের ছোটবেলার বাড়ির কাছে পৌঁছে গেল।
জায়গাটা দেখে জিশানের বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। পুরোনো কিছুই আর নেই। নতুন-নতুন সব বাড়ি-ঘর তার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।
‘এইখানে একটা দোতলা বাড়ি ছিল। সেই বাড়িতে আমি থাকতাম।’ পান্ডার দিকে তাকিয়ে বলল জিশান। মনে-মনে ও ছোটবেলায় ফিরে যাচ্ছিল। ওদের বাড়িটা ঠিক কোন জায়গায় ছিল সেটা আঁচ করার চেষ্টা করছিল।
রোজ ঘুম থেকে উঠে যে-বারান্দাটায় গিয়ে ও দাঁড়াত সেটা কোনদিকে ছিল যেন? সূর্যটা কোনদিক থেকে ওঠে? কোনটা পুবদিক?
আকাশের দিকে তাকাল জিশান। একটুকরো চাঁদ, তারা, আর অন্ধকার। পুবদিক কোনদিকটা হতে পারে সেটা আন্দাজ করে ‘বারান্দা’টা আবার খুঁজল। পেল না।
সবকিছু কেমন গুলিয়ে গিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল জিশান। শুধু বিড়বিড় করে বারবার বলতে লাগল, ‘এইখানে আমাদের বাড়ি ছিল। এইখানে…আমাদের… বাড়ি…ছিল…।’
বাবার ডাক শুনতে পেল জিশান। বাবা ওকে ডাকছে : ‘জিশু! জিশু—!’
জিশান চোখ মুছল। চোয়াল শক্ত করল। পুরোনো মুছে গিয়ে ভালোই হয়েছে। মনে-মনে ভাবল জিশান। পুরোনো সবকিছু থাকলে স্মৃতি ওর চোখের জলে আরও ঢেউ তুলত। ‘পুরোনো’কে ঝাপসা করে দেওয়ার জন্য ‘নতুন’কে ধন্যবাদ জানাল। মনটা আরও শক্ত করতে চাইল।
শহরের আরও অনেক জায়গা ঘুরিয়ে দেখানোর পর কিউ-মোবাইল জিপিসি-র পথ ধরল। এই কয়েকঘণ্টার শহর ভ্রমণে জিশান নিজের অনেক ছবি দেখেছে। বেশ কয়েকটা বিলবোর্ডেও জিশান পালচৌধুরী হাজির। চারিদিকে ওর এত ছবি!
‘ছবি’ হয়ে যাওয়ার আগে এখানে বোধহয় এরকমটাই হয়।
•
গেস্টহাউসে নিজের রুমে ফিরে আসার পর জিশানের খুব ক্লান্ত লাগছিল—তবে চোখে ঘুম আসছিল না। অন্ধকার ঘরে চুপচাপ বিছানায় শুয়ে ছিল। চোখের নজর ঘরের সিলিং-এর দিকে। সেদিকে তাকিয়ে এক অন্ধকার সিনেমার পরদায় ও যেন নিজের জীবনের ছায়াছবি দেখছিল।
গত কয়েকটা মাসে কত ঘটনাই না ঘটে গেছে ওর জীবনে! ওর ওল্ড সিটির বস্তিবাড়িতে শ্রীধর পাট্টা হাজির হওয়ার পর থেকেই শান্ত সুন্দর জীবনটা কেমন বদলে গেল। ওর ওল্ড সিটির হতমান অবস্থার মধ্যে কোনও সৌন্দর্য ছিল না ঠিকই, কিন্তু ওর জীবনের ভেতরে সৌন্দর্য ছিল।
আর এখানে! নিউ সিটির অঙ্গসজ্জায় সৌন্দর্যই প্রথম এবং শেষ কথা। কিন্তু তার গভীরতা শরীরের ত্বক পর্যন্তই। তারপর…ত্বকের গভীরতার পর থেকেই শুরু হয়ে গেছে কুৎসিতের জয়জয়কার। তাই কিল গেমে ‘মৃত্যুপথযাত্রী’ জিশানকে নিয়েও ওরা নির্লজ্জ ব্যাবসা শুরু করে দিয়েছে।
কেন জানি না, জিশান মনে-মনে ভীষণ ভেঙে পড়ছিল। আর কতদিন…আর কতদিন ও কুৎসিতের সঙ্গে এরকম মরিয়া লড়াই চালিয়ে যেতে পারবে?
কিল গেম পর্যন্ত সুপারগেমস কর্পোরেশন জিশানকে নিয়ে চূড়ান্ত ব্যাবসা করবে। তারপর…কিল গেম শেষ হলে…অথবা, জিশান শেষ হলে…ওরা নতুন আর-একজন ‘সুপারহিরো’র সন্ধানে নেমে পড়বে।
কিন্তু ওই তিনটে খুনির সঙ্গে ‘ক্যাট অ্যান্ড মাউস’ গেমে জিশান যদি জিতে যায়!
তা হলে জিশান হয়ে যাবে ‘মেগা সুপারহিরো’। ওকে নিয়ে সিন্ডিকেট আরও কিছুদিন রমরমা ব্যাবসা চালাবে। প্রাইজমানি ছাড়াও ওকে নিউ সিটির একটা ফ্ল্যাট গিফট করবে। আরও সব নানান কোম্পানি ওকে হরেকরকম উপঢৌকন দেবে। তার মধ্যে গাড়ি তো আছেই! তা ছাড়াও থাকবে আধুনিক জীবনযাত্রার নানান সরঞ্জাম।
তখন মিনি আর শানুকে নিয়ে জিশান ওল্ড সিটি ছেড়ে চলে আসতে পারবে। চিরকালের জন্য। দু:খের জগৎ থেকে ওরা তিনজন চলে আসবে সুখের জগতে।
কিন্তু ওল্ড সিটির বাকি মানুষজন? ওরা কি ছন্নছাড়া জীবন আর অভাবের জাঁতাকলে পিষে মরবে?
যতই চিন্তা করছিল ততই জিশানের পাগল-পাগল লাগছিল। ও বিছানায় ছটফট করতে লাগল।
কিছুক্ষণ পর ও বিছানায় উঠে বসল। বল রিমোটের বোতাম টিপে ঘরের আলো জ্বেলে দিল। তারপর দেওয়ালের প্লেট টিভিটার দিকে তাকাল।
জিপিসি-র এই গেস্টহাউসে আসার পর জিশান প্রথম দু-এক সপ্তাহ নানান চ্যানেলের প্রাোগ্রাম দেখেছিল। তারপর থেকে ও গেমস-এর চ্যানেল আর চালায় না। ওইসব চ্যানেল দেখলে ওর মনের ওপর চাপ পড়ে। তাই ও নিয়ম করে দু-চারটে নিউজ চ্যানেল ছাড়া অন্য কোনও চ্যানেল আর দ্যাখে না। আর বেশিরভাগ সময় টিভিটাকে অন-লাইন ইনটারঅ্যাকটিভ মোডে রাখে, যাতে সিন্ডিকেট বা সুপারগেমস কর্পোরেশনের সঙ্গে ওর যোগাযোগ থাকে। এ ছাড়া টিভিটাতে একটা অদ্ভুত ব্যবস্থা আছে—সিন্ডিকেট যখন ওর সঙ্গে যোগাযোগ করতে চায় তখন যদি টিভিটা অফ থাকে তা হলে সেটা নিজে থেকেই অন হয়ে যায় এবং ইনটারঅ্যাকটিভ চ্যানেল চালু হয়ে যায়।
