বিকেলে লনে বসে আছি কর্নেলের সঙ্গে, সেই সময় ডঃ গুন্টাকে ফিরতে দেখলাম। হাসিমুখে সুম্ভাষণ করে বললেন, সেহরাগড় ফরেস্টকে জব্দ করে এলাম, কর্নেল! শখানেক শালগাছ উপড়েছি। একটা বাঘকে ছাতু করে দিয়েছি। একটা দাঁতাল হাতিকে আধমরা করে দিয়েছি। ঠ্যাং ভেঙে পড়ে আছে। আর ফোর্টের অবস্থাটাও দেখে আসুন গিয়ে। একখানা দেওয়ালও আস্ত নেই!
কর্নেল বললেন, কিন্তু আপনার খাওয়া-দাওয়া? চৌকিদারকে আপনার খাবার টেবিলে রাখতে বলেছিলাম। দেখুন তো।
ডঃ গুন্টা বললেন, আরে তাই তো! আমার খিদে পেয়েছে যে! আমি খাব—প্রচুর।
তারপর ধুপধাপ শব্দে মাটি কাঁপিয়ে দৌড়ুলেন। কর্নেল চেঁচিয়ে বললে, মার্থায় ঠোক্কর। লাগবে ডঃ গুন্টা!
ডঃ গুন্টা তক্ষুণি নিচু হয়ে বারান্দায় উঠলেন এবং দরজার তালা খুলে ভেতরে ঢুকলেন। তারপর মিনিট দুই হয়েছে, পর্দা তুলে চৌকিদারকে ডাকতে থাকলেন। চৌকিদার এসে বলল, হুজুর।
এটুকু খানা তুমি আমার জন্য রেখেছ? আমি কি মাছি, না পিঁপড়ে?
চৌকিদার বেজার মুখে বলল, আর তো কিছু নেই হুজুর।
চলো দেখি, তোমার কিচেনে কী আছে।
ডঃ গুন্টা কিচেনের দিকে গেলেন। চৌকিদারও গুটিসুটি পেছনে পেছনে গেল। কিন্তু একটু পরে সে দৌড়ে এল আমাদের কাছে।
হুজুর! হুজুর! উনি আদমি না রাক্ষস? বাপরে বাপ! চাল ময়দা সবজি যা ছিল—সব আস্ত গিলে খাচ্ছেন! একটা ব্যবস্থা আপনারা করুন হুজুর!
ডঃ গুন্টার হাঁক শোনা গেল, চৌকিদার! চৌকিদার!
চৌকিদার চাপা গলায় বলল, দোষ-গলতি মাফ করবেন হুজুর। আমি এখনি ওপরয়ালার কাছে রিপোর্ট করতে চললুম।
বেচারা চৌকিদার প্রায় লেজ তুলে দৌড়ুনোর মতো গেট দিয়ে উধাও হয়ে গেল। তারপর কিচেনের দিক থেকে ডঃ গুন্টা বেরিয়ে এলেন। মুখে একরাশ ময়দা লেগে আছে। বললেন, এ
কী বিচ্ছিরি খিদে বলুন তো কর্নেল! ইচ্ছে করছে, আপনাদেরও খেয়ে ফেলি!
কর্নেল সহাস্যে বললেন, জঙ্গলে গিয়ে হরিণ-টরিণ ধরে খান ডঃ গুন্টা। কী আর করবেন!
ডঃ গুন্টা সঙ্গে সঙ্গে পা বাড়ালেন। আরে তাই তো বটে! বলে মাটি কাপিয়ে বাংলোর প্রাঙ্গণের ধারে উঁচু বেড়া মড়মড় করে ভেঙে বেরিয়ে গেলেন।
উদ্বিগ্ন হয়ে বললাম, কর্নেল! ব্যাপারটা বড় ঘোরালো হয়ে যাচ্ছে! চলুন এখান থেকে চলে যাই আমরা। এ যে সত্যি ঘটোৎকচের কাণ্ড বেধে গেল।
কর্নেল শুধু হাসলেন। আমার কথার কোনও জবাব দিলেন না।
ঘণ্টা দুই পরে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। বাংলোয় বিদ্যুতের আলোর ব্যবস্থা আছে। কিন্তু মশার বড় জ্বালাতন। তাই আমরা ঘরে বসে আছি। ডঃ গুন্টার আর পাত্তা নেই। বলছিলাম, এতক্ষণে হয়তো জঙ্গলের সব হরিণ ওঁর পেটে চলে গেল। এমন সময় জিপের শব্দ হল বাইরে।
দুজন ফরেস্ট অফিসার আর একদল গার্ড হন্তদন্ত এসে গেলেন। রেঞ্জার সায়েব আমার চেনা। হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, কর্নেল। এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটেছে। আপনার পাশের ঘরের সেই লম্বা ভদ্রলোক….
কর্নেল কথা কেড়ে বললেন, বুঝেছি। জঙ্গলে হরিণের পাল সাবাড় করে বেড়াচ্ছেন।
রেঞ্জার বললেন, দুঃখের কথা, আমরা ওঁকে গুলি করে মারতে বাধ্য হয়েছি।
সে কি!
গুলি না করে উপায় ছিল না। উনি একজন ফরেস্ট গার্ডকে আছাড় মেরে খুন করেছেন। সে এক বীভৎস দৃশ্য কর্নেল! লোকটা একেবারে নরদানব কিংকং বললেই চলে।
কর্নেল আস্তে বললেন ঠিকই করেছেন! তা না হলে এবার ভদ্রলোককে আটকানো কঠিন হত। ক্রমশ ওঁর ভেতর একটা ভয়ঙ্কর শক্তি জেগে উঠছিল। এরপর জঙ্গল ছেড়ে হয়তো উনি বসতি এলাকায় গিয়ে ঢুকতেন। তারপর আরও বীভৎস ঘটনা ঘটত।
কথা থামিয়ে কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। চলুন তো, ওঁর ডেডবডিটাকে দেখে আসি।
জিপে চেপে আমরা জঙ্গলের রাস্তা ধরলুম। মাইল দুই এগিয়ে বাঁদিক একখানে আগুন জ্বলতে দেখা গেল। রেঞ্জার বললেন, ওই যে ওখানে। ডেডবডির পাহারায় দুজনকে বসিয়ে রেখে এসেছি।
কাঠকুটো জ্বেলে লোক দুটো আসলে ভয় তাড়ানোর চেষ্টা করছিল। আমাদের দেখে সাহস ফিরে পেল। তারা বন দফতরেরই কর্মী। একজনের হাতে একটা বন্দুক, অন্যজনের হাতে নিছক বল্লম। মুখে প্রচণ্ড আতঙ্কের ছাপ লেগে আছে। একটু তফাতে দলাপাকানো রক্তাক্ত একটা লাশ পড়ে ছিল। রেঞ্জার টর্চের আলোয় সেটা দেখিয়ে বললে, এটা ফরেস্টগার্ড মনি সিংয়ের ডেডবডি। কী অবস্থা হয়েছে দেখুন।
কর্নেল বললেন, ডঃ গুন্টার ডেডবডি কোথায়?
রেঞ্জার পা বাড়িয়ে বললেন, আসুন, দেখাচ্ছি।
জায়গাটা খোলামেলা। একটু এগিয়ে টর্চের আলোয় একটা ছোট্ট নদী দেখা গেল। বালি আর পাথরে ভর্তি। রেঞ্জার অবাক হয়ে বলেন, সর্বনাশ! ডেডবডিটা কোথায় গেল? জানোয়ারে নিয়ে গেল না তো?
বালির ওপর একটু রক্তের ছাপ চোখে পড়ল। কর্নেল টর্চের আলোয় খুঁটিয়ে জায়গাটা দেখে বলেন, নাঃ। টেনে নিয়ে যাওয়ার কোনও চিহ্ন নেই। কিন্তু….আশ্চর্য তো!
কী কর্নেল?
মনে হচ্ছে, ডঃ গুন্টা মারা যাননি। দিব্যি পায়ে হেঁটে চলে গেছেন।
অসম্ভব! গুলি করার পর আমরা ওঁকে পরীক্ষা করে দেখেছিলুম। দেহে প্রাণ ছিল না। দুটো গুলিই হার্টে লেগেছিল।
যে দুটি লোক পাহারায় ছিল, তাদের একজন বলল, কী একটা শব্দ শুনেছিলুম কিছুক্ষণ আগে। টর্চ জ্বেলে কিন্তু কিছু দেখতে পাইনি।
অন্য লোকটি বলল, আমি ভেবেছিলুম কোনও জানোয়ার।
রেঞ্জার তাদের খুব বকাবকি করলেন। তারা আমতা-আমতা করছিল। বুঝতে পারছিলুম, ওদের বকাবকি করা বৃথা। বেচারারা ভয়ে আধমরা হয়ে বসে ছিল। যদি দেখত, ডঃ গুন্টার মড়া হেঁটে যাচ্ছে, তাদের ভিরমি খেয়ে পড়ে থাকতে হত।
