কর্নেল পায়ের ছাপ অনুসরণ করে নদীর ওপার পর্যন্ত গেলেন। আমরাও ওঁর সঙ্গে গেলুম। কিন্তু তারপর কঠিন পাথুরে মাটিতে আর কোনও ছাপ দেখা গেল না। কর্নেল উদ্বিগ্ন মুখে বললেন, সেহরাগড় টাউনশিপের লোকেদের ভাগ্যে কী আছে কে জানে! আমার মনে হচ্ছে, ব্যাপারটা অনেকদূর গড়াবে।…
ফরেস্ট বংলোয় ফিরে এ রাতে আর অন্ধকার বনভূমির সৌন্দর্য দেখার মন ছিল না। তাছাড়া মশার খুব উৎপাত সে কথা আগেই বলেছি।
অনেক রাত পর্যন্ত জেগে কাটাচ্ছিলুম। কর্নেলের নাক ডাকছিল যথারীতি! এক সময় হঠাৎ বাইরে কী একটা ধাক্কার শব্দ হল। অমনি কর্নেলের নাক ডাকাও থেমে গেল। ওঁর ঘুম বরাবর এমনি পাতলা। ওদিকে পাশের ঘরে কেউ যেন চুপিচুপি তালা খুলছে। তারপর টেবিল বাতিটা জ্বলে উঠল। ফিসফিস করে বললুম, কর্নেল! পাশের ঘরে কে যেন ঢুকল।
কর্নেলও ফিসফিস করে বললেন, চুপ!
উনি বারান্দার দিকের জানালার পর্দা তুলে উঁকি দিলেন। আমিও ওঁর কাছে গিয়ে উঁকি দিলুম। বারান্দায় আলো আছে। একটু পরে শিউরে উঠে দেখি, পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন স্বয়ং ডঃ আর পি গুন্টা। হাতে একটা প্রকাণ্ড সুটকেস। পোশাকে ধুলো-ময়লা আর চাপচাপ রক্ত লেগে আছে। বারান্দা থেকে নেমে এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে চলে গেলেন।
কর্নেল বললেন, যাক গে। এবার নিশ্চিতে ঘুমোনো যাবে।
বললুম, রহস্যটা কিন্তু শেষ পর্যন্ত রহস্যই থেকে গেল, কর্নেল!
কর্নেল একটু হাসলেন। তা ঠিক। তবে যা আশঙ্কা করেছিলুম, সম্ভবত তত কিছু ঘটবে না। কারণ ফ্রাংকেনস্টাইনের সেই দানব শেষ পর্যন্ত দানবই থেকে গিয়েছিল। কিন্তু ডঃ গুন্টাকে দেখলুম, দিব্যি ভদ্রলোকের মতো নিজের জিনিসপত্র নিতে এসেছিলেন। তার মানে, সুবুদ্ধির উদয় হয়েছে ওঁর এবং ঘরের ছেলে ঘরে ফেরাই সাব্যস্ত করেছেন।..
পরদিন আমরা জঙ্গল থেকে সেহরাগড় টাউনশিপে ফিরে গেলুম। তারপর সেখান থেকে বাসে চেপে ফৈজাবাদ। কলকাতা ফেরার ট্রেন রাত বারোটা নাগাদ। একটা হোটেলে খাওয়া-দাওয়া সেরে কর্নেল হঠাৎ বললেন, চলো জয়ন্ত, ডঃ গুন্টার খোঁজখবর নিয়ে আসি! অবাক হয়ে বললুম, সর্বনাশ! উনি কি ফৈজাবাদের লোক নাকি?
বাংলোর খাতায় সেই ঠিকানাই তো জেনেছি।
কিন্তু…
কর্নেল আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, আমার ধারণা, ডঃ গুন্টা এখন আর নরদানব বা ঘটোৎকচ হয়ে নেই। কাজেই ওঁকে ভয় পাওয়ারও কিছু নেই। হয়তো ভুলটা আমারই। আমি ওঁকে সচেতন করে দেওয়াতে ওইসব বীভৎস ঘটনা ঘটেছে। তোমাকে সেই পাগলের গল্পটা বলেছিলুম, আশাকরি মনে আছে। কোনও কারণে মানুষের মধ্যে অস্বাভবিকতা এলে তাকে উত্যক্ত করা উচিত নয়।
রাত তখন প্রায় নটা। কিন্তু ফৈজাবাদ ছোট্ট শহর! ডঃ গুন্টাকে সবাই চেনে—সেটা উনি লম্বা মানুষ বলেই! শেষদিকে একটা টিলার গায়ে একটা পুরনো গড়নের বাড়ি। টাঙ্গাওয়ালা গেটের কাছে নামিয়ে দিল আমাদের। লন পেরিয়ে যাওয়ার সময় মনে হচ্ছিল, বাড়িতে যেন জনমানুষ নেই। অস্বাভাবিক স্তব্ধ পরিবেশ। তবে আলো দেখা যাচ্ছিল একটা ঘরে।
দরজার বোতাম টেপার বেশ কিছুক্ষণ পরে দরজা খুলল। সেই অস্বাভাবিক ঢ্যাঙা মানুষ, চেনা মুখ, অমায়িক হেসে বললেন, কোখেকে আসছেন আপনারা?
আমি তো অবাক। কর্নেল নমস্কার করে বললেন, আপাতত আসছি সেহরাগড় থেকে। আপনার সঙ্গে কিছু জরুরি কথা আছে, ডঃ গুন্টা।
ডঃ গুন্টা ভুরু কুঁচকে কী স্মরণ করার চেষ্টা করে বললেন, সেহরাগড়? সেখানে তো একটা জঙ্গল আছে শুনেছি। যাক্ গে, ভেতরে আসুন।
ভেতরে ঢুকে আমরা বসলুম! ডঃ গুন্টাও বসলেন। ওঁর মুখে বিস্ময় লক্ষ্য করছিলুম! কর্নেল বললেন, ডঃ গুন্টা, আপনার প্রোজেক্ট যে সাকসেসফুল সেই কথাটা বলতে এসেছি–যদিও দেশের আইনে আপনি অপরাধী সাব্যস্ত হয়েছেন!
ডঃ গুন্টা চমকে উঠলেন। কী বলছেন, ঠিক বুঝতে পারছি না।
হ্যাঁ। এক ডজন হরিণ, একটা বাঘ আর একজন ফরেস্ট গার্ডকে আপনার ফ্যান্টম প্রতিমূর্তি খুন করে ফেলেছে। অসংখ্য গাছ উপড়ে ফেলেছে! সেহরাগড় কেল্লাটা ভাঙচুর করেছে। এমনকী, একটা দাঁতাল হাতিকেও মারাত্মক জখম করেছে।
ডঃ গুন্টা দুহাতে মুখ ঢেকে বসে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর ভাঙা গলায় বললেন, কিন্তু আমার তো কিছু মনে পড়ছে না।
কিন্তু আপনি একজন বায়ো-ফিজিসিস্ট। আপনি জানতেন আপনার ফ্যান্টমপ্রোজেক্টের পরিণতি সাংঘাতিক হতে পারে।
ডঃ গুন্টা উঠে দাঁড়িয়ে আস্তে বললেন, বিশ্বাস করুন, মাসতিনেক আগে হঠাৎ আমার উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার পর কী কী ঘটেছে, এখন একটুও মনে নেই।
আইন কিন্তু আপনাকে ছেড়ে দেবে না ডঃ গুন্টা।
ডঃ গুন্টা হঠাৎ সবেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। তারপর ঝনঝন দুমদাম প্রচণ্ড শব্দ শোনা গেল। উদ্বিগ্ন হয়ে বললুম, কী ব্যাপার কর্নেল?
কর্নেল হাসলেন, ল্যাবরেটরি ভাঙছেন! প্রমাণ লোপের চেষ্টা। যাই হোক, আর এখানে থাকা নিরাপদ নয়, জয়ন্ত। চলো, আমরা কেটে পড়ি।
স্টেশনে পৌঁছে বললুম, ফ্যান্টম প্রতিমূর্তি ব্যাপারটা কী, খুলে বলুন তো?
কর্নেল বললেন, প্রতিবস্তুর কথা নিশ্চয় শুনেছ, মানুষের ব্যক্তিসত্তার তেমনি কোনও প্রতিরূপ আছে কি না, এ নিয়ে বায়োফিজিসিস্ট গবেষণা করেছেন। কতকটা ডঃ জেকিল এবং মিঃ হাইডের ব্যাপারটা যেমন। তবে ওই প্রতিরূপ ফ্যান্টম অস্তিত্ব কোনও মানুষের স্বাভাবিক চরিত্রে একেবারে উল্টো না হতেও পারে। আমাদের মধ্যে একটা করে প্রতি-মানুষ আছে। সে অসম্ভব শক্তিমান। তাকে দিয়ে যেমন ভাল কাজ করানো যায়, তেমনি খারাপ কাজও করানো যায়। কাজেই ওই ফ্যান্টম প্রতিমূর্তিকে তুমি ঘটোৎকচ বলতেও পারো। ভুলে যেও না মহাভারতের ঘটোৎকচ। একজন মানুষ ছাড়া কিছু নয়। তবে অতিমানুষ। তাকে জাগালে ভাল বা মন্দ, দুই-ই ঘটতে পারে।
