কপালে অনেক কালো ছোপ দেখে সমস্যাটা হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। বললাম, আপনার এই দৈর্ঘ্যের সঙ্গে প্রস্থটাও যদি বাড়ত, তাহলে লোকেরা আপনাকে ভয়ও পেত।
ডঃ গুন্টা বললেন, রক্ষে করুন মশাই। তাহলে লোকেরা আমাকে ঘটোৎকচ বলতে শুরু করত। কী বলে কর্নেল?
কর্নেল চোখ বুজে সাদা দাড়ি টানাটানি করছিলেন। বললেন, আচ্ছা ডঃ গুন্টা, কবে থেকে আপনি লম্বা হতে শুরু করেছেন?
ডঃ গুন্টা কর্নেলের কথায় অবাক হলেন যেন। তা তো লক্ষ্য করিনি। তবে যতদূর মনে পড়ছে, মাস তিনেক আগে একদিন ভোরবেলা বাথরুমে ঢুকতে গিয়ে চৌকাঠে ঠোক্কর লাগল মাথায়। তখন…মাই গুডনেস!
উনি আরামকেদারা থেকে সোজা হলেন হঠাৎ। কর্নেল বললেন, কী ব্যাপার?
আমার মতো বোকা দেখছি পৃথিবীতে নেই। ডঃ গুন্টা মুখে হতাশার ভাব ফুটিয়ে বললেন, কী আশ্চর্য! সত্যি তো ব্যাপারটা ভেবে দেখা উচিত ছিল আমার। ওই প্রথম মাথায় ঠোক্কর খাওয়ার আগের দিন সম্ভবত আমার উচ্চতা প্রায় স্বাভাবিক ছিল।…হ্যাঁ, স্বাভাবিক ছিল কারণ তার আগে তো বাথরুম কেন, কোনও ঘরের দরজার সামনে আমাকে মাথা হেঁট করতে হয়নি। কর্নেল, এই ব্যাপারটা আমার লক্ষ্য করতে ভুল হয়ে গেছে দেখছি।
কর্নেল ওঁকে যেন আশ্বস্ত করতে চেয়েই বললে, পৃথিবীর অধিকাংশ বিজ্ঞ মানুষই নিজের সম্পর্কে অসচেতন। ও নিয়ে দুঃখ করার কিছু নেই। পিটুইটারি গ্ল্যান্ডের একটা হেরফের ঘটলে মানুষ বামন কিংবা দৈত্য হয়ে ওঠে। শুধু তাই নয়, তাদের গায়ে প্রচণ্ড শক্তিও এসে যায়।
ডঃ গুন্টা আস্তে বললেন, তা ঠিক। কিন্তু আমার বয়স প্রায় পঞ্চান্ন হয়ে এল। এই বয়সে হঠাৎ আমার পিটুইটারি গ্ল্যান্ড কেন এ খেল দেখাল বোঝা যাচ্ছে না। অবশ্য আমি অনেকের তুলনায় একটু লম্বা ছিলাম ছেলেবেলা থেকেই। হঠাৎ একটা যেন দুর্ঘটনা ঘটল। আমি রাতারাতি শত ফুট উঁচু হলাম। অথচ খেয়াল পর্যন্ত করলাম না। কর্নেল, ব্যাপারটা ভারি গোলমেলে মনে হচ্ছে। আমি যাই।
উনি হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন। তারপর দরজা দিয়ে মাথা যতদূর সম্ভব নিচু করে বেরিয়ে গেলেন! কর্নেল তাকিয়ে রইলেন অবাক চোখে। আমিও।
ডঃ গুন্টা উঠেছিলেন পাশের ঘরে। কিছুক্ষণ পরে বেরিয়ে সে ঘরের দরজায় তালাবন্ধ দেখলাম। বললাম, কর্নেল, ডঃ গুন্টা কি বাংলো ছেড়ে চলে গেলেন নাকি?
এই বাংলোটা একেবারে সংরক্ষিত জঙ্গলের ভেতর একটা টিলার গায়ে! নিচে ছোট্ট এক নদী। কাঠের সাঁকো পেরিয়ে বন-জঙ্গল শুরু। দুর্গে পৌঁছুতে ঘন্টাখানেক লাগল।
কিন্তু যা ভেবেছিলাম, তাই ঘটল! প্রকৃতিবিদ দুর্গের ওপর থেকে বাইনোকুলারে কী পাখি দেখতে পেয়ে আমার অস্তিত্ব ভুলে গেলেন এবং ধ্বংসাবশেষের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেলেন। দেয়ালের ওপর বসে আমি নিচের জঙ্গলের শোভা দেখতে থাকলাম।
কতক্ষণ পরে পেছনে কী একটা শব্দে চমকে উঠে দেখি, ডঃ গুন্টা একটা প্রকাণ্ড পাথর ধরে টানাটানি করছেন। আমি ভীষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম।
ডঃ গুন্টা চাপা হুঙ্কার দিয়ে এক ঝটকায় বিশাল পাথরটা দুহাতে শূন্যে তুললেন। তারপর সেটা নিচে ছুড়ে ফেললেন। নিচে বিকটা শব্দ করে পাথরটা পড়ল এবং গড়াতে গড়াতে চলল। ডঃ গুন্টা হাত নাড়তে নাড়তে হাসিমুখে তাকালেন আমার দিকে। মুখের চেহারায় কেমন অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করে আমার অস্বস্তি হল। বললাম, ডঃ গুন্টা। আপনি দেখছি সুপারম্যানও বটে!
ডঃ গুন্টা আমার কাছে এগিয়ে এসে সহাস্যে বললেন, মিঃ চৌধুরি, আমার ইচ্ছে করছে আপনাকে তুলে দূরে ছুড়ে ফেলি!
আঁতকে উঠে বললাম, সে কী! না—না। দয়া করে ইচ্ছেটা একটু সামলে রাখুন মশাই!
আমাকে ঘটোৎকচই মনে হচ্ছে না আপনার?
হচ্ছে। খুব হচ্ছে। আপনি ঘটোৎকচই বটে।
ডঃ গুন্টা ফিকফিক করে হাসতে হাসতে বললেন, খুব ভয় পেয়েছেন মনে হচ্ছে?
পেয়েছি বৈকি! আপনি অমন প্রকাণ্ড পাথরটা যেভাবে ছুড়ে ফেললেন!
আরও শক্তি দেখবেন নাকি? বলে ডঃ গুন্টা দুর্গের উঁচু পাঁচিলটার দিকে এগিয়ে গেলেন। তারপর দুহাতে ঠেলতে শুরু করলেন। প্রকাণ্ড পাঁচিলটা সশব্দে ভেঙে পড়ল।
আমি এত ভয় পেয়ে গেছি যে পালিয়ে যাওয়ার জন্য এদিক-ওদিক তাকিয়ে নিরাপদ পথ খুঁজছি। ডঃ গুন্টা ফটকের পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন আগের মতো দুহাতের ধুলো ময়লা ঝাড়তে ব্যস্ত। মুখে তৃপ্তির হাসি—কিন্তু কেমন অস্বাভাবিকতাও ফুটে আছে।
হঠাৎ উনি ফের চাপা হুঙ্কার দিয়ে লাফ মারলেন এবং ওই লাফে অন্তত ফুট বিশেক উঁচু ফটকের মাথায় পৌঁছে গেলেন।
অমনি আমি নিচু পাঁচিলের ভাঙা অংশটা পেরিয়ে নামতে শুরু করলাম। এদিকটা ঢালু হয়ে নেমে গেছে। অজস্র পাথর আর ঝোপজঙ্গলে ভর্তি। ভাগ্যিস নিচের গভীর গড়খাইটা শুকনো ছিল। হাঁচড়-পাঁচড় করে ওপারে উঠতেই প্রকৃতিবিদের দেখা পেলাম। রুদ্ধশ্বাসে বললাম, ডঃ গুন্টা সুপারম্যান হয়ে গেছেন! কী সব সাংঘাতিক কাণ্ড শুরু করেছেন, দেখলে বুদ্ধিসুদ্ধি ঘুলিয়ে যাবে!
কর্নেল কিন্তু হাসছিলেন। বললেন, এখান থেকে বাইনোকুলারে আগাগোড়া সবটাই আমি দেখেছি ডার্লিং! তবে ডঃ গুন্টাকে তোমার ভয় পাওয়ার কিছু নেই!
নেই মানে? আমাকে ছুড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে বলেছিলেন!
কর্নেল পা বাড়িয়ে বললেন, সেই গল্পটা জানো তো? এক এক পাগল যাচ্ছেতাই পাগলামি শুরু করেছে। একটা লোক যেই বলেছে, ওরে! দেখিস যেন ঢিল ছোড়ে না— অমনি পাগল বলে উঠল, বাঃ! মনে পড়িয়ে দিয়েছে রে! বলে, সে তখন ঢিল ছুড়তে লাগল। ডঃ গুন্টাকে আমরা হয়তো ওইরকম মনে পড়িয়ে দিয়েছি। যাই হোক, এস-বাংলোয় ফেরা যাক।..
