কালো কুকুরটার পাশ দিয়ে ভয়ে-ভয়ে এগিয়ে ওঁকে অনুসরণ করলুম। পাশের ঘরে ঢুকলে উনি দরজাটা এঁটে দিলেন। অস্বস্তিটা বেড়ে গেল। বৃদ্ধ এ-ঘরের জানালা দুটো খুলে দিয়ে বললেন, এবার একে দেখুন।
যা দেখলুম, আতঙ্কে আমার মাথা ঘুরে উঠল। তেমনি বেদির ওপর দাঁড়িয়ে আছে একটা লোক—পরনে প্যান্ট-শার্ট, পায়ে জাঙ্গলবুট আমারই মতো, হাতে একটা মাছধরা ছিপ এবং কাঁধে কিটব্যাগ। একেবারে জ্যান্ত দেখাচ্ছে তাকে। নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে আছে, ঠোঁটে একটু হাসি।
আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, সর্বনাশ!
সর্বনাশ কিসের? বৃদ্ধ চোখ কটমট করে বললেন। মানুষ মরণশীল। তার শরীর একদিন গলে পচে নষ্ট হয়ে যায় প্রাকৃতিক নিয়মে। হিন্দুরা অবশ্য চিতার আগুনে পুড়িয়ে ফেলে। এই লোকটার শরীরও ধ্বংস হয়ে যেত। অথচ ওকে আমি অমরত্ব দিয়েছি। কখনও-সখনও ওর ছিপ ফেলা নেশার কথা বিবেচনা করে ওকে ঝিলে ছিপ ফেলতে যেতেও অনুমতি দিই। যাই ভাবো। আমাকে, আমি কিন্তু এসব ব্যাপারে খুব উদার।
ভয়ে-ভয়ে সায় দিলুম। আজ্ঞে হ্যাঁ। তা তো বটেই।
বৃদ্ধ হঠাৎ হাত বাড়িয়ে খপ করে আমার হাত ধরে চাপা গলায় বললেন, তুমি অমরত্ব চাও না?
আঁতকে উঠে হাত ছাড়াবার চেষ্টা করে বললুম, না, না! হাত ছাড়ুন আপনি।
বৃদ্ধের গায়ে প্রচণ্ড জোর। আর হাতটাও কী ভীষণ ঠাণ্ডাহিম! রক্ত জমে যাচ্ছিল। খিকখিক করে হাসতে হাসতে বললেন, তেমন কিছু যন্ত্রণা হবে না। জাস্ট একটু মাথা ঘুরবে। গয়ে মলম মাখিয়ে দিয়ে চামড়াটা ছাড়িয়ে নেব। তারপর তোমার চামড়ার ভেতরে কাঠের গুঁড়ো, তুলো, স্পঞ্জ ঠেসে দেব। ব্যস! অমর হয়ে যাবে।
বলে কী! আমার জ্যান্ত শরীরের চামড়া ছাড়িয়ে নেবে আর তেমন কিছু যন্ত্রণা হবে না! প্রচণ্ড আপত্তি জানিয়ে বললুম, আমি অমর হতে চাইনে। হাত ছেড়ে দিন।
বৃদ্ধের চোখ দুটো জ্বলে উঠল। দেখো বাপু, তোমার এমন সুন্দর চামড়ায় খুঁত হবে বলে ছুরির খোঁচা মারছিনে। এর আগে এমনি করে গোটাতিনেক চামড়া নষ্ট করেছি। বরবাদ হয়ে গেছে। এক্সপেরিমেন্ট। জনার্দন বক্সির এক কথা। নড়লেই খোঁচা খাবে। যাও, টেবিলে শুয়ে পড়ো লক্ষ্মী ছেলের মতো।
তাহলে এই পাগলা ট্যাক্সিডার্মিস্টের নাম জনার্দন বক্সি? কাকুতি-মিনতি করে বললুম, প্লিজ জনার্দনবাবু! আমাকে ছেড়ে দিন। আপনার এক্সপেরিমেন্ট তত সফল হয়েছে। আর কেন?
জনার্দন বক্সি খিকখিক করে হেসে বললেন, আহা ভয় নেই। ভয় নেই। টেরই পাবে না। তারপর সম্ভবত মলমের বোতল আনতে যেই ঘুরেছেন এবং হাতটা একটু আলগাও হয়েছে, এক ধাক্কায় ছাড়িয়ে নিয়ে দরজা খুলে একলাফে পাশের ঘরে গিয়ে পড়লুম। তারপর একেবারে বাইরে।
ভূতুড়ে চামচিকেগুলো হামলা করল আবার। পেছনে সেই কালো কুকুরটাও গর্জে তেড়ে এল কোখেকে। আমি চোখ বুজে নাক-বরাবর দৌড় দিলুম। কিছুটা এগিয়ে একটা গাছের শেকড়ে ঠোক্কর খেয়ে পড়তেই কুকুরটা আমাকে বাগে পেল। বিকট গর্জন করে ঝাপ দিল সে। সেই সঙ্গে যেন আকাশ ফাটানো একটা শব্দও কানে এল।
ভয়ের চোটে অজ্ঞান হয়ে গেলুম সেই মুহূর্তে!…
যখন জ্ঞান হল, তাকিয়ে দেখি বাংলোয় শুয়ে আছি। আলো জ্বলছে। বিছানার পাশে বসে আছেন আমার বৃদ্ধ বন্ধু। একটু হেসে বললেন, আশা করি সুস্থ হয়েছ ডার্লিং! না—না, অমন করে চারপাশে তাকিয়ে দেখার কিছু নেই। জনার্দন বক্সির কালো অ্যালসেশিয়ানটাকে বাধ্য হয়ে গুলি করে মেরেছি।
অবাক হয়ে বললুম, কিন্তু ওটা তো সত্যিসত্যি ভূত অথবা পিশাচ! কারণ বক্সিবাবু ওর মরা দেহটা স্টাফ করে রেখেছেন দেখেছি।
বক্সির দুটো কুকুর ছিল। দেখতে একই রকম। কোনও কারণে একটা কুকুর মারা পড়লে তাকে সে স্টাফ করে রেখেছিল। আর দ্বিতীয় কুকুরটাকে সে মানুষের মাংস খাওয়ানো শিখিয়েছিল। চামড়া ছাড়িয়ে মাংসগুলো খেতে দিত।
কিন্তু চামচিকেগুলো?
কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, কিছু চামচিকে মেরে বক্সিবাবু স্টাফ করে রেখেছিল বটে। তবে তোমার ওপর হামলা করেছিল যারা, তার ভূত নয়। জ্যান্ত চামচিকে। তাদেরও সে মানুষের মাংস খাওয়ানো শেখাত। যাই হোক, তোমার মাংস খুবলে নিতে পারেনি ওরা। খুব লাফালাফি করেছিলে কি না।
ওই পাগলা খুনিটাকে ধরিয়ে দিন এবার পুলিশের হাতে!
দিয়েছি। এতক্ষণ সে থানার লক-আপে। বলে কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। টেবিল থেকে এক গ্লাস গরম দুধ এনে বললেন, খেয়ে নাও ডার্লিং! গায়ে জোর পাবে। কাল সকালে আবার গিয়ে ঝিলে ছিপ ফেলতে আশা করি আর ভয় পাবে না। আমার ধারণা, ঝিলের মাছগুলো বেশ বড়োই।
১.১৫ ঘটোৎকচের জাগরণ
সেহরাগড় ফরেস্ট বাংলোয় ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। নাম ডক্টর আর পি গুন্টা। তিনি এক বিস্ময়কর মানুষ!
প্রথমে চোখে পড়েছিল ওঁর অস্বাভাবিক দৈর্ঘ্য! অত লম্বা মানুষ গিনেস রেকর্ড বইতেও উল্লিখিত হননি বলে আমার বৃদ্ধ বন্ধু আক্ষেপ করেছিলেন। তাই শুনে ডাঃ গুন্টা হাসতে হাসতে বলেন, কী দরকার? আসলে কী জানেন, নিজের এই লম্বা হওয়া নিয়ে আমার নিজেরই ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে। রাস্তাঘাটে বেরুলে সাড়া পড়ে যায়। যেখানে যাই, পেছনে ভিড়। তার ওপর সমস্যা হল, দরজার মাপ। কোনও বাড়িতে ঢুকতে হলে প্রতি মুহূর্তে আমাকে নিজের উচ্চতা সম্পর্কে সচেতন থাকতে হচ্ছে। আবার অনেক সময় মনেও থাকে না কথাটা এবং মাথায় ঠোক্কর খাই। এই দেখুন না, কী অবস্থা হয়েছে।
