কুকুরটা পিছিয়ে গেল। তারপর পালাতে থাকল। কিন্তু রাগে আমার তখন মাথার ঠিক নেই। ওর মাথাটা রডের বাড়ি মেরে দু ফাঁক না করে ফিরছি না—যা থাকে বরাতে। উঁচু-নিচু গাছপালা, কাটাঝোপ, তারপর চষা খেত, ঘাসে ঢাকা খোলামেলা পোড়ো জমি পেরিয়ে প্রাণীটা ছুটে চলেছে। আমিও ছুটে যাচ্ছি। মাঝে-মাঝে সে পেছনে ঘুরে যেন আমাকে দেখে নিচ্ছে ক্রুর এবং মুখভঙ্গি করে গর্জাচ্ছে। কাঁটায় আমার প্যান্টশার্ট ততক্ষণে ফর্দাফাঁই অবস্থা। জুতোয় জলকাদা লেগেছে প্রচুর। একখানে শুকনো লতাপাতায় জড়িয়ে আছাড়ও খেলুম। তারপর মনে হল, কে আমার নাম ধরে ডাকছে, জয়ন্ত! জয়ন্ত! সম্ভবত কর্নেল ব্যাপারটা দেখতে পেয়েছেন। আমি কান করলুম না। কালো কুকুরটা মিটার-পঁচিশেক দূরত্বে আমার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে আছে। তেমনি রক্তমাখা মুখ। কুতকুতে জ্বলন্ত চোখ। জিভ থেকে ফোঁটা-ফোটা যেন রক্ত ঝরছে। আবার হুংকার দিয়ে দৌড়লুম। পিশাচ হোক, আর যাই হোক, আজ ওর একদিন কি আমার একদিন।
গাছপালার ফাঁক দিয়ে রেললাইন দেখা যাচ্ছিল। সামনে ভাঙাচোরা একটা বাড়িও দেখতে পেলুম। তাহলে বোধ করি রোশনিবাগ স্টেশন-বাজারের পেছনদিকটায় এসে পড়েছি।
কালো কুকুরটা বাড়িটার কাছে গিয়ে অদৃশ্য হল। বাড়িটার কাছে যেই এসেছি, এক অদ্ভুত কাণ্ড শুরু হল। আচমকা চারদিক থেকে কারা আমাকে খুদে হাতে যাচ্ছেতাই চিমটি কাটতে থাকল। চোখ বুজে কুঁজো হয়েছিলুম, তারপর রডটা তুলে বাঁইবাই করে ঘোরাতে-ঘোরাতে চোখ খুলে দেখি, একঝাঁক চামচিকের পাল্লায় পড়েছি। চামচিকে যে এমন চিমটি কাটতে জানে, কে জানত! দ্বিগুণ জোরে রডটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চামচিকেগুলো ভাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলুম। কিন্তু খুদে জীবগুলো সমানে হামলা চালিয়ে যেতে থাকল। তখন হার মেনে দৌড়ে গিয়ে সামনের ভাঙা ঘরটার ভেতর ঢুকে পড়লুম।
চামচিকের ঝাঁকটা সেখানেও ঢুকে হামলা করল। বাড়িটার কোনও ঘরে দরজা-জানলা বলতে কিছু নেই। সব কারা হয়তো খুলে নিয়ে গেছে। এঘর থেকে ওঘর, তারপর আরেকটা ঘর—কোনও ঘরের ভেতর জঙ্গল গজিয়েছে এবং ছাদ ভাঙা, কড়িকাঠ ঝুলে রয়েছে। শেষে যে ঘরটার সামনে গেলুম, তার দরজা আস্ত আছে। দরজাটা খোলা। ভেতরে আসবাবপত্র দেখা যাচ্ছিল। হাঁফাতে হাঁফাতে সে-ঘরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিলুম।
তারপর ঘুরে দেখি, ঢ্যাঙা-শুটকো চেহারার এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন খাটের পাশে এবং আমার দিকে কেমন চোখে তাকিয়ে আছেন, ঠোঁটের কোনায় হাসিটাও যেন অস্বস্তিকর। ভদ্রলোকের পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি, হাতের আঙুলে কয়েকটা পলাবসানো আংটি। একমাথা সাদা চুল।
কিন্তু তার চেয়ে অস্বস্তিকর, ওঁর হাতে একটা চকচকে ছুরি।
আমি কিছু বলার আগেই উনি ঘড়ঘড়ে গলায় বললেন রডটা দেখি। তারপর আমার কাছে এসে হাত থেকে রডটা প্রায় ছিনিয়ে নিলেন। পাগল নয় তো? আমি একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেলুম। উনি রডটা জানলা গলিয়ে ছুড়ে ফেললেন। কিন্তু ঠোঁটের কোনায় সেই হাসিটা লেগে আছে। চেহারায় কেমন ঠাণ্ডা হিংসার ছাপ। ভয়ে-ভয়ে এবং অপ্রস্তুত মুখে বললুম, আপনার ঘরে ঢুকে পড়ার জন্য ক্ষমা করবেন। চামচিকের পাল্লায় পড়ে…
কথা কেড়ে ভদ্রলোক খিকখিক করে হেসে বললেন, খুব জ্বালিয়েছে বুঝি? তা ওদের পাল্লায় পড়লেন কীভাবে?
একটা কালো কুকুর তাড়া করে আনছিলুম। ঝিলে ছিপ ফেলে বসে ছিলুম। কোখেকে ওই কুকুরটা গিয়ে ঝামেলা করছিল।
ভদ্রলোক ওপাশে ঘুরে বললেন, দেখুন তো এই কুকুরটা নাকি।
দেখেই চমকে উঠলুম। এতক্ষণে চোখের দৃষ্টি পরিষ্কার হয়েছে। ঘরটা বেশ বড়। কোনার দিকে একটা বেদির-মতো উঁচু জায়গায় সেই সাংঘাতিক চেহারার কালো কুকুরটা দাঁড়িয়ে আছে চারপায়ে। সেই হিংস্র মুখভঙ্গি। রক্তলাল হাঁ-করা মুখ। ধারালো দাঁত আর লকলকে জিভ।
কিন্তু আশ্চর্য, কুকুরটা মমির মতো স্থির। শুধু তার হিংসুটে চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে। আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। যেন এখনই ঝাঁপিয়ে পড়বে আমার ওপর।
ভদ্রলোক হাসলেন আবার। চোখ নাচিয়ে বললেন, কী মনে হচ্ছে? সেই কুকুরটা না! গলা শুকিয়ে গেছে আতঙ্কে। বললুম, কিন্তু ওটা তো মনে হচ্ছে স্টাফ-করা একটা কুকুর!
হ্যাঁ। আমার প্রিয় কুকুর জনি। মৃত্যুর পর ওর চামড়া ছাড়িয়ে নিয়েছিলুম। তারপর কাঠের গুঁড়ো, তুলল, স্পঞ্জ এসব জিনিস স্টাফ করে ওর চেহারাটা ফিরিয়ে এনেছি। দারুণ জ্যান্ত দেখাচ্ছে, না?
সায় দিয়ে বললুম, দেখাচ্ছে। কিন্তু…
কিন্তু কিসের এতে? ভদ্রলোক এগিয়ে গিয়ে কুকুরটার পিঠে হাত রাখলেন। আমি ট্যাক্সিডার্মি অর্থৎ চামড়াবিদ্যায় দক্ষতা অর্জন করেছি। এ তার যৎকিঞ্চিৎ নমুনা। আপনি চামচিকের কথা বলছিলেন। দেখুন তো, ওই চামচিকেগুলো নাকি?
দেয়ালের দিকে তাকিয়ে আবার আমায় চমক জাগল। সাদা দেয়ালের গায়ে একঝাক চামচিকে সেঁটে রয়েছে। জ্বলজ্বলে নীল চোখ তাদের। দেখতে দেতে শরীর হিম হয়ে গেল।
ভদ্রলোক হাত বাড়িয়ে একটা চামচিকে তুলে হাতের তালুতে রেখে বললেন, ভীষণ জ্যান্ত : দেখাচ্ছে, তাই না? যদি ছুরি দিয়ে কাটি, রক্ত বেরুতেও পারে, বলা যায় না।
বললুম, ট্যাক্সিডার্মিতে সত্যি আপনার অসাধারণ দক্ষতা। কিন্তু ওরা তো মৃত?
হ্যাঁ—আপাতদৃষ্টে মৃত। বৃদ্ধ আবার মুচকি হেসে চোখ নাচিয়ে বললেন, কিন্তু ওরা জীবিত হতে পারে। সেটাই আমার ট্যাক্সিডার্মির নতুন দিক। আশা করি, তার পরিচয় চমৎকারভাবে পেয়েছেন। এবার আসুন, আপনাকে আরেকটা জিনিস দেখাই।
