চার
ঢং ঢং করে দেয়ালঘড়িতে রাত বারোটা বাজল। কালোবাবুর ঘরে আলো নিভিয়ে আমরা বসে আছি। কর্নেল থানা থেকে ফিরে এসেছেন। আমরা ওত পেতে আছি হাট্টিমাটিমের অপেক্ষায়।
হঠাৎ পুবের সেই জানালার খুটখাট শব্দ হল। তারপর ভুতড়ে গলায় হিঁ হিঁ শব্দ করে কেউ বলে উঠল, আঁমাদের ডিঁমদুটো দেঁ! এক্ষুনি দেঁ! কী? দিঁবিনে? ঠুঁকরে চোঁখ উঁপড়ে নেব।
বারণ ছিল কথা বলতে! কিন্তু কালোবাবু টর্চ জ্বেলে লাঠি উঁচিয়ে গর্জে উঠলেন, তবে রে হারামজাদার দল! দিচ্ছি তোদের ডিম!
টর্চের আলোয় দেখলুম, জানালায় দুটো প্রকাণ্ড পেঁচার মতো মুখ, মাথায় দুটো শিং, ভয়ংকর বিদঘুটে হাট্টিমাটিম টিম। চোখ দুটো যেন জ্বলছে।
আর তারপরই ওপাশে নিচের বাগানে যেন হুলস্থূল শুরু হয়েছে। গুলির শব্দ। পাকড়ো পাকড়ো চিৎকার। হাট্টিম দুটোও সাঁৎ করে সরে গেল জানালা থেকে। কর্নেল বললেন, জয়ন্ত! শিগগির!
নিচে নেমে বাড়ি ঘুরে পেছনের বাগানে গিয়ে দেখি, একদঙ্গল পুলিশ, দুটো লোককে পাকড়াও করে ফেলেছে। ঘাসের ওপর পড়ে আছে হাট্টিমদুটো। তাদের পায়ের সঙ্গে দুটো লম্বা বাঁশ বাঁধা। বুঝলুম ওই বাঁশের সাহায্যেই ওদের দোতলার জানালায় তুলে ধরত এরা।
আরও মজা আবিষ্কৃত হল। একটির মুখের ভেতর ছোট্ট মাইক বাসানো। একটা তার পালকের ভেতর দিয়ে জড়িয়ে-মড়িয়ে নেমে এসেছে। ঘাসের ওপর পড়ে আছে একটা স্পিকার। স্পিকারের সঙ্গে ব্যাটারি ফিট করা আছে। খুব ফন্দি তো এদের! স্পিকারে ভূতুড়ে স্বরে ডিম ফেরত চাওয়া হচ্ছিল তাহলে।
এখন মুখোশ পরে না থাকলেও লোকদুটোর গড়ন দেখেই চিনতে পারছিলুম, এরাই কাল আমার গাড়ির টায়ার ফাঁসিয়েছিল।
লালবাজারের গোয়েন্দা অফিসার সাবির আমেদ হাসতে হাসতে বললেন, যাক। বহুদিন ফেরারি হয়ে বেড়াচ্ছিল দুই কুখ্যাত ডাকু। কর্নেল, এরাই সেই জগু আর হায়দার। পোর্ট এলাকায় এদের অত্যাচারে আমরা অতিষ্ঠ হয়েছিলুম তিনটে বছর। বিদেশ থেকে জাহাজে দামি মাল এলেই এদের দলবল সেগুলো সরিয়ে ফেলত।
কালোবাবু ডাকু দুজনের সামনে মুখ খিচিয়ে বললেন, ডিম চাই? অ্যাঁ? তারপর ভেংচি কেটে সুর করে ছড়া আওড়ালেন :
হাট্টিমাটিম টিম
তারা মাঠে পাড়ে ডিম
তাদের খাড়া দুটো শিং
তারা হাট্টিমাটিম টিম।
অনামিকা দাদুর কাণ্ড দেখে খিল খিল করে হেসে উঠল।…
১.১৪ কালো কুকুর
সেবার শরঙ্কালে একদিন গোয়েন্দাপ্রবর কর্নেল নীলাদ্রি সরকার একথা-ওকথার পর হঠাৎ বললেন, ডার্লিং! তোমার কি ছিপে মাছধরার নেশা আছে?
শুনে একটু মনমরা হয়ে বললুম, হু, ছিল। ভীষণ ছিল। কিন্তু দৈনিক সত্যসেবকে ঢোকার পর সারাক্ষণ খবরের পেছনে দৌড়ুব, নাকি ছিপ ফেলে জলের ধারে বসে থাকব?
থাকবে—যদি ছিপ ফেলে জলের ধারে বসে থেকেও তোমার কাগজের জন্য তোফা কোনও খবর জোটে। বলে ধুরন্ধর বৃদ্ধ মুচকি হেসে সাদা দাড়িতে আঙুলের চিরুনি টানতে থাকলেন।
অবাক হয়ে বললুম, ব্যাপারটা কী বলুন তো?
কর্নেল বললেন, মুর্শিদাবাদে রোশনিবাগ নামে একটা জায়গা আছে। সেখানে একটা প্রকাণ্ড ঝিলে নাকি পুরনো আমলের বিশাল সব মাছের আড়া। কিন্তু সম্প্রতি ওই ঝিলে নাকি পিশাচের উপদ্রব হয়েছে। যে ছিপ ফেলতে একলা যায়, সে আর বাড়ি ফেরে না।
বলেন কী?
একটা ব্যাপার বোঝা যায়! ছিপ ফেলে মাছ ধরতে বড় একাগ্রতার দরকার। ফাতনার দিকে চোখ রেখে বসে থাকতে হয়। আর সেই সুযোগে পিশাচ পেছন থেকে পা টিপেটিপে এসে তাকে ধরে।
আপনি বিশ্বাস করেন এ-কথা? হাসতে হাসতে বললুম, পিশাচ বলে সত্যি কিছু আছে নাকি?
কর্নেল গম্ভীর হয়ে বললেন, জানি না। তবে ওখানকার লোকে নাকি পিশাচটাকে দেখেছে।
কেমন চেহারা তার?
কুকুরের মতো। কালো একটা কুকুরের বেশে সে আসে। তারপর আচমকা পেছন থেকে কাঁপিয়ে পড়ে গলা কামড়ে ধরে! টানতে টানতে নিয়ে যায়।
জেদ চড়ে গেল মাথায়। বললুম, ঠিক আছে। তাহলে কালই আমাকে নিয়ে চলুন সেখানে। যতসব আজগুবি গল্প!
পরদিন ভোরে জিপে রওনা হয়ে দুপুরের মধ্যে আমরা রোশনিবাগ পৌঁছে গেলুম। নবাবি আমলের সমৃদ্ধ আধাশহুরে গ্রাম। আমরা উঠলুম সেচ দফতরের বাংলোয়। ঝিলটা বাংলো থেকে দু-কিলোমিটার দূরে জঙ্গুলে পরিবেশে রয়েছে। আসলে এটা গঙ্গারই পুরনো একটা খাত। ঝটপট খাওয়া সেরে ছিপ নিয়ে বেরিয়ে পড়লুম। আসার সময় চৌকিদার পইপই করে বারণ করল, যেন দুজনে সবসময় কাছাকাছি থাকি। নইলে পিশাচের পাল্লায় পড়ব।
কিন্তু একলা না হলে পিশাচটা আসবে না। তাই হাসতে হাসতে কর্নেলকে বললুম, আপনি বরং পাখি-প্রজাপতির খোঁজে ঘুরতে থাকুন। আমি পিশাচটার প্রতীক্ষা করি।
কর্নেলও হেসে বললেন, তুমি না বললেও আমি জলের ধারে বসে থাকতে রাজি হতুম না জয়ন্ত!তারপর বাইনোকুলারটা চোখে রেখে গাছপালায় পাখি খুঁজতে থাকলেন। যখন চার এবং ছিপ ফেলে জলের ধারে বসেছি, তখন উনি জঙ্গলের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেছেন। এবার কিন্তু একটু গা-ছমছম করতে থাকল। বারবার পিছনে ঘুরে দেখে নিচ্ছি। বুদ্ধি করে সঙ্গে একটা লোহার রড এনেছিলুম। সেটা পাশে রেখে ফাতনার দিকে চোখ রেখে বসে আছি। বুজকুড়ি উঠতে শুরু করেছে। চারে মাছ আসার লক্ষণ এটা। ফাতনা নড়লেই খ্যাচ মারব। কিন্তু তারপরই পেছনে গরগর গর্জন শুনে চমকে উঠলুম। ঝটপট ঘুরে দেখি, সত্যি একটা কালো কুকুর-বীভৎস হাঁ করে চাপা গর্জন করছে সে। তার লাল মুখের দাঁতগুলো ঝকমক করছে হিংস্রতায়। ক্রুর কুতকুতে চোখে হিংসা ঠিকরে পড়ছে। লকলকে জিভ থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় কি রক্ত ঝরছে? একলাফে রডটা বাগিয়ে ছুটে গেলুম মরিয়া হয়ে।
