এইসব কথাবার্তা হতে-হতে সাড়ে পাঁচটা বেজে গেল। তারপর কর্নেল কাগজটা নিজের পকেটে ভরে বললেন,–জয়ন্ত এই তোমার গাড়ির চাবি আমি আলমারির লকারে রেখে যাব। যাও তুমি রেডি হয়ে নাও। এই সময়টা রাস্তায় বড্ড জ্যাম হয়। হাতে সময় রেখে বেরুনোই ভালো। তা ছাড়া লোকাল ট্রেন। আমার টিকিট কাটার দরকার হয় না। কিন্তু তোমাদের দুজনের জন্য টিকিটের ব্যবস্থা করতে হবে।
হালদারমশাই আড়মোড়া দিয়ে সোফায় হেলান দিলেন। কর্নেল তার ঘরে গিয়ে ঢুকলেন। আর আমি ঢুকলুম আমার জন্য সংরক্ষিত ঘরে। শীতকাল বলে আমার ঘরে বাড়তি জ্যাকেট সোয়েটার, কান-ঢাকা-টুপি–সবই রাখা ছিল। তবে আমার পয়েন্ট বাইশ ক্যালিবারের সিক্স রাউন্ডার রিভলভারটা ছিল আমার হ্যান্ড ব্যাগে। ওটা সবসময়েই কর্নেলের উপদেশে আমি সঙ্গে রাখি। একটা বাড়তি ব্যাগে দরকারি জিনিসপত্র পোশাক-আশাক ভরে নিয়ে আমি ড্রইংরুমে এলুম। তারপর এলেন কর্নেল। আর কর্নেলের গলায় দেখলুম যথারীতি বাইনোকুলার আর ক্যামেরা ঝুলছে। তার পিঠে আঁটা কিটব্যাগ, আর হাতে একটা পুষ্ট মোটাসোটা ব্যাগ।
বেরুতে যাচ্ছি টেলিফোনটা বাজল। বিরক্ত হয়ে কর্নেল রিসিভার তুলে সাড়া দিলেন। তারপর কাকে কৌতুক করে বললেন,–হা বলি হতেই তো যাচ্ছি দাদা!
হালদারমশাই চমকে উঠে বললেন,–কেডা কী কইল?
কর্নেল বললেন,–ও কিছু না, চলুন।
.
তিন
সে-রাতে কালিকাপুর স্টেশনে যখন ট্রেন পৌঁছেছিল, তখন টের পেয়েছিলুম শীত কাকে বলে! প্রচণ্ড কনকনে শীতের রাতটা সত্যিই একটা অ্যাডভেঞ্চারের পরিবেশ তৈরি করেছিল। কারণ, কর্নেলের বাড়ি থেকে বেরুনোর সময় কেউ হুমকি দিয়েছিল। কাজেই আমি চারদিকে সতর্ক চোখে লক্ষ করছিলুম। কর্নেল অবশ্য নির্বিকার। হালদারমশাই লোকের ভিড় ঠেলে যেতে-যেতে একবার বলেছিলেন,–কী কাণ্ড! কলকাতায় ফ্যান চলত্যাসে, আর এখানেও ফ্যান চলত্যাসে।
এই ধাঁধার জবাব পেলুম একটু ফাঁকায় গিয়ে। নীচের চত্বরে সাইকেলরিকশা, এক্কাগাড়ি, আর বাস-এইসব যানবাহনের ভিড়। হালদারমশাইকে জিগ্যেস করেছিলুম,–কলকাতা আর এখানে ফ্যান চলছে বলছিলেন–ব্যাপারটা কী?
হালদারমশাই হাসবার চেষ্টা করে বললেন,–বুজলেন না, ওখানে চলত্যাসে ইলেকট্রিক ফ্যান আর এখানে চলত্যাসে নেচারের ফ্যান।
এতক্ষণে লক্ষ করেছিলুম কথা বলতে গেলেই মুখ দিয়ে বাচ্চা বেরুচ্ছে। কর্নেল এদিক-ওদিক ঘুরে চণ্ডীবাবুর পাঠানো গাড়ি খুঁজছিলেন। একটু পরেই যাত্রীদের নিয়ে সব যানবাহন চলে গেল, কিন্তু কোনও প্রাইভেট গাড়ি চোখে পড়ল না।
কর্নেল বললেন,–আবার কোনও গণ্ডগোল হয়ান তো? চণ্ডীবাবুর গাড়ি দেখছি না কেন?
হালদারমশাই বললেন,–কর্নেলস্যার, এই শীতে মাটির ভাঁড়ে চা খাইয়া লই। গাড়ি ঠিক আইয়্যা পড়বে।
হালদারমশাই চায়ের দোকানের দিকে পা বাড়িয়েছেন, এমন সময় হর্ন দিতে-দিতে একটা মেরুন রঙের প্রাইভেট গাড়ি এসে আমাদের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে গেল। তারপর ড্রাইভার নেমে কর্নেলকে সেলাম ঠুকে বলল,–পথে একটু দেরি হয়ে গেছে স্যার। বেশি ঠান্ডায় গাড়ির ইঞ্জিন ঠিক মতো কাজ করছিল না। এখন ঠিক হয়ে গেছে, আপনারা উঠে পড়ুন।
কর্নেল সামনের সিটে এবং আমরা দুজনে পেছনের সিটে বসলুম। তারপর ড্রাইভার গাড়িটা ঘুরিয়ে নিয়ে স্পিড বাড়াল। জানলার কাঁচ তোলাই ছিল, তবু কনকনে ঠান্ডা হাওয়ায় জবুথবু হয়ে বসে থাকলুম। রাস্তাটা তত ভালো নয়, তাই ঝাঁকুনির চোটে অস্থির হচ্ছিলুম। দু-ধারে সারবদ্ধ গাছপালা হেডলাইটের আলোয় দেখা যাচ্ছিল। কর্নেল ড্রাইভারের সঙ্গে চাপা গলায় কথা বলছিলেন, কিন্তু সেদিকে আমার কান ছিল না। কেন যে আমি পুরু জ্যাকেটটা পরে আসিনি! তার বদলে এই হালটা জ্যাকেট আর ভেতরে একটা পাতলা সোয়েটার এখানকার শীতের পক্ষে যথেষ্ট নয়। মিনিট পনেরো পরে লক্ষ করলুম, সামনে গাছপালার ফাঁকে গাঢ় কুয়াশার ভেতরে জোনাকির মতো আলো দেখা যাচ্ছে। জনপদের ভেতর ঢুকে শীতের কামড়টা একটু কমে এল। এটা বাজার এলাকা। এত রাত্রে জনমানবহীন হয়ে আছে। তারপর বাঁক নিয়ে ক্রমাগত এদিক-ওদিক ঘুরতে-ঘুরতে যেখানে পৌঁছুলুম সেদিকটায় রাস্তার আলো নেই। কিন্তু একটা বাড়ির গেটে আলো জ্বলছিল। দারোয়ান গেট খুলে দিল। তারপর লন দিয়ে এগিয়ে গাড়ি পোর্টিকোর তলায় থামল। আমরা নিজের-নিজের ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে গাড়ি থেকে নামলুম।
ততক্ষণে কর্নেলও নেমেছেন। দেখলুম সিঁড়ির মাথায় এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন। গায়ে সোয়েটার এবং পরনে প্যান্ট। উজ্জ্বল গৌরবর্ণ, প্রায় কর্নেলের বয়সি। এই ভদ্রলোকের মুখে অবশ্য দাড়ি নেই, তবে দেখার মতো গোঁফ আছে। মাথার চুলও সাদা। তিনি কয়েক ধাপ নেমে এসে কর্নেলের সঙ্গে হ্যান্ডসেক করলেন। তারপর বললেন, আমি ভাবছিলুম ট্রেন লেট করেছে।
ড্রাইভার গাড়ির ভেতর থেকে বলে উঠল,–না স্যার, পথে ইঞ্জিন গোলমাল করছিল। কালকে একবার গ্যারেজে দেখিয়ে আনতে হবে।
ভদ্রলোক আমাদের দিকে তাকিয়ে নমস্কার করে বললেন,–আসুন।
ভেতরে একটা প্রশস্ত ঘর। সেকেলে আসবাবপত্র। এ-ধরনের বনেদি ধনী পরিবারের বাড়ি কর্নেলের সঙ্গগুণে আমার দেখা আছে। তাকে অনুসরণ করে আমরা দরজা দিয়ে করিডরে ঢুকলুম। এতক্ষণে চোখে পড়ল একটা গাঁটগোঁট্টা চেহারার লোক করিডরের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। তার চেহারা প্রচণ্ড কালো। সে দু-হাত জোড় করে সামনের দিকে ঝুঁকে বলল,–কর্নেলসাহেবকে দেখে খুব আনন্দ হচ্ছে। আপনি আসবেন শোনার পর থেকেই আমি শুধু অপেক্ষা করছিলুম। কর্তামশাই আমাকে নন্দ-ড্রাইভারের সঙ্গে স্টেশনে যেতে দিলেন না।
