কর্নেল বললেন,–না, তোমাকে নিয়ে গেলে অসুবিধে হত না, কিন্তু তোমার সুনিদ্রা ভাঙাতে চাইনি।
ষষ্ঠিচরণ ট্রেতে কফির পট, দুধ, চিনি, চায়ের পেয়ালা আর এক প্লেট চানাচুর রেখে গেল। কর্নেল বললেন,–হিস-হিস, হুস-হুস–সব নিজের নিজের কফি তৈরি করে নাও। হালদারমশাই তো স্পেশাল কফি খান। কাজেই স্বাবলম্বি হওয়াই ভালো। আমরা নিজের-নিজের কফি তৈরি করে নিলুম, হালদারমশাই একটু বেশি দুধ মেশানো কফি অভ্যাস মতো ফুঁ দিয়ে দিয়ে চুমুক দিতে থাকলেন।
আমি বললুম,–আপনি বলছিলেন সাড়ে-ছটায় ট্রেন। এখন পাঁচটা বেজে গেছে। অন্তত এক ঘন্টা আগে বেরুনো উচিত।
কর্নেল আমার কথার কোনও জবাব দিলেন না। তিনি কফি পান করতে করতে বুক পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করলেন। তারপর সেটা এক হাতেই খুলে টেবিলে রাখলেন। তার ওপর পেপারওয়েটের মতো আমার গাড়ির চাবিগুলো চাপা দিলেন। লক্ষ করলুম হালদারমশাই গুলি-গুলি চোখে কাগজটার দিকে তাকিয়ে আছেন। বললুম,–ওই কাগজটা কোথাও আনতে গিয়েছিলেন?
কর্নেল বললেন, হ্যাঁ। ওতে কালিকাপুরের চ্যাটার্জি ফ্যামিলির পূর্ব-পুরুষের লুকিয়ে রাখা গুপ্তধনের খবর আছে।
কথাটা শোনামাত্র হালদারমশাই এত জোরে নড়ে বসলেন, যে তার পেয়ালা থেকে খানিকটা কফি ছিটকে তার প্যান্টের ওপর পড়ল। তিনি উত্তেজিতভাবে বললেন,–কী কইলেন? কী কইলেন?
কর্নেল তেমনই গম্ভীর মুখে বললেন,–গুপ্তধনের সন্ধান।
হালদারমশাই আমার দিকে ঘুরে বসে বললেন,–ঠিক এই কথাটাই আমার মাথায় আইজ সারা দিন মাসির মতন ভনভন করত্যাসিল।
আমি হাসি চেপে বললুম,হালদারমশাই, এ-গুপ্তধনটা কর্নেলকে ফাঁকি দিয়ে আপনি আর আমি দুজনে ভাগাভাগি করে নেব–কি বলেন?
কর্নেল কিন্তু হাসলেন না। তেমনই গম্ভীর মুখে বললেন,–তবে গুপ্তধন সব সময়েই যে ধনরত্ন হবে, এমন কিন্তু নয়। একটু খুব পুরোনো, ধরো পাঁচশো বছরের কোনও সাধারণ জিনিসকেও গুপ্তধন বলা যায়।
বললুম,–আপনার ওই কাগজটা কিন্তু মোটেই পুরোনো নয়। একটা ছোট্ট প্যাডের একটা স্লিপ বলেই মনে হচ্ছে।
কর্নেল আমার কথায় কান না দিয়ে কফি শেষ করলেন, তারপর চুরুট ধরিয়ে টেবিলের ড্রয়ার থেকে তার আতস কাঁচটা বের করলেন। এরপর তিনি টেবিল ল্যাম্প জ্বেলে আতস কাঁচের সাহায্যে কাগজের লেখাগুলো খুঁটিয়ে দেখার পর বললেন,–হ্যাঁ, এতে গুপ্তধনের সূত্র লেখা আছে বটে।
হালদারমশাই ব্যস্তভাবে বললেন,–কী লেখা আছে কন তো কর্নেলস্যার।
কর্নেল কাগজটা আমার হাতে দিলেন। দেখলুম এটা একটা ছোট্ট প্যাডের স্লিপই বটে। তাতে লেখা আছে :
হালদারমশাই উঁকি মেরে দেখছিলেন। বললেন,–অন্ন, মানে টক। তারপর হং, মং–এগুলিন কী?
কর্নেল বললেন,–যিনি এটা আমাকে দিয়েছেন, তার কাছেই পাঁচশো বছরের বেশি পুরোনো একটা তুলোট কাগজে এগুলো লেখা আছে।
আমি অবাক হয়ে বললুম,–এটা কে আপনাকে দিল, তা বলতে আপত্তি আছে?
কর্নেল বললেন, তুমি দুপুরে যখন স্নান করছিলে, তখন টেলিফোনে এক ভদ্রলোক তার নাম ঠিকানা দিয়ে আমাকে শিগগির যেতে বলেন। আমি যথেষ্ট সতর্ক হয়েই গিয়েছিলুম, তারপর তার পরিচয় পেয়ে বুঝতে পারলুম ইনি কালিকাপুরের চাটুজ্যে পরিবারেরই এক জ্ঞাতি। কালিকাপুরের চণ্ডীপ্রসাদ সিংহ তার বন্ধু এবং ছাত্রজীবনের সহপাঠী ছিলেন। চণ্ডীবাবুই তাকে ফোন করে সেখানে যা ঘটেছে তা জানিয়েছেন। চণ্ডীবাবু আমার পরিচয় এবং ফোন নম্বর তাকে দিয়ে বলেছেন তার কাছে যে অমূল্য প্রাচীন কাগজটা আছে, তা যেন আমাকে তিনি দেন। কিন্তু তার টেলিফোন পেয়ে আমি তার সঙ্গে যখন দেখা করতে গেলুম তখন তিনি সেই কাগজটা থেকে আমাকে দেবনাগরী লিপিতে লেখা ওই শব্দগুলো টুকে নিলেন। আমি অবশ্য মিলিয়ে দেখে নিয়েছি।
জিগ্যেস করলুম,ভদ্রলোক কে, কোথায় থাকেন?
কর্নেল বললেন,–তার নাম শরদিন্দু চ্যাটার্জি। থাকেন ভবানীপুরে। তার বাবা থাকতেন কালিকাপুরে। তারপর কলকাতায় আসেন। শরদিন্দুবাবুর নেশা পাখি শিকার করা। আজকাল এসব শিকার নিষিদ্ধ। তবু শীতকালে কালিকাপুরের ওদিকে একটা বিশাল বিলে অনেক দেশি-বিদেশি জলচর পাখি আসে। শরদিন্দুবাবু অভ্যাস ছাড়তে পারেননি। গোপনে বুনো হাঁস শিকার করতে যান। তবে জ্ঞাতিদের বাড়িতে ওঠেন না। তার আশ্রয় চণ্ডীবাবু। হাঁস শিকার করতে পারলে সেদিনই তিনি তার ব্যাগের মধ্যে লুকিয়ে নিয়ে কলকাতায় ফিরে আসেন। তার যাওয়ার কথা ছিল আজ। কিন্তু একটা কাজে আটকে পড়েছেন। তিনি পেশায় একজন আইনজীবী। তাই কোর্টের ছুটি না থাকলে তার কালিকাপুর যাওয়া হয় না।
বললুম,–তাহলে তিনি সেখানে যাচ্ছেন না?
কর্নেল বললেন,–আর কয়েকদিন পরেই তো বড়দিন–পঁচিশে ডিসেম্বর, কাজেই তার আগের দিন তিনি সন্ধ্যার ট্রেনে যাবেন।
হালদারমশাই টান হয়ে শুয়েছিলেন। বললেন,–এই ভদ্রলোকেরে আমার সন্দেহ হইতাসে। আইনজীবী হইয়াও তিনি আইন ভঙ্গ করেন।
কর্নেল এতক্ষণে একটু হাসলেন। বললেন, আপনি কি তিনটে দিন অপেক্ষা করে শরদিন্দুবাবুর গতিবিধির দিকে লক্ষ রাখবেন? তারপর না হয় ওঁকে ফলো করেই কালিকাপুরে যাবেন।
হালদারমশাই কঁচুমাচু হেসে বললেন,–নাঃ, যখন বারাইয়া পরসি তখন আর কোনও কথা না। তেমন বুসলে আমি কালিকাপুরে থাইক্যা যামু।
