চণ্ডীবাবু কপট ধমক দিয়ে বললেন,–এই কেতো, যাত্রাদলের পার্ট করবি, না সাহেবদের ঘরে নিয়ে যাবি?
সে পাশের একটা ঘরের পরদা সরিয়ে বলল,–সবকিছু রেডি কর্তামশাই। সাহেবরা বসুন, আমি ঠাকুরমশাইকে দেখি।
চণ্ডীবাবু বললেন,–এক মিনিট। কর্নেলসাহেব এত রাতে কি আর কফি খাবেন?
কর্নেল বললেন,–খাব। তবে ডিনারের পরে। কার্তিক, তুমি ঠাকুরমশাইকে কথাটা মনে করিয়ে দিয়ে।
মোটামুটি প্রশস্ত একটা সাজানো-গোছানো ঘরে আমরা ঢুকেছিলুম। দু-ধারে দুটো খাট। একপাশে সোফা। চণ্ডীবাবু কোণের একটা চওড়া টেবিল দেখিয়ে বললেন,–ব্যাগগুলো ওখানে রেখে কর্নেলসাহেব আরাম করে বসুন। আপনার ইজিচেয়ারটা কিন্তু আমি ওপর থেকে আনিয়ে রেখেছি।
কর্নেল তার পিঠে-আঁটা কিটব্যাগটা খুলে টেবিলে রাখলেন। তারপর ক্যামেরা এবং বাইনোকুলারটা একপাশে রেখে দিলেন। তিনি ইজিচেয়ারে বসে মাথার টুপিটা খুলে দেওয়ালের একটা ব্র্যাকেটে আটকে দিলেন। তারপর ইজিচেয়ারে বসে চওড়া টাকে হাত বুলোতে থাকলেন।
ততক্ষণে আমরা সোফায় বসেছি। ঘরের ভেতরটা বেশ আরামদায়ক।
চণ্ডীবাবু বললেন,–একটা রুম হিটার আছে, জ্বেলে দেব নাকি?
কর্নেল বললেন, না মিস্টার রায়চৌধুরী। আমার সঙ্গীদের একটু শীতের আরাম পাওয়া দরকার। কলকাতায় এখনও ফ্যান চালাতে হচ্ছে।
চণ্ডীবাবু সোফার একপাশে বসে বললেন,–উনি আপনার তরুণ সাংবাদিক বন্ধু জয়ন্ত চৌধুরী, তা বোঝা যাচ্ছে। আর ইনিই সেই প্রাক্তন পুলিশ অফিসার এবং প্রাইভেট ডিটেকটিভ মিস্টার কে কে হালদার। কি? আমি ভুল করিনি তো?
হালদারমশাই সহাস্যে বললেন,–নাঃ, আপনি ঠিক ধরসেন। তবে একসময় আমি পুলিশ লাইফে অনেক গ্রামে ঘুরসি, কিন্তু আপনাগো এখানে শীত ক্যান?
চণ্ডীবাবু বললেন, শীত বদলায়নি। আসলে বদলে গেছেন আপনি। কলকাতায় থাকলে মানুষের অনেক অদলবদল ঘটে যায়।
কর্নেল বললেন,–আচ্ছা মিস্টার রায়চৌধুরী, চাটুজ্যে বাড়ির কেস সম্পর্কে পুলিশ কতদূর এগিয়েছে? আপনি নিশ্চয়ই জানেন।
চণ্ডীবাবু বললেন,–লালবাজার থেকে আপনার সুপারিশে পুলিশ একটা কুকুর এনেছিল। সান্ডেলটা শুকিয়ে কুকুরটাকে শুনেছি কাজে লাগানো হয়েছিল। কিন্তু কুকুরটা পুকুরের পাড় দিয়ে এগিয়ে গিয়ে একটা গলি রাস্তায় গিয়েছিল। তারপর আর সে কোনওদিকে এগোয়নি। বিশ্বস্ত সূত্রে শুনেছি ওই গলির পাশে একটা নতুন বাড়ি তৈরি হচ্ছে। ম্যাটাডোরে বোঝাই করে বাড়ির মালমশলা নিয়ে আসা হচ্ছে। তাই পুলিশের সন্দেহ খুনিরা খুনি ওই ম্যাটাডোরে চেপে পালিয়ে গেছে।
হালদারমশাই বলে উঠলেন, পুলিশ ম্যাটাডোরের ড্রাইভার বা যার বাড়ি হইতাসে তাগো জেরা করে নাই?
চণ্ডীবাবু একটু হেসে বললেন,–জেরা করেছে, কিন্তু কোনও সূত্রই বেরিয়ে আসেনি। অবশ্য এমন হতেই পারে প্রাণের ভয়ে ড্রাইভার মুখ খুলতে চায়নি।’
কথাটা বলে তিনি ঘড়ি দেখলেন। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, আপনারা বাথরুমে হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নিন। গরম জলের ব্যবস্থা আছে। আমি দেখি, খাওয়ার ব্যবস্থা কতটা হল।
তিনি বেরুবার আগেই কার্তিক এসে গেল। সে বলল,–সব রেডি স্যার। আপনারা এখনই আসুন। যা শীত পড়েছে খাবার গরম থাকছে না।
নীচের তলায় ডাইনিংরুমে খাওয়াদাওয়া সেরে আমরা গেস্টরুমে ফিরে এলুম। তারপর কার্তিক এসে বলল,–একজনের শোওয়ার ব্যবস্থা পাশের ঘরেই হয়েছে। এই ঘর থেকে যাওয়া যায়। ওই দেখুন দরজা।
হালদারমশাই টেবিল থেকে তার ব্যাগ তুলে নিয়ে একটু হেসে বললেন,–আমি ওই ঘরে যাই।
কর্নেল বললেন,–যান, কিন্তু সাবধান। এ-বাড়িতেও ভূতের উৎপাত আছে। বাইরের দিকে কেউ কড়া নাড়লে যেন দরজা খুলে বেরুবেন না।
কার্তিক হালদারমশাইকে আমাদের ঘরের মাঝের দরজা দিয়ে পাশের ঘরে নিয়ে গেল। সে হালদারমশাইকে সব দেখিয়ে এবং বুঝিয়ে দিয়ে আমাদের ঘরের ভেতর দিয়ে চলে গেল।
চণ্ডীবাবু পাইপ টানছিলেন। আর কর্নেল অভ্যাসমত কফি পান করছিলেন। আমি পুরু কম্বলের তলায় ঢুকে পড়েছিলুম। দুজনে চাপা গলায় কথা বলছিলেন, কিন্তু স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলুম না। তারপর কখন ঘুমিয়ে গেছি।
সেই ঘুম ভেঙেছিল কার্তিকের ডাকে। তার হাতে চায়ের কাপ-প্লেট দেখেই বুঝতে পেরেছিলুম কর্নেলের নির্দেশ সে পালন করছে। সে আমার হাতে চায়ের কাপ-প্লেট তুলে দিয়েই বলল,–আমার কর্তামশাইয়ের সঙ্গে কর্নেলসাহেব আর হালদারসাহেব তোরবেলা বেরিয়ে গেছেন। কিছু দরকার হলে আমি আছি। ওই বেলটা টিপবেন, তাহলেই আমি এসে যাব।
ঘড়িতে দেখলুম সাড়ে সাতটা বাজে। উলটোদিকের জানলা খোলা। পরদার ফাঁকে ম্লান রোদের আভা। কার্তিক বেরিয়ে গিয়েছিল। আমি বেড-টি খাওয়ার পর উলটোদিকের দরজা খুলে দেখলুম, এদিকে টানা বারান্দা। আর নীচে রং-বেরঙের ফুলের গাছ। তখনও রোদের সঙ্গে কুয়াশা মিশে আছে। বাউন্ডারি ওয়ালের উঁচু পাঁচিল দেখা যাচ্ছিল। পাঁচিলের ধারে সারবদ্ধ গাছ। কিন্তু ঠান্ডায় বেশিক্ষণ দাঁড়ানো গেল না।
কর্নেলরা যখন ফিরে এলেন, তখন প্রায় ন’টা বাজে। অভ্যাসমতো কর্নেল বললেন,–মর্নিং জয়ন্ত। আশাকরি কোনও অসুবিধে হয়নি?
বললুম,–না। আপনাদের সঙ্গে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল। আপনারা কি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন?
হালদারমশাই এসেই নিজের ঘরে ঢুকেছিলেন। কর্নেল কিছু বলার আগে তিনি দ্রুত ফিরে এসে ধপাস করে সোফায় বসে বললেন,–আরে কী কাণ্ড!
