আরও একটা কথা বলে রাখা দরকার, এ-ধরনের অভিযানে বেরুতে হয় বলে কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে আমার জন্য একটা ঘর বরাদ্দ আছে। সেখানে পোশাক-আশাক থেকে শুরু করে দাড়ি কাটার ব্লেড, টুথব্রাশ আর পেস্ট সবই থাকে। কাজেই আমার আর সল্টলেকের ফ্ল্যাটে ফেরা হল না। কর্নেল নীচের তলায় আমার গাড়ি রাখার জন্য একটা গ্যারেজও খালি রেখেছেন। একসময় সেখানে তার একটা ল্যান্ড রোভার গাড়ি ছিল। পুরোনো গাড়ির ঝামেলা অনেক, তাই সেটা লোহা-লক্কড়ের দামে বেচে দিয়েছিলেন।
দুপুরে খাওয়ার পর আমার ভাত-ঘুমের অভ্যাস আছে। ড্রইংরুমের একটা ডিভানে যথারীতি শুয়ে পড়েছিলুম! কর্নেল তার অভ্যাসমত ইজিচেয়ারে বসে চুরুট টানছিলেন। তারপর একবার কানে গিয়েছিল টেলিফোনে চাপাস্বরে কার সঙ্গে কথা বলছেন।
আমার ভাত-ঘুম ভেঙে ছিল ষষ্ঠিচরণের ডাকে। তার হাতে চায়ের কাপ-প্লেট! দেখলুম কখন আমার গায়ের ওপর কেউ একটা হালকা কম্বল চাপিয়ে দিয়ে গেছে। তার মানে আমার ঘুমটা যাতে ভালো হয়, তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। উঠে বসে ষষ্ঠির হাত থেকে চা নিয়ে বললুম,–আমার গায়ে এই মড়ার কম্বল চাপাল কে?
ষষ্ঠি খি-খি করে হেসে উঠল। বলল,–বাবামশাই আড়াইটেতে বেরিয়ে গেছেন। যাওয়ার সময় উনিই কম্বলটা আপনার গায়ে চাপিয়ে দিয়ে গেছেন। আর-একটা কাজ করেছেন।
চায়ে চুমুক দিয়ে বললুম,–তুমি না-বললেও বুঝেছি। আমার প্যান্টের পকেট থেকে গাড়ির চাবি চুরি করে কোথাও উধাও হয়েছেন।
ষষ্ঠি আরও হেসে বলল,–বাবামশাই বলে গেছেন, ঠিক চারটেয় তোর দাদাবাবুকে চা দিবি। আমি তো জানি, আপনি সকালে ঘুম থেকে উঠে বিছানায় বসে বাসিমুখে চা খান। আবার দুপুরে ঘুমুলেও বিছানায় বসে আপনার চা খাওয়ার অভ্যেস আছে।
কথাটা বলে ষষ্ঠিচরণ হন্তদন্ত চলে গেল। বুঝতে পারলুম সে ছাদের বাগানে কাক তাড়াতে যাচ্ছে। কারণ এই শীতের বিকেলে পাশের বাড়ির একটা নিমগাছে কাকেরা ঝগড়া করে। আবার ঝগড়া করতে-করতে ঝাঁক বেঁধে এসে কর্নেলের সাধের বাগানে হামলা করে। সেখানে বিচিত্র প্রজাতির অর্কিড, ক্যাকটাস আর কিম্ভুতকিমাকার সব বনসাই আছে। ষষ্ঠি হালদারমশাইয়ের পরামর্শে একটা কাকতাড়ুয়া তৈরি করেও কাকের উৎপাত থামাতে পারেননি। এ-হল গিয়ে কলকাতার কাক, কাজেই ষষ্ঠির এখন কাকের সঙ্গে যুদ্ধ করার সময়।
চা খাওয়ার পর আমি নিজেই কিচেনে গিয়ে চায়ের কাপ-প্লেট রেখে এলুম। তারপর ভাবলুম ছাদের বাগানে ষষ্টির যুদ্ধ দেখতে যাব, কিন্তু সেই সময় ডোরবেল বেজে উঠল। কিচেনের পেছন দিয়ে গিয়ে একটা করিডর দিয়ে হেঁটে সদর দরজায় গেলুম। আইহোল-এ চোখ রেখে দেখলুম, হালদারমশাই এসে গেছেন।
এই দরজায় যে ল্যাচ-কি সিসটেম আছে, তাতে ভেতর থেকে দরজা খোলা যায়, কিন্তু বাইরে থেকে দরজা খুলতে হলে চাবি চাই। আমি দরজা খুলে দিলে হালদারমশাই সহাস্যে বললেন, ষষ্ঠি গেলে কই?
বললুম,–ষষ্ঠি এখন ছাদের বাগানে কাকের সঙ্গে যুদ্ধ করছে।
এই দরজা দিয়ে ঢুকলে ডানদিকে ডাক্তারবাবুদের যেমন রোগিদের জন্য ছোট্ট ওয়েটিংরুম থাকে, তেমনি ছোট্ট একটা ঘর আছে। এই ঘর দিয়ে এগিয়ে গেল ড্রইংরুম।
আমার সঙ্গে ড্রয়িংরুমে ঢুকে হালদারমশাই বললেন,–কর্নেলস্যার গেলেন কই? তিনিও কি কাকের লগে ফাইট করতে গেছেন?
বললুম,–না, আমি যখন ভাত-ঘুম দিচ্ছিলুম তখন উনি আমার গাড়ি চুরি করে নিপাত্তা হয়ে গেছেন।
গোয়েন্দাপ্রবর খিলখিল করে হেসে সোফায় বসলেন। দেখলুম তিনি একেবারে সেজেগুজেই এসেছেন। গায়ে অবশ্য হাতকাটা সোয়েটার, কিন্তু হাতে ভাঁজ করা একটা জ্যাকেটও আছে। আর আছে তার কাঁধে ঝোলানো একটা পুষ্ট পলিব্যাগ।
বললুম,–কর্নেল বলছিলেন ট্রেন ছাড়বে সন্ধ্যা সাড়ে-ছ’টায়। তবে ডিসেম্বরে সাড়ে-ছটা মানে রাত বলাই ভালো।
হালদারমশাই সায় দিয়ে বললেন,–হ! তাই দেরি করলাম না।
বলে তিনি কণ্ঠস্বর চেপে জিগ্যেস করলেন–আচ্ছা জয়ন্তবাবু, আপনার কি মনে হয় কালিকাপুরের চাটুজ্যে বাড়িতে এমন কোনও দামি জিনিস আছে, যেটা হাতানোর জন্য অগো কেউ ভয় দ্যাখাইতাসে!
বললুম,–সেটা আপনি সেখানে গিয়ে গোয়েন্দাগিরি করে জেনে নেবেন।
বলে আমি সুইচ টিপে ঘরের আলো জ্বেলে দিলুম। কারণ, শীত না পড়লেও অন্ধকার নামতে দেরি করেনি। ওদিকে ততক্ষণে ষষ্ঠিচরণও ছাদ থেকে নেমে এসেছে।
হালদারমশাই বললেন,–কর্নেলস্যার আইলে তখন কফি খামু কি কন?
আমি সায় দেওয়ার আগেই ড্রইংরুম-সংলগ্ন সেই ছোট্ট ওয়েটিং রুমে কর্নেলের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলুম,–আমি এসে পড়েছি হালদারমশাই। আর ষষ্ঠিটাও আমাকে করিডরের ওদিক থেকে উঁকি মেরে দেখে ফেলেছে। আমি ভেবেছিলুম চুপিচুপি ঘরে ঢুকে ষষ্ঠিকে চমকে দেব। কিন্তু সে সম্ভবত ছাদের বাগান থেকেই জয়ন্তের গাড়িটা দেখতে পেয়েছিল।
গোয়েন্দাপ্রবর ফিক করে হেসে বললেন,–জয়ন্তবাবু কইসিলেন আপনি ওনার গাড়ি চুরি করসেন।
কর্নেল তার বিখ্যাত অট্টহাসি হেসে ইজিচেয়ারে বসলেন। তারপর আমার গাড়ির চাবিটা বের করে টেবিলে রাখলেন।
জিগ্যেস করলুম,–আমাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে এমন জায়গায় গিয়েছিলেন যেখানে আমাকে সঙ্গে নিয়ে গেলে অসুবিধে হত, কাজেই জিগ্যেস করছি না কোথায় এবং কেন গিয়েছিলেন।
