হালদারমশাই সায় দিয়ে বললেন,–হ! ঠিক কইসেন জয়ন্তবাবু। ওনাদের শত্রুপক্ষই উৎপাত করত্যাসে।
কর্নেল বললেন,–শচীন চাটুজ্যে আমাকে বেশ বড় গলায় বলেছেন, ওঁদের কোনও শত্রু নেই। শচীনবাবু স্কুল-টিচার ছিলেন। এখন রিটায়ার করেছেন। ওঁর বাবা অহীনবাবু রুণ, শয্যাশায়ী। তিনিও শিক্ষকতা করতেন। ওঁদের কাকা মহীনবাবু সংসারের কোনও সাতে-পাঁচে থাকেননি। তা ছা, ওঁদের বিষয় সম্পত্তিও কিছু নেই। শুধু ওই ভিটে আর তার সংলগ্ন একটা ঠাকুরবাড়ি।
কর্নেল আরও কী বলতে যাচ্ছিলেন, এমন সময় টেলিফোন বেজে উঠল। কর্নেল রিসিভার তুলে সাড়া দিয়ে বললেন,–কর্নেল নীলাদ্রি সরকার বলছি।…চণ্ডীপ্রসাদবাবু? কী ব্যাপার? এইমাত্র আপনার চিঠি নিয়ে এসেছিলেন শচীন চাটুজ্যে। তিনি চলে গেছেন। আমি তাকে কথা দিয়েছি, কারণ আপনার সঙ্গে এই সুযোগে আবার দেখা হবে…আঁ? বলেন কী? কখন?…ও মাই গড! ব্যাপারটা তাহলে দেখছি ছেলেখেলা নয়!…ঠিক আছে। আমরা মানে আমি আর আমার তরুণ সাংবাদিক-বন্ধু জয়ন্ত চৌধুরী–যার কথা আপনাকে একবার বলেছিলুম। আর একজন রিটায়ার্ড পুলিশ অফিসার, যিনি এখন পেশাদার প্রাইভেট ডিটেকটিভ। তিনজনেই সন্ধ্যার ট্রেনে রওনা হব। সম্ভব হলে আপনি..বাঃ! ঠিক আছে।…আচ্ছা, রাখছি।
কর্নেল রিসিভার রেখে ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে মাথার প্রশস্ত টাকে একবার হাত বুলিয়ে নিলেন।
লক্ষ করলুম গোয়েন্দাপ্রবরের হাতে কফির পেয়ালা। এবং তিনি গুলিগুলি চোখে কর্নেলের দিকে তাকিয়ে আছেন। অভ্যাসমতো দুই চোয়াল তিরতির করে কাঁপছে।
আমি জিগ্যেস করলুম,–কর্নেল, কালিকাপুরে নিশ্চয়ই কোনও অঘটন ঘটেছে-প্লিজ, কথাটা খুলে বলুন।
কর্নেল এবার সোজা হয়ে বসে কফির পেয়ালা তুলে নিয়ে চুমুক দিলেন। তারপর মৃদু স্বরে বললেন,–একটা সাংঘাতিক ঘটনা ঘটেছে। শচীনবাবুদের ঠাকুরবাড়ির সামনে অনেকটা জায়গায় রক্ত পড়ে আছে। ওখানে একটা হাড়িকাঠ আছে। চৈত্র সংক্রান্তিতে শিবমন্দিরের সামনে পাঁঠা বলি দেওয়া হয়।
জিগ্যেস করলুম,–কিন্তু কাকে বলি দেওয়া হয়েছে?
শচীনবাবু ভোর ছ’টায় স্টেশনে গিয়েছিলেন। তাঁর বিধবা পিসি কাজের মেয়ে মানদাকে নিয়ে পুকুরঘাটে যাচ্ছিলেন। মন্দিরের সামনেই একটা পুকুর। খিড়কির দরজা দিয়ে বেরুনোমাত্র হাড়িকাঠের পাশে অনেকটা জায়গা জুড়ে চবচবে রক্ত দেখা যায়। মানদা চেঁচামেচি জুড়ে দেয়, পড়শিরা দৌড়ে আসে। কিন্তু কাকে বলি দেওয়া হয়েছে, তার লাশ পাওয়া যায়নি। পরে সবার খেয়াল হয় শচীনবাবুর কাকা মহীনবাবুর কোনও পাত্তা নেই।
হালদারমশাই বলে উঠলেন,–ওনার সন্ন্যাসী হওয়ার ইচ্ছা ছিল, শচীনবাবু কইত্যাসিলেন।
কর্নেল বললেন,–এতে স্বভাবতই লোকের সন্দেহ হয়েছে মহীনবাবুকেই কেউ বা কারা কোনও কারণে বলি দিয়ে তার লাশ গুম করে ফেলেছে। পুলিশ এসে তদন্ত করার পর চলে গেছে। জেলে নৌকাগুলোকে নাকি পুলিশ বলেছে গঙ্গায় কোনও লাশ দেখতে পেলে তার যেন পুলিশকে খবর দেয়।
বললুম,–শচীনবাবুর কাকা মহীনবাবুকেই যে বলি দেওয়া হয়েছে, তা প্রমাণ করার জন্য আজ সারাদিন অপেক্ষা করা যেতে পারে। এমন হতেই পারে, তিনি সাধু-সন্ন্যাসী টাইপের মানুষ, বাড়িতে না বলে কোথাও গঙ্গার ধারে কোনও সন্ন্যাসীকে দেখে তার কাছে বসে আছেন।
কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন,–মহীনবাবু ঘরের বারান্দায় একটা খাঁটিয়ায় শুয়ে থাকতেন। চণ্ডীপ্রসাদবাবু বললেন, ওটা ওঁর কৃচ্ছ্বসাধনের চেষ্টা। মশারি নিতেন না। একটা হালকা তুলোর কম্বল জোর করে তাকে দেওয়া হত। কিন্তু আজ তার খাঁটিয়ার বিছানা এলোমলো হয়ে পড়েছিল। তুলোর কম্বলটা পড়েছিল বারান্দার নীচে। শচীনবাবু ট্রেন ধরবার জন্য তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে যান। তাই ওটা লক্ষ করেননি। এদিকে তার পিসি সেটা লক্ষ করলেও ভেবেছিলেন, মহীনবাবু রাগ করে তুলোর কম্বল ফেলে দিয়েছে। মাঝে-মাঝে তিনি এই শীতেও ঠান্ডা মেঝেয় শুয়ে থাকতেন।
হালদারমশাই বললেন,–হেভি মিস্ত্রি।
কর্নেল চুপচাপ চা খাওয়ার পর চুরুট-কেস থেকে একটা চুরুট বের করে লাইটার দিয়ে ধরালেন, তারপর ধ্যানস্থ হলেন।
এই সময় আবার টেলিফোন বেজে উঠল। কর্নেল দ্রুত সোজা হয়ে বসে হাত বাড়িয়ে রিসিভার তুলে নিয়ে সাড়া দিলেন।-বলুন চণ্ডীবাবু…পুকুরপাড়ে রক্ত পাওয়া গেছে? আপনি পুলিশকে চাপ দিলে পুলিশ কলকাতার ডগ স্কোয়াড থেকে শিক্ষিত কুকুর নিয়ে যেতে পারে। ওখানে যে স্যান্ডেলটা পাওয়া গেছে, তা যখন মহীনবাবুর না, তখন খুনেদেরই হতে পারে…ঠিক আছে, আপনি বলুন। যদি পুলিশ ইতস্তত করলে আমাকে জানাবেন। আমি লালবাজারে আমার জানা অফিসারদের সাহায্যে একটা ব্যবস্থা করতে পারব।…আমরা রাতের ট্রেনে যাচ্ছি।
.
দুই
কোনও অভিযানে বেরুনোর আগে লক্ষ করেছি কর্নেল কতকগুলো কাজ করেন। যেখানে যাচ্ছেন সেখানকার পুলিশ কর্তাদের জানিয়ে যান। এটা স্বাভাবিক, কারণ খুনি হোক বা অপরাধী হোক, রহস্যের পরদা তুলে তিনি তাকে দেখিয়ে দিতে পারেন। তাই বলে তাকে গ্রেফতারের ক্ষমতা তো তার নেই। তাই পুলিশ ছাড়া তার চলে না। এদিকে আর-একটা সমস্যা, তার নিজের চেহারা এবং বয়স নিয়ে। রহস্যের পেছনে ছোটা মানে গোয়েন্দাগিরি করা। কর্নেল অঙ্ক কষে রহস্য আঁচ করতে পারেন বটে, কিন্তু সব তথ্য জোগাড় করতে একজন চালাক-চতুর অভিজ্ঞ লোক দরকার। সেই জন্যই অনেক সময়ই তিনি প্রাক্তন পুলিশ ইন্সপেক্টর এবং বর্তমানে প্রাইভেট ডিটেকটিভ কৃতান্তকুমার হালদার অর্থাৎ হালদারমশাইকে সঙ্গে নেন। আর আমি তো নেহাত সাংবাদিক! কর্নেলের কীর্তিকলাপ রোমাঞ্চকর করে লিখি বটে, কিন্তু কোনও রহস্যময় ঘটনার সূত্র খুঁজে বের করা আমার সাধ্য নয়।
