সুদর্শনবাবু নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে ছিলেন। তিনি ফুঁসে উঠলেন। তা হলে কিছুদিন ধরে আমার ছড়ির বদলে বাঞ্ছুদার ছড়িটা আমার ঘরের ব্র্যাকেটে ঝোলানো ছিল! ডিটেকটিভদ্রলোক ঠিক বলেছিলেন। সাপ মারার দিন কে দেখেছিল, দাদা আমার ঘর থেকে আমার ছড়িটা বের করে আনছিল! দাদা! এখনও বলছি, খুলে বলো! তুমিই ছড়ি বদল করেছিলে! হ্যাঁ-তুমি! তুমি! তুমি!
সুদর্শনবাবু দাপাদাপি জুড়ে দিলেন। ও. সি. মিঃ ভাদুড়ি তাকে জোর করে চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে বললেন,–চুপচাপ বসে থাকুন। চ্যাঁচামেচি পরে করবেন।
কর্নেল বললেন,–হালদারমশাই! আপনার ব্যাগ থেকে এবার আপনার আবিষ্কৃত জিনিসগুলো বের করুন।
গোয়েন্দাপ্রবর তার ব্যাগের চেন খুলে খবরের কাগজের মোড়ক বের করলেন। তারপর তিনি মোড়ক খুললেন। দেখলুম, একগাদা আধপোড়া কাগজ। তিনি বললেন,–এগুলি আমি পাইছিলাম রায়বাবুগো পুকুরের পাড়ে। ঝোঁপের মইধ্যে লুকানো ছিল।
মিঃ ভাদুড়ি পরীক্ষা করে বললেন,–ছাপানো বইয়ের পাতা মনে হচ্ছে।
কর্নেল উঠে গিয়ে সেই রায়বাহাদুরের ছবির তলায় একটা আলমারির কাঁচের কপাট হ্যাঁচকা টানে খুলে ফেললেন। তারপর বললেন,–হালদারমশাইয়ের কুড়িয়ে পাওয়া কাগজগুলো পরীক্ষা করে বুঝতে পেয়েছিলুম, আইনের বইয়ের পাতা। এ ঘরে ঢুকে দেখে নিয়েছি, এই দুটো প্রকাণ্ড বই লাইন থেকে একটু এগিয়ে ও পিছিয়ে আছে। অনেকদিন আগে রাখা বই আলমারির র্যাকে রাখলে ময়লার রেখা পড়বে। এই দুটো বই সেই রেখা মুখে দিয়েছে।
দুটো বই বগলদাবা করে তিনি টেবিলে রাখলেন। একটা বইয়ের ভিতরে চৌকো করে কাটা গভীর একটা অর্ধবৃত্তাকার অংশ বেরিয়ে পড়ল। কিন্তু সেখানে কিছু নেই। কর্নেলকে চঞ্চল ও উত্তেজিত দেখাচ্ছিল। তিনি দ্বিতীয় বইটা খুললেন। চৌকো গভীর গর্ত দেখা গেল। কিন্তু এটাতেও কিছু নেই।
মিঃ ভাদুড়ি বললেন,–টেলড দিয়ে অনেক পরিশ্রম করে কাটা গুপ্তস্থান। কিন্তু শূন্য কেন?
কর্নেল বললেন,–এই বইটার মধ্যে মহালক্ষ্মীর হীরকখচিত সোনার মুকুট লুকানো ছিল। তাই এই বইয়ের গর্তটা অর্ধবৃত্তাকার। আর দ্বিতীয় বইটার মধ্যে মহালক্ষ্মীর জড়োয়া নেকলেস ছিল। এর গর্তটা চৌকো।
বলে কর্নেল ডাকলেন,–সুরঞ্জনবাবু!
সুরঞ্জনবাবু মুখ নামিয়ে বললেন,–বলুন!
–আপনি পুরোনো প্রকাণ্ড শাস্ত্রীয় পঞ্জিকার ভিতরের পাতা কেটে গর্ত করে নিজের চাবিদুটো লুকিয়ে রেখেছিলেন। ও. সি. মিঃ ভাদুড়িকে তা দেখিয়েছিলেন।
গোয়েন্দাপ্রবর বললেন,–আমারেও তা দ্যাখাইছেন উনি!
কর্নেল বললেন,–এ কাজে আপনার দক্ষতা আছে। কিন্তু আপনার কাকাবাবুর দুটি আইনের বইয়ের ভিতর লুকিয়ে রাখা দুটি জুয়েলস কোথায় গেল?
সুরঞ্জনবাবু ভাঙা গলায় বললেন,–আমি বুঝতে পারছি না। বিশ্বাস করুন! এ কী অদ্ভুত কাণ্ড।
সুদর্শনবাবু গর্জন করলেন,–নিজেরই চুরি করে লুকিয়ে রাখা জিনিস কোথায় গেল বুঝতে পারছ না? ন্যাকা? ও. সি. সায়েব! কর্নেলসায়েব! বাঞ্ছারাম দত্তের বাড়ি সার্চ করলেই মাল বেরিয়ে পড়বে। কাল বিকেলে ক্লাবে যাওয়ার সময় আমি দেখেছি, আমার মহাপুরুষ দাদা দত্ত-বাড়িতে চুপিচুপি ঢুকে গেল।
সুরঞ্জনবাবু মিনমিনে গলায় বললেন,–না-না! আমারও অবাক লাগছে, এ কাজ কে করল? নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না।
ও. সি. মিঃ ভাদুড়ি বললেন,–তার মানে আপনি স্বীকার করছেন বইদুটোর মধ্যে মহালক্ষ্মীর মুকুট আর জড়োয়া নেকলেস লুকিয়ে রেখেছিলেন?
সুরঞ্জনবাবু এবার দুহাতে মুখ ঢেকে কেঁদে উঠলেন।–আমি পাপী। আমি মহাপাপী। ওই বাঞ্ছুর প্ররোচনায় আমি ফাঁদে পা দিয়েছিলুম।
এই সময় ভিতর থেকে এক ভদ্রমহিলা ঘরে ঢুকে থমকে দাঁড়ালেন। তারপর ঘরের ভিতরে চোখ বুলিয়ে সবাইকে দেখে নিয়ে বললেন, কী হয়েছে? এত কান্নাকাটি কীসের?
সুদর্শনবাবুও ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন,বউদি! আমি কল্পনাও করিনি, আমার দাদা–
তাকে ভদ্রমহিলা ধমক দিলেন।–চুপ করো! দাদা-অন্তপ্রাণ একেবারে! তোমাকে সাবধান করে দিইনি, দত্তবাবু কেন দুবেলা রায়বাড়ি আসছে, খোঁজখবর নাও?
বুঝলুম, এই মহিলাই সুরঞ্জনবাবুর স্ত্রী শোভারানি। তিনি দত্তবাবুর দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বললেন,–বাঃ! বেশ মানিয়েছে এতদিনে। কত লোককে ফাঁদে ফেলে সর্বনাশ করে এবার নিজেই ফাঁদে পড়েছে বাঙুরাম। কই? কর্নেলসায়েব কোথায়?
কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার করে বললেন,–শোভাদেবী! আমি সব বুঝতে পেরেছি। চলুন। রায়বাড়ির গৃহদেবী মহালক্ষ্মীকে এবার আমরা গিয়ে দর্শন করি। হীরকখচিত সোনার মুকুট আর জড়োয়া নেকলেস পরা ছবি আমি দেখেছি। এবার সেই প্রতিমাকে একই বেশে দেখতে পাব। মিঃ ভাদুড়ি! দত্তবাবুকে লক-আপে পাঠিয়ে দিন।
এই সময় হালদারমশাই খুব চাপাস্বরে কর্নেলকে বললেন,–আমারে হুমকি দেওয়া চিঠির হাতের লেখার সঙ্গে সুরঞ্জনবাবুর হাতের লেখার মিল দেখলাম।
কর্নেল হাসলেন।–হ্যাঁ, সেইজন্য এত কাণ্ড করতে হল।
ও. সি. মিঃ ভাদুড়ি এস. আই. রমেনবাবুকে নির্দেশ দিয়ে বললেন,–তপনবাবু! আমেদসায়েব! আপনারা এখানে থাকুন। আমরা আসছি। চলুন সুরঞ্জনবাবু! আপনার সম্পর্কে কী করা যায়, পরে ভেবে দেখা যাবে। সুদর্শনবাবু! আমার মনে হচ্ছে, এখনই আপনার ঘরে গিয়ে আপনার ছড়িটি পরীক্ষা করে দেখা দরকার।
